English

অক্টোবর ২৫, ২০২১ ০৩:৩৯ অপরাহ্ন

প্রকৃত মুসলিমের মূল্য

অক্টোবর / ০১ / ২০২১

 


মানুষের অবস্থা কেমন হতে পারে, যখন সে নিজের পথ হারিয়ে ফেলে এবং তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে যে উদ্দেশ্যে তা ভুলে যায়? তার অবস্থা তো তেমনই, আল্লাহ যার সম্পর্কে সতর্ক করেছেন : ‘আর ওই ব্যক্তির আনুগত্য করো না, যার অন্তরকে আমি আমার জিকির থেকে গাফেল করে দিয়েছি এবং যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে এবং যার কর্ম বিনষ্ট হয়েছে।’ (সুরা কাহফ : ২৮)।


সে আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন, এর শাস্তি হিসেবে আল্লাহও তাকে তাঁর জিকির থেকে উদাসীন বানিয়ে দিয়েছেন। নিজ প্রভুর ইবাদত ও দ্বীন নিয়ে ব্যস্ততার বদলে তাকে দুনিয়ায় ডুবিয়ে রেখেছেন। সে হয়ে গেছে নিজের প্রবৃত্তির অনুসারী। ফলে প্রবৃত্তি যা-ই চায় সে তাণ্ডই করে। যদিও তাতে তার ধ্বংস ও চূড়ান্ত ক্ষতি হয়। সে হয়ে যায় ওই ব্যক্তি আল্লাহ যার ভর্ৎসনা করেছেন : ‘তুমি কী তাকে দেখ না, যে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে?’ (সুরা ফুরকান : ৪৩)।


ফলে তার কর্ম ও আমলগুলো হয়ে গেছে অর্থহীন, বিনষ্ট ও বরবাদ। তাই তো বলা হয়, ‘যে নিজের লক্ষ্য ভুলে যায়, তার সবই বরবাদ হয়ে যায়। যে নিজের মূল্য ভুলে যায়, সব মূল্যই সে ভুলে যায়।’ তাই প্রতিটি ব্যক্তির ভেবে দেখা উচিতÑ কী তার মূল্য? কী তার মর্যাদা? তার কর্ম কী? সে ভালো কোন কাজে? কী তার দায়িত্ব? তার চাওয়াগুলো কী?


আল্লাহর বান্দারা, ওই দুই ব্যক্তির মধ্যে আল্লাহ তায়ালা পার্থক্য বলে দিয়েছেন যে, ক্ষণকালীন দুনিয়া চায় আর এর জন্য কাজ ও পরিশ্রম করে এবং আল্লাহর কাছে যা আছে তার প্রত্যাশা না করে। আর ওই ব্যক্তি যে আখেরাত চায়, পরকাল তালাশ করে এবং এর জন্য কাজ করে। আল্লাহ বলেছেন : ‘কেউ পার্থিব সুখ-সম্ভোগ কামনা করলে আমি যাকে যা ইচ্ছা সত্বর দিয়ে থাকি, পরে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত করি; সেখানে সে প্রবেশ করবে নিন্দিত ও অনুগ্রহ থেকে দূরীকৃত অবস্থায়। আর যারা মোমিন হয়ে আখেরাত কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে। তাদের প্রচেষ্টা পুরস্কারযোগ্য।’ (সুরা ইসরা : ১৮-১৯)।


আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেছেন : ‘কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না। তারা জানে শুধু পার্থিব জীবনের বাহ্যিক। অথচ তারা পরকালের খবর রাখে না।’ (সুরা রুম : ৬-৭)। আল্লাহ এদের ব্যাপারে বলেছেন ‘এরা জানে না’, অথচ তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিকগুলো সম্পর্কে জানে। এমনকি এদের কেউ কেউ পার্থিব নানা শাস্ত্র ও কলা সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও পারঙ্গম। এ জন্যই হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন : ‘আল্লাহর কসম, তোমাদের কারও কারও দুনিয়া সম্পর্কে প্রাজ্ঞতা এত বেশি, কেউ তার হাতে একটি মুদ্রা নিয়ে তোমাকে তার ওজন বলে দিতে পারে, অথচ সে সুন্দর করে নামাজটাই পড়তে জানে না।’


এক পূর্বসূরি মনীষী বলেন : ‘তারা জানে শুধু তাদের জীবিকা ও দুনিয়া সম্পর্কে। কবে চাষ করবে? কবে ফসল কাটবে? কীভাবে রোপণ করবে এবং কিভাবে নির্মাণ করবে?’ আল্লাহ তায়ালা কিছু লোকের ভর্ৎসনা করে বলেছেন : ‘তাদের জ্ঞানের দৌড় ওই পর্যন্তই।’ (সুরা নাজম : ৩০)। অর্থাৎ, তাদের শেষ গন্তব্য ও লক্ষ্য দুনিয়া আহরণ করা এবং এর জন্য চেষ্টা করা। আর তাদের জ্ঞানের শেষ এতটুকুই যে, তারা দুনিয়াকে আখেরাতের ওপর প্রাধান্য দেয়।


