জানুয়ারি ২৪, ২০২২ ০৪:০১ পূর্বাহ্ন

মুক্তিযুদ্ধের আরেক অধ্যায় : সিলেট অঞ্চল

ডিসেম্বর / ১৬ / ২০২১

বাংলাদেশের বাঙালিদের সবচেয়ে বড় বিজয়গাথা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের প্রাণের সম্পদ, অহংকার। পাকিস্তানি দুঃশাসনের শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সিকি শতাব্দীর লড়াই-সংগ্রাম ও সীমাহীন ত্যাগের ফসল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ। পাকিস্তান নামক কৃত্রিম, রাষ্ট্রের জন্মের উষালগ্ন সেই আটচল্লিশ সালের ভাষা আন্দোলন, বাহান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন; বাষট্টির সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ছেষট্টি সালের স্বায়ত্তশাসন তথা ছয় দফার আন্দোলন, আটষট্টি-উনসত্তরের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন ও মহান/ গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি সত্তর সালের নির্বাচনী লড়াইয়ের সফলতা ও তিক্ত অভিজ্ঞতা ধাপে ধাপে আমাদের পৌঁছে দেয় একাত্তর সালের কঠিন মরণপণ মুক্তিযুদ্ধে। পরাশক্তি আমেরিকা ও গণচীনের সমর্থনপুষ্ট আধুনিক মারণাস্ত্রে সমৃদ্ধ পাকিস্তানি সুনিপুণ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের লড়তে হয়েছিল প্রায় খালি হাতে। আমাদের যুদ্ধ করার মতো অস্ত্র-অর্থ-ট্রেনিং, সেনাবাহিনী কিছুই ছিল না। আমরা শান্তিপ্রিয় বাঙালি যুদ্ধ চাইনি, যুদ্ধ আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের কিছুই ছিল না। তবে আমাদের সবচাইতে বড় অস্ত্র ও শক্তি ছিল বাঙালি জনগণের পাহাঢ়দৃঢ় ঐক্য, সাহস ও মনোবল। একাত্তর সালের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের পিছনে এই ঐক্য-মনোবলই কাজ করেছে সবচাইতে বেশি। এক্ষেত্রে অবশ্যই ভারত ও সে সময়কার সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশের সাহায্য ও সমর্থন এই ক্ষেত্রে অবশ্যই কৃতজ্ঞতাভরে স্মর্তব্য।
সত্তর সালের নির্বাচনে জনগণের মধ্যে অভূতপূর্ব জাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল। নিজেদের অধিকার, জাতিগত পরিচয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে সোচ্চার বাঙালি জনগণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকেই বেছে নিয়েছিল। আর তাই এক নজিরবিহীন ঐতিহাসিক বিজয় লাভের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ একক শক্তি হিসেবে বেরিয়ে এসেছিল। ইয়াহিয়া-টিক্কা এই বিজয় না মেনে মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিল দেশের বাঙালি জনগণের ওপর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বান ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সমগ্র দেশবাসী রুখে দাঁড়ায় পাকিস্তানি বর্বরতাকে। পাল্টা আঘাতের জন্য বীর বাঙালি অস্ত্র তুলে নেয় হাতে। শুরু হয় বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম, শুরু হয় বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ মূল শক্তি ও মূল নেতৃত্বে থাকলেও দেশের বাম দলগুলো শুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচনের পরে ক্ষমতা হস্তান্তর, ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের ষড়যন্ত্র ও টালবাহানা এবং ক্ষমতা হস্তান্তর না করার পাঁয়তারা সম্পর্কে শুরু থেকেই দেশের বাম ও প্রগতিশীল শক্তি উত্তপ্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন সতর্ক ও করণীয় বিষয়ে সজাগ রাখার কাজে আত্মনিয়োগ করে। আগে থেকেই কমিউনিষ্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। তাই কমিউনিষ্ট পার্টিকে গোপনে কাজ করতে হয়। দেশের ও রাজনীতির মূল শক্তি জনগণের মধ্যে থেকে কমিউনিষ্ট নেতৃবৃন্দ বাম দলসমূহ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), ছাত্র ইউনিয়ন, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি), কৃষক সমিতি, মহিলা পরিষদ, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে