জুলাই ২৫, ২০২১ ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন

কুরবানির শিক্ষা

জুলাই / ২০ / ২০২১


বছর ঘুরে মহান ত্যাগের বার্তা নিয়ে এলো ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ। প্রতি বছর ঈদুল আজহা আসে, আমরা সামর্থবানরা কুরবানি করি। কিন্তু এই কুরবানি থেকে আমরা কোনো শিক্ষা গ্রহণ করি না। আমাদের কুরবানি শুধু লৌকিকতায়পূর্ণ, লোক দেখানো কুরবানিকে আমরা পছন্দ করি। আমরা শুধু পশু কুরবানি করি বটে : কিন্তু আমরা কখনও মনের পশুকে কুরবানি করি না। আর আমরা মনের পশুকে কুরবানি করি না বলেই লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে কুরবানি করার পরও আমাদের আদর্শের কোন পরিবর্তন হয় না। একজন মুসলমান কুরবানি করবে একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই। তাই একজন মুসলমান এই কুরবানি থেকেই শিক্ষা নিবে, তার জীবনে যা কিছুই করুক তা করবে একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই। সালাত আদায় করবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, কুরবানি করবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিন্তু সমাজনীতি, রাজনীতি করবে ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য-এটা কখনও কবুল হবে না। মূলতঃ কুরবানি যেমন করতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তেমনি সমাজনীতি-রাজনীতিও করতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। অর্থাৎ জীবন-মরণ সবই হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই। এরূপ শপথ নিয়ে কুরবানি করলে সেটাই হবে আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য। কুরবানি করার সময় আমরা কি এরূপ শপথ গ্রহণ করেছি? আমরা কি কুরবানি করার আগে মনের পশুত্বের কুরবানি করি। পশু কুরবানির আগে আমাদেরকে অবশ্যই মনের পশুত্বের কুরবানি করতে হবে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না এদের গোশত এবং রক্ত : বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া’ (সূরা হজ্ব : আয়াত-৩৭)। কিভাবে কুরবানি করলে প্রকৃত কুরবানি হবে, কিভাবে কুরবানি করলে মনের পশুকে কুরবানি দেয়া হবে তাঁর অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন  হযরত ইব্রাহীম (আ:) স্বীয় পুত্র ইসমাইল (আ:)-কে কুরবানি করে। হযরত ইব্রাহীম (আ:) কর্তৃক স্বীয়পুত্র ইসমাইল (আ:)-কে কুরবানি দেয়ার বিস্ময়কর বাস্তব ঘটনাকে আল্লাহপাক কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইব্রাহীম তাঁর পুত্রকে কাত করে শায়িত করলো। তখন আমি তাকে আহবান করে বললাম, হে ইব্রাহীম! তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করলে! এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই ইহা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে মুক্ত এক মহান কুরবানির বিনিময়ে। আমি ইহা পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি’ (সূরা সাফফাত : আয়াত ১০৩-১০৮)। আত্মত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত হচ্ছে কুরবানি। সেই অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন হযরত ইব্রাহীম (আ:) ও হযরত ইসমাইল (আ:)। আজও যদি কেউ প্রকৃত কুরবানি দিতে চায় তাহলে হযরত ইব্রাহীম (আ:) ও হযরত ইসমাইল (আ:) এর মতোই থাকে আত্মত্যাগী হতেই হবে। 

কুরবানির গোশত তিন ভাগ করা মুস্তাহাব। একভাগ গরীব-মিসকীনদের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনদের জন্য এবং এক ভাগ কুরবানিদাতার জন্য। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে, তোমরা উহা হতে আহার কর এবং আহার করাও ধৈর্য্যশীল অভাবগ্রস্তকে ও যাঞ্চাকারী অভাবগ্রস্তকে’ (সূরা হজ্ব : আয়াত-৩৬)। আমাদের সমাজে ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ কুরবানি দিয়ে সমস্ত গোশত দিনের পর দিন, মাসের পর মাস খাওয়ার জন্য ফ্রিজে সংরক্ষণ করে রেখে দেন। অনেক কুরবানিদাতাকে দেখা যায়, এক লক্ষ টাকা দিয়ে কুরবানির গরু কিনেন এবং কুরবানির গোশত সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজ কিনেন ৩০ হাজার টাকা দিয়ে। তারা কেবল ফ্রিজে কুরবানির গোশত সংরক্ষণ করে রাখেন দিনের পর দিন গোশত খাওয়ার জন্যে। অথচ গরীব-দুঃখীরা ঈদের মতো আনন্দের দিনেও দু’টুকরা গোশতের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়-দু’টুকরা গোশত পায় না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