আল্লাহর বান্দারা, মানুষের মাঝে তফাতের ভিত্তি কী। তাদের পরস্পর পার্থক্যের মানদণ্ডই বা কী? সেটা কি বাহ্যিক বেশভূষা, রূপ ও অবয়ব? অবশ্যই না। আল্লাহ তায়ালা হুদ জাতিকে কী দিয়ে বিশিষ্ট করেছিলেন? যেমনটি তিনি তাঁর নবীর ভাষ্যে বলেছেন নিজের বাণীতে : ‘তোমাদেরকে অবয়ব ও শক্তিতে (অন্য লোক অপেক্ষা অধিকতর) সমৃদ্ধ করেছেন।’ (সুরা আ’রাফ : ৬৯)। আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছিলেন বলিষ্ঠ দেহসৈষ্ঠব ও শারীরিক শক্তিমত্তা। কিন্তু আল্লাহর কাছে তাদের কোনো মূল্য, সম্মান বা মর্যাদা ছিল না। কারণ তারা নিজ রবের নেয়ামত অস্বীকার করেছিল। আল্লাহর রাসুলকে অস্বীকার করেছিল। ফলে আল্লাহ তাদেরকে আজাব দিয়ে উপড়ে ফেলেছিলেন। যেমন তিনি এরশাদ করেছেন : ‘যারা আমার আয়াতগুলো অস্বীকার করেছিল, তাদের মূলোৎপাটন করে ছাড়লাম।’ (সুরা আ’রাফ : ৭২)।


আল্লাহ তেমনি মোনাফেকদের অবস্থা দেখে, তাদের বেশভূষা, অবয়ব ও সুন্দর কথায় ধোঁকা খাওয়া থেকে সতর্ক করেছেন। তিনি এরশাদ করেছেন : ‘তুমি যখন তাদের দিকে তাকাও তখন তাদের শারীরিক গঠন তোমাকে চমৎকৃত করে। আর যখন তারা কথা বলে তখন তুমি তাদের কথা আগ্রহ ভরে শোন।’ (সুরা মুনাফিকুন : ৪)। একইভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘কেয়ামতের দিন মোটা-তাজা বিশালকায় মানুষ আসবে, আল্লাহর কাছে তার মাছির ডানার সমানও ওজন হবে না।’ তারপর তিনি বলেন, পাঠ করো, ‘কেয়ামত দিবসে তাদের কাজের কোনো গুরুত্ব দেব না।’ (সুরা কাহফ : ১০৫)।


অতএব, ঈমানশূন্য হওয়ায় এমন ব্যক্তির কোনো মূল্য বা ওজন নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘নিশ্চয় আল্লাহ দৃষ্টি দেবেন না তোমাদের শরীর এবং তোমাদের আকৃতির দিকে, বরং দৃষ্টি দেবেন তোমাদের অন্তর ও তোমাদের কর্মের দিকে। পক্ষান্তরে উদাহরণ স্বরূপ দেখুন মহান সাহাবি আবদুল্লাহ বিন মাসউদকে (রা.)। তার পায়ের গোছা চিকন ও সরু দেখে সাহাবায়ে কেরাম হাসছিলেন। তখন রাসুল (সা.) বলেন : ‘সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে, (পুণ্যের) পাল্লায় আবদুল্লাহর দুই পা উহুদ পাহাড়ের তুলনায় অধিক ভারী হবে।’


এই মহান সাহাবির দৈহিক অবস্থা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে- তিনি ছিলেন খাটো চর্মসার, মোটা চামড়ার, পেশিহীন গোছা, ক্ষীণকায় ও কঙ্কালসার দেহ। হাঁটলে তাকে বসার মতো খর্বকায় দেখা যেত। অথচ এতে করে তার কোনো ক্ষতি হয়নি। তার মর্যাদায় কোনো কমতি তৈরি করেনি। তিনি ছিলেন আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন। কেয়ামতের দিন অনেক সম্মানিত।


সহিহ বোখারিতে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পাশ দিয়ে গেলেন। তখন তিনি তার কাছে বসা একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, এ ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার মন্তব্য কী? তিনি বললেন : এ ব্যক্তি তো একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক। আল্লাহর কসম! তিনি এমন মর্যাদাবান যে কোথাও বিয়ের প্রস্তাব দিলে তা কবুলযোগ্য। আর কারও জন্য সুপারিশ করলে তা গ্রহণযোগ্য। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) নীরব থাকলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরেক ব্যক্তি নবী (সা.) এর পাশ দিয়ে গেলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) পাশে বসা লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ ব্যক্তি সম্বন্ধে তোমার অভিমত কী? তিনি বললেন : ইয়া রাসুলাল্লাহ! এ ব্যক্তি তো এক গরিব মুসলিম। এ এমন ব্যক্তি, যদি সে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তা গ্রহণযোগ্য হবে না। আর সে যদি কারও সুপারিশ করে, তবে তা কবুলও হবে না এবং যদি সে কোনো কথা বলে, তবে তা শোনার যোগ্য হয় না। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন : ‘দুনিয়া ভরা আগের ব্যক্তি থেকে এ ব্যক্তি উত্তম।’