মিলে সারাদেশে চলমান আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী, আরও সংগঠিত, আরও সম্ভাবনাময় করে তোলার কাজে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেন। পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে আন্দোলন সশস্ত্র রূপ নিতে পারে, পাক পার্মি অ্যাকশনে নামতে পারে এমনকি এ থেকে বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে কমিউনিষ্ট পার্টি ও বাম দলগুলো আগে থেকেই এসব সাবধান বাণী উচ্চারণ করে কর্মী ও জনগণকে সচেতন ও প্রস্তুত করার কাজে আত্মনিয়োগ করে। ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ পঁচিশে মার্চের আগে থেকেই সারাদেশে শুরু হয়ে যায়।
এই সময় সিলেট ন্যাপের অফিস ছিল কুমারপাড়ায়। এই অফিসকে ঘিরে ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা গভীর রাত অবধি সক্রিয় থেকে আন্দোলনকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যেতে সদা তৎপর ছিলেন। এ সময় পুলিশ লাইন মাঠে অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে নাইওরপুলস্থ ওয়াপদা রেস্ট হাউজ মাঠে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-যুবকদের প্রশিক্ষণ দেন ছাত্রনেতা মিসবাউল মান্নান আফতাব।
এরকম প্রেক্ষাপটে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র-নিরীহ বাঙালি জনগণের ওপর। শুরু হয় ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম নির্বিচার গণহত্যা। সীমিত শক্তি সত্ত্বেও ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্রলীগ প্রতিরোধে নেমে পড়ে। ইলেকট্রিকের পরিত্যক্ত খুঁটি, পরিত্যক্ত পুরাতন বাসগাড়ি দিয়ে টিলাগড় থেকে শহরের দিকে সড়কের স্থানে স্থানে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়। ব্যারিকেডের প্রতিরোধ দেখে শত্রুসেনা ভীষণ চটে যায়। ২৬ মার্চ সকালে মিরাবাজার-যতরপুর সড়কে ছন্দানীটুলা জামে মসজিদের সামনে জল্লাদ সেনার গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন খারপাড়া নিবাসী ছাত্র ইউনিয়ন দরদি ন্যাপ কর্মী আব্দুস ছমদ ফকির। মুক্তিযুদ্ধে সিলেটে প্রথম শহীদের মর্যাদা লাভ করেন ফকির।
অতঃপর পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর রূপ নেওয়ায় ২৫ মার্চের পর সিলেট থেকে ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্রলীগ ও অন্যান্য দেশপ্রেমিক ছাত্র সংগঠনের বিপুলসংখ্যক কর্মী ও সাধারণ ছাত্র সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের করিমগঞ্জ, কৈলাশহর, বালাট প্রভৃতি স্থানে আশ্রয় নেয়। তাদের মধ্য থেকে ট্রেনিং শুরুর প্রথমদিকে যারা ট্রেনিং নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন তাদের মধ্যে আছেন বাবরুল হোসেন বাবুল, আবুল খয়ের, বেদানন্দ ভট্টাচার্য, আলী মোস্তফা, কাজল পাল, ফখরুল ইসলাম ও আরও কয়েকজন।
২৫ মার্চের পরে এপ্রিল মাসে ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন কমিউনিষ্ট পার্টির একজন কেন্দ্রীয় শীর্ষনেতা ভারতের আগরতলায় গিয়ে পৌঁছেন। এই ১৭ জনের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালীন সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদও ছিলেন। অতঃপর ৬ মে উক্ত তিন সংগঠনের পক্ষ থেকে নুরুল ইসলাম নয়াদিল্লীতে এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, পূর্বাপর ঘটনাবলী, হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা দুনিয়াবাসীর সামনে তুলে ধরেন। নাহিদের সময়োপযোগী সাংবাদিক সম্মেলনের বক্তব্যে ভারতের বিভিন্ন মহলে এবং বিদেশে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্ক যে বিভ্রান্তি ছিল তা বহুলাংশে দূর হয় এবং এই বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভে খুবই সহায়ক হয়।