যিনি লক্ষ টাকা ব্যয় করে কুরবানি দিতে পারেন তিনি অবশ্যই বছরের যেকোন দিন গরুর গোশত কিনে খেতে পারবেন তিনি আবার গরীবের পেটে লাথি মেরে কুরবানির গোশত দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ফ্রিজে রাখবেন কোন বিবেকে? আসরে নফসে আম্মারা বা কুপ্রবৃত্তি আমাদেরকে ভাল কাজ করতে সব সময় বাধা দিয়ে থাকে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসার্য-এই ষড়রিপুগুলো মানুষের প্রধান শত্রæ। এই ষড়রিপুগুলোই হচ্ছে নফসে আম্মারা বা কু-প্রবৃত্তি। এই রিপুগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না বলেই মানুষ সব সময় নানা অপকর্মে লিপ্ত থাকে। এই রিপুগুলোর কারণেই মানুষ মনের পশুত্বকে কুরবানি করতে পারে না। আর মনের পশুত্বকে কুরবানি করতে পারে না বলেই কুরবানিদাতারা গোশত ফ্রিজে মাসের পর মাস সংরক্ষণ করে রাখতে চায়-গরীব দুঃখীকে কুরবানির গোশত দিতে চায় না।

কুরবানির ফজিলত সম্পর্কে অগণিত সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হযরত আলী (রা:) বর্ণিত হাদীসে রাসুল (সা:) ইরশাদ করেন, যখন কোন ব্যক্তি কুরবানির পশু ক্রয় করার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়, তার প্রত্যেক কদমের বদলে দশটি নেকী লেখা হয়, দশটি পাপ বিমোচন হয় ও দশটি দরজা বুলন্দ হয়। যখন পশু ক্রয় করার জন্য দরদাম করে  তখন ইহা আল্লাহর জিকিরের মধ্যে গণ্য করা হয়। যত টাকা দিয়ে পশু ক্রয় করা হয়, প্রত্যেক টাকার পরিবর্তে সাতশত সাওয়াব ঐ ব্যক্তির আমলনামায় লেখা হয়। যখন কুরবানি করতে পশুকে মাটিতে শোয়ানো হয়, তখন কুরবানিদাতার জন্য আকাশ ও জমিনবাসী সবাই দোয়া করতে থাকে। কুরবানি করা পশুর যে রক্ত জমিনে পড়ে, তা হতে দশজন ফিরিস্তার সৃষ্টি হয়ে ঐ কুরবানিদাতার জন্য কিয়ামত পর্যন্ত ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। আর কুরবানির গোশত দান করলে ভোজনকারীর প্রত্যেক লোকমার বিনিময়ে কুরবানিদাতা এক একটি ক্রীতদাস মুক্ত করার পুণ্য প্রাপ্ত হন। 

হযরত আয়শা (রা:) বর্ণিত হাদীসে রাসুল (সা:) ইরশাদ করেন, ‘কুরবানির দিনে আদম সন্তান এমন কোন কাজ করতে পারে না, যা আল্লাহর কাছে রক্ত প্রবাহিত করা অর্থাৎ কুরবানি করা অপেক্ষা প্রিয়তম হতে পারে। কুরবানির পশু সকল তাদের শিং, পশম ও খুরসহ কিয়ামতের দিন কুরবানিদাতার পাল্লায় এসে হাজির হবে। আর কুরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার পূর্বেই তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা প্রফুল্লচিত্তে কুরবানি করবে’ (তিরমিজী, ইবনে মাজাহ)। অন্য একখানা হাদীসে রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা কুরবানির পশু মোটাতাজা কর। কেননা, কুরবানির পশু হবে তোমাদের পুলসিরাতের বাহন।’ হযরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা:) বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেন, ‘একবার সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এ কুরবানি কী? রাসূল (সা:) উত্তরে বললেন, তোমাদের পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর সুন্নত। সাহাবায়ে কেরাম আবার আরজ করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এতে আমাদের জন্য কী কল্যাণ নিহিত রয়েছে? রাসুল (সা:) উত্তরে বললেন, কুরবানির পশুর প্রত্যেক পশমের বিনিময়ে তোমাদের জন্য একটি করে নেকী রয়েছে’ (আহমদ ও ইবনে মাজাহ, মিশকাত শরীফ : পৃষ্ঠা-১২৯)

কুরবানি করতে হবে একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই। এজন্য শুধু পশু কুরবানি করলেই চলবে না; বরং আগে মনের পশুত্বকে কুরবানি করতে হবে। মনের পশুত্বকে কুরবানি করতে পারলেই পশু কুরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হবে। কুরবানি করতে হবে যেমন আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য তেমনি জীবনের প্রতিটি কাজ করতে হবে একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য। ইরশাদ হচ্ছে, ‘বল, নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার হজ্ব ও কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে’ (সূরা আনআম : আয়াত-১৬২)।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।