অনেক ব্যক্তি দুনিয়ায় উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন হয় অথচ আল্লাহর কাছে তার কোনো মূল্যই নেই। পক্ষান্তরে অনেক ব্যক্তি এমন আছে, যাকে কোনো পাত্তাই দেওয়া হয় না, মানুষের কাছে তার কোনো মর্যাদাই নেই; অথচ আল্লাহর কাছে অনেক ব্যক্তি থেকে তার মর্যাদা বড়। এর প্রমাণ পাই আমরা নবীজি (সা.) এর বাণীতে। তিনি বলেছেন : ‘বহু এমন লোকও আছে যার মাথা উশকোখুশকো, ধুলোভরা, যাদেরকে দরজা থেকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। (কিন্তু সে আল্লাহর কাছে এত প্রিয় যে) সে যদি আল্লাহর নামে কসম খায়, তাহলে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন।’


মুসলিম ভাইয়েরা, মানুষের ওজন ও মর্যাদার তারতম্য কি তাদের সম্পদ ও সন্তানাদিতে? কিংবা তাদের বংশ ও পদবিতে? উত্তর হলো, আল্লাহ একশ্রেণির লোকের নিন্দা করে বলেছেন : ‘আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন কিছু নয়, যা তোমাদেরকে মর্যাদায় আমাদের নিকটবর্তী করে দেবে; তবে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তারাই তাদের কাজের জন্য পাবে বহুগুণ প্রতিদান; আর তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।’ (সুরা সাবা : ৩৭)।


আবার কিছু মানুষ প্রবঞ্চিত হয় আল্লাহ তাকে পাপাচারে লেগে থাকা সত্ত্বেও নেয়ামত ঢেলে দেন বলে। সে ভাবে আল্লাহর কাছে বুঝি তার বিশেষ মর্যাদা বা কদর আছে। অথচ এটা আসলে তাকে ধীরে ধীরে পাকড়াওয়ের প্রক্রিয়া। যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : যখন তুমি দেখবে কোনো বান্দার গোনাহ ও অবাধ্যতা সত্ত্বেও মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাকে দুনিয়ার প্রিয় বস্তু করছেন, তখন বুঝে নাও যে, মূলত এটা অবকাশমাত্র। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) এ আয়াতটি পাঠ করেন। ‘তাদেরকে যে নসিহত করা হয়েছিল তারা যখন তা ভুলে গেল, তখন আমি তাদের জন্য নেয়ামতের দরজাগুলো খুলে দিলাম; পরিশেষে তাদেরকে যা দেওয়া হলো তাতে তারা যখন আনন্দে মেতে উঠল হঠাৎ করে তাদেরকে ধরে বসলাম। তখন (যাবতীয় কল্যাণ থেকে) তারা নিরাশ হয়ে গেল।’ (সুরা আনআম : ৪৪)।


তেমনি পরকালে মানুষের কোনো উপকারে আসবে না (ঈমান ছাড়া) তার পদ, বংশ ও আত্মীয়তা। যেমন দেখুন নবীজি (সা.) এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা সত্ত্বেও আবু লাহাবের পরিণতি। আল্লাহ তার সম্পর্কে বলেছেন : ‘ধ্বংস হোক আবু লাহাবের হস্তদ্বয় এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। তার ধন-সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোনো উপকারে আসবে না। অচিরেই সে শিখাবিশিষ্ট (জাহান্নামের) আগুনে প্রবেশ করবে।’ (সুরা লাহাব : ১-৩)।


নিজের বংশ নিয়ে গর্ব করা এবং পরের বংশ নিয়ে তাচ্ছিল্য করা বড় নিন্দিত কাজ। আর এটা জঘন্য হওয়ার জন্য তো এতটুকুই যথেষ্ট যে, এটা জাহেলি যুগের বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন : ‘আমার উম্মতের মধ্যে জাহিলি যুগের চারটি জিনিস রয়ে গেছে, যা তারা ত্যাগ করছে না। বংশমর্যাদা নিয়ে গর্ব, অন্যের বংশের প্রতি কটাক্ষ, গ্রহ-নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা এবং মৃতদের জন্য বিলাপ করা।’


৩ সফর ১৪৪৩ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার


ভাষান্তর- আলী হাসান তৈয়ব