বাংলাদেশ সরকারের সাধারণ মুক্তিবাহিনীতে যোগদানের পাশাপাশি ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয়ভাবে পৃথক পৃথক ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। সিলেট অঞ্চল থেকে ছাত্র ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী, ন্যাপ ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিষ্ট পার্টির যৌথ ট্রেনিং সেন্টার থেকে বিশেষ গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে শত্রুসেনার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। ওই স্পেশাল ট্রেনিংপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আরকান আলী, মজনুর রহমান, পুরঞ্জয় চক্রবর্তী বাবলা, অসিত চক্রবর্তী অঞ্জন, পাতাকী দাস, নুরুজ্জামান, ইউনুস আলী, মুক্তেশ্বর পাল সবুজ, জিতেন দাস, মাখন লাল দাস, আবু সাঈদ জুবেরী, আব্দুর রাজ্জাক, আনোয়ার হোসেন, আসকর আলী, আব্দুল খালিক, সুধাংশু পুরকায়স্থ দাশু, নমিকুর রহমান, শামসুল ইসলাম, আব্দুল মছব্বির, হাসানুর রহমান, হরেন্দ্র পাল, আব্দুল মল্লিক, সাজেদ আহমদ চৌধুরী দানিয়েল, শফিকুর রহমান আরজু, নূর মোহাম্মদ, আব্দুল বারী, ব্যোমকেশ তালুকদার, বিষু তালুকদার, রেজওয়ান আহমদ, আহমদ আল-কবীর, সুবোধ পাল প্রমুখ।
তাছাড়া আরও অনেকে বাংলাদেশ সরকারের সাধারণ মুক্তিবাহিনীতে ট্রেনিং নিয়ে অমিত সাহসে যুদ্ধ করেছেন বিভিন্ন রণাঙ্গনে। তাদের অনেকের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়নের সুবল চন্দ্র পাল, অরুণ কান্তি পুরকায়স্থ, বজলুল মজিদ খসরু, সুভাষ চন্দ্র দাস, রবীন্দ্র কুমার সিনহা, সৈয়দ মোস্তফা কামাল মস্তই, আমান উদ্দিন, আব্দুল জলিল, আলকাছ উদ্দিন এবং ছাত্রলীগের সদরউদ্দিন চৌধুরী, আখতার আহমদ, রফিকুল হক, সাইফুর রাজা কিনু, শওকত আলী, ফারুক আহমদ, মিসবাউদ্দিন, মারুফ আহমদ, গুরুপদ রায়, দীপক দেব দীপু, ইনামুল হক চৌধুরী, সাজ্জাদুর রহমান, জামাল পাশা, আবুল কাশেম, সাইফুর রহমান প্রমুখ রয়েছেন। তাছাড়া ছাত্র ইউনিয়নের রেজওয়ান উদ্দিন, তবারক হোসেইন, মানিক মিয়া, নজির হোসেন, সুকুমার দেব রায়, সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল, অর্ধেন্দু কুমার দেব, মুকুল আশরাফ, রাখী দাশ পুরকায়স্থ প্রমুখ মুক্তিযুদ্ধে সংগঠনের ভূমিকা পালন করেছেন।
ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মিসবাউল মান্নান আফতাব ও তারকেশ্বর পাল কাজল ভারতে ট্রেনিং সেন্টারে ট্রেনিং ইন্সট্রাক্টর হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ছাত্র ইউনিয়ন সিলেট শহর শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম (সিটি কাইয়ুম), মোয়াজ্জেম হোসেন হাসনু, দিলদার হোসেন সেলিম, আব্দুল কাইয়ুম (কাজীটুলাসহ অন্যরা প্রাণ হাতে নিয়ে সিলেটে অবস্থান করে কাজ করেছেন। বাম রাজনীতি ও ছাত্র ইউনিয়নের এক অকুতোভয় শুভার্থী-শিক্ষক দেবেশ্বর পাল, (মিলন দা) সিলেটে অবস্থান করে পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনী ও রাজাকার গোষ্ঠীর নৃশংসতা ও তাণ্ডবলীলা সচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন। সিটি কাইয়ুম ও মিলনদা সিলেট শহরে ন্যাপ নেতা আব্দুল হামিদ ও আ ফ ম কামালের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে নিশ্চিদ্র গোপনীয়তায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের দিনে দেশের ভিতরে ভয়ঙ্কর দুর্নীতি ও পদে পদে মৃত্যু জেনেও নিখাঁদ দেশপ্রেমের টানে তবারক হোসেইন, মুকুল আশরাফ, ন্যাপকর্মী মোগলাবাজার শরীশপুরের টুনু মিয়া একাধিকবার অবরুদ্ধ অঞ্চলে প্রবেশ করেছেন, সিলেট শহর, মোগলাবাজার, সিলাম, দক্ষিণ সুরমা ঘুরে এসাইনমেন্ট অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা শত্রুপক্ষের চোখে ধুলা দিয়ে ন্যাপ নেতা আব্দুল হামিদ, ন্যাপ নেতা আ ফ ম কামাল অ্যাডভোকেট, দেওয়ান গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী অ্যাডভোকেট, দরগাহ্ শাহজালালের (রহ.) মুতাওয়াল্লী সরকুম ইউসুফ আমান উল্লাহ (পুতুল ভাই) প্রমুখের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিবাহিনীতে সাধারণভাবে রিক্রুট হয়ে ট্রেনিং গ্রহণ ও রণাঙ্গনে প্রেরণের নানারকম জটিলতা ও সমস্যা দূর করার লক্ষে ছাত্র ইউনিয়ন-ন্যাপ কমিউনিষ্ট পাটি সমন্বয়ে যুদ্ধের ট্রেনিং দানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিনি সংগঠনের নেতৃত্বে নীতি ও সিদ্ধান্ত মোতাবেক দেশের অন্যান্য অংশের মতো বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিন পার্টির যৌথ গেরিলা বাহিনীর বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের প্রধান ক্যাম্প ছিল ভারতের কাছাড় জেলার করিমগঞ্জে। স্থানীয় হিন্দি স্কুলে অবস্থিত এই ক্যাম্পের পরিচালনায় ছিলেন কমরেড বরুণ রায়, ইকবাল আহমদ চৌধুরী, আব্দুল মঈদ চৌধুরী, রফিকুর রহমান লজু, রেজওয়ান উদ্দিন ও তবারক হোসেইন। জুন মাস থেকে ডিসেম্বরে বিজয় অর্জন পর্যন্ত এই ক্যাম্পের সার্বক্ষণিক দায়িত্বে ছিলেন রফিকুর রহমান লজু। অন্যরা এই ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে অন্যান্য দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশের মূল ক্যাম্প বা অফিস ছিল আগরতলায়। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এই অফিসকে কেন্দ্র করে কাজ করতেন। আরেকটা অফিস ছিল শিলংয়ে বাংলাদেশ সেন্টার। সানি হোটেল বাংলাদেশ সেন্টার থেকে পীর হবিবুর রহমান সুনামগঞ্জ অঞ্চল দেখতেন।
ছাত্র ইউনিয়নের রেজওয়ান উদ্দিন, মানিক মিয়া, তবারক হোসেইন, অপূর্ব ধর, নজির হোসেন, সুকুমার দেবরায়, মুকুল আশরাফ, অর্ধেন্দু কুমার দেব, রাখী দাশ পুরকায়স্থ, সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল প্রমুখ মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।
এই ক্যাম্পে আসতো আগরতলা থেকে প্রকাশিত সিপিবির সাপ্তাহিক পত্রিকা মুক্তিযুদ্ধ, ন্যাপের নতুন বাংলা, ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি সিপিআই-এর পত্রিকা কালান্তর প্রভৃতি। এগুলো ঘুরে ঘুরে শরণার্থী শিবিরে বিক্রি করতেন মুকুল আশরাফ, অর্ধেন্দু দেব, তুষার কর, সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলরা।
করিমগঞ্জ হিন্দি স্কুলের ক্যাম্প বা রিক্রুটিং সেন্টার আরও একটি কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে। এই ক্যাম্পে বসেই প্রখ্যাত শিল্পী গোপেশ মালাকার তার বিখ্যাত এক শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেন। এই শিল্পকর্মের মাধ্যমে তিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণীয় করে রেখেছেন। শিল্পী তার রঙ-তুলির মাধ্যমে পাকিস্তানের ২৪ বছরের শোষণবঞ্চনা ও রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরেছেন। শিল্পী ১৯৪৭-এ পাকিস্তানের জন্ম, শিশু রাষ্ট্রের ধোঁকাবাজী, ১৯৫০-এর দাঙ্গা, ১৯৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও (২) ধারা, ১৯৫৮-এর সামরিক শাসন, উত্তাল ষাট দশকের ‘৬২-এর ছাত্র আন্দোলন, ‘৬৬-এর স্বায়ত্ত্বশাসন ও ছয় দফার আন্দোলন, ১৯৬৮৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, আইয়ুবের বিদায়-ইয়াহিয়ার আগমন, ২৫ মার্চের কালরাত ও গণহত্যার রক্তাক্ত ইতিহাস রঙতুলি দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছেন। ছবিগুলো যেনো জীবন্ত হয়ে কথা বলছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবগাঁথা। সেই সঙ্গে হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা দেখে করিমগঞ্জের সুধী সমাজ ও সাধারণ মানুষ ভয়ে-আতঙ্কে শিহরিয়া উঠেন। স্বচক্ষে দেখতে না পারলেও শিল্পী গোপেশ মালাকারের ছবির মধ্যে তারা বাংলাদেশ দেখেছেন, মানুষের স্বাধীনতার আকুলতা ও প্রতিরোধ আন্দোলন দেখেছেন, বিজয় দেখেছেন। এই ছবিগুলো করিমগঞ্জে আমাদের ক্যাম্পের শুধু নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-সংগ্রামের সফলতা ও মর্যাদা স্মরণীয় করে রেখেছে বাংলাদেশের ইতিহাসে, বিশ্বের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে।
লেখক : জ্যেষ্ঠ কলাম লেখক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক