খোশ আমদেদ মাহে রমযান

শাহ নজরুল ইসলাম:পৃথিবীর ইতিহাসে এবারের রমযানুল মুবারক ভিন্ন পরিবেশ ও অবস্থায় পালিত হচ্ছে। দ্বিতীয় বছর চলছে করোনা আক্রান্ত পৃথিবীতে। মহান আল্লাহ এখনো পর্যন্ত আমাদের জিন্দা রেখেছেন আলহামদুলিল্লাহ! ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অদেখা এক ভাইরাসের দাপটে পৃথিবীর মানুষ নাকাল। দুনিয়ার সকল শক্তি পরাশক্তি কাবু হয়ে গেছে করোনার কাছে। ইতোমধ্যে মারা গেছেন ত্রিশ লাখের মতো মানুষ, আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় চৌদ্দ কোটি মানুষ। কতদিনে কোথায় গিয়ে এর প্রকোপ ও প্রভাব থামবে তা এখনো খোলাসা করে বলতে পারছেন না কেউ। সবাই ঘরবন্দি। ঘরবন্দী রাখার জন্য বহু প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছে এবং হচ্ছে। এমনকি বাঘ ও সিংহ ছেড়ে দেয়া হয়েছে শহরের মানুষকে ঘরে রাখার জন্য। কোন কোন দেশে কারফিউ দেয়া হয়েছে। এমনই অকল্পনীয় অভাবিত ও অভূতপূর্ব পরিবেশে আমরা আজ রোজা শুরু করেছি।
মালিকের দরবারে প্রার্থনা ওগো মালিক! আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন, আমাদের অপরাধ সীমাতিক্রম করেছে নিঃসন্দেহে। এজন্য আপনি আমাদের উপর নারাজ হয়েছেন। মালিক আপনি আমাদের হিদায়াত দিন, ক্ষমা করুন। কারণ, আপনার রহমত আমাদের পাপের চেয়ে অনেক বেশি। পৃথিবীকে নিরাময় করে দিন প্রভু! রোজা মুখে এই মোদের প্রার্থনা।
কুরআন মাজীদে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেনÑ
‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য রোযার বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদের দেওয়া হয়েছিল। যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (কুরআন মাজীদ, সূরা বাকারা ২/১৮৩)
আজ পয়েলা রমযান, ১৪৪২ হিজরি, বুধবার। আজ থেকে ১৪৪০ হিজরি বছর আগে দ্বিতীয় হিজরিতে উম্মতে মুহাম্মাদির উপর রোযা ফরয হয়েছিল। সে থেকে অদ্যাবধি মুসলিম উম্মাহ মাসের সেরা মাস রমযানুল মুবারকে সিয়াম সাধনার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। রমযানের মাহাত্ম্য, তাৎপর্য, গুরুত্ব এবং আবেদন এখনো বিশ্বব্যাপী মানুষকে প্রভাবিত করছে। আত্মশুদ্ধির পথে মানুষকে ধাবিত করছে। বরাবরের মতই বছর ঘুরে আমাদের কাছে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পসরা নিয়ে মাহে রমযান এবারো উপস্থিত হলো। আহলান সাহলান মাহে রমযান; স্বাগতম মাহে রমযান; খোশ আমদেদ মাহে রমযান। সুদিনে নিদানে আমরা মালিকের গোলামী করার জন্য তৈরি আছি। মালিক আমাদের তাওফিক দিন।
রোযা রাখার উদ্দেশ্য মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং লক্ষ্য তাকওয়া অর্জন করা। রোযা ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ। পূর্ববর্তী সকল নবী রাসূলগণের ধর্মেও রোযার বিধান ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় মুসলিমদেরকেও মহান আল্লাহ রমযানে রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। রোযা মানে হলো, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার এবং যৌনাচার থেকে বিরত থাকা। এর জন্য নিয়ত করা শর্ত। রোযার ফরযিয়ত বা আবশ্যকতা কুরআন, সুন্নাহ এবং উম্মাহর ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। তাই কেউ রোযা অস্বীকার করলে কাফির হয়ে যায়। গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া রোযা বর্জন করলে মারাত্মক গুনাহগার হবে।
নবী করীম (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন : ‘মানুষের সকল আমল তার নিজের জন্য। রোযা এর ব্যতিক্রম, সেটি আমার জন্য, আমি এর বিনিময় দিব। রোযা হলো (জাহান্নাম থেকে বাঁচার) ঢাল। কেউ যখন রোযা রাখে তখন যেন সে অশ্লীল কথা না বলে এবং ঝগড়া না করে। কেউ তাকে গালি দিতে চাইলে বা ঝগড়া করতে চাইলে সে যেন বলে আমি ‘রোযাদার’। তাঁর কসম, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের সুগন্ধির চেয়ে উত্তম।’ (সহীহ বুখারী শরীফ : ১/২৫৫ নং ১৮৬৬)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ‘যে ব্যক্তি কোন ধরনের সমস্যা বা রোগ ব্যতীত রমযানের রোযা ছেড়ে দেয় সে সারা জীবন রোযা রাখলেও এর ক্ষতিপূরণ দিতে পারবে না’। (আততারগীব ওয়াত তারহীব : ২/১২৬ হাদীস : ১৫১১)
প্রাপ্ত বয়স্ক বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর রমযানের রোযা ফরয । রোযা সহীহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো যথা সময়ে নিয়ত করা এবং নারীগণ মাসিক ¯্রাব এবং প্রসব পরবর্তী ¯্রাব থেকে পবিত্র থাকা। অমুসলিম, পাগল এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ে বুদ্ধিসম্পন্ন হলেও তাদের উপর রোযা ফরয নয়। অবশ্য অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ে সাত বছরে উপনীত হলে তাদের রোযার নির্দেশ দেয়া উচিত। আর দশ বছরে পৌঁছলে সামর্থ্য থাকা সত্তে¡ও রোযা না রাখলে তাদেরকে শাসন করতে হবে।
অসুস্থ লোকের উপর অসুস্থ অবস্থায় ও মুসাফির সফররত অবস্থায় রোযা রাখা আবশ্যক নয়। তবে রমযান শেষে তারা ছুটে যাওয়া রোযার কাযা আদায় করবেন।
রোযা সহীহ হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। রোযার নিয়ত করা ছাড়া শুধু পানাহার এবং যৌনাচার থেকে বিরত থাকলে রোযা হবে না। নিয়ত মানে, মনে মনে রোযা রাখার সিদ্ধান্ত স্থির করা। মুখে কোন কিছু উচ্চারণ করা জরুরি নয়। কুরআন মাজীদ ও হাদীস শরীফে মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করার কোন নির্দেশনা নেই।
নফল রোযা, নির্দিষ্ট দিনের মান্নতের রোযা এবং রমযানের রোযার নিয়ত রোযা পালনের দিন সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ার দেড় ঘণ্টা পূর্ব পর্যন্ত করা যাবে। এরপর নিয়ত করলে রোযা হবে না। তবে রাতে নিয়ত করা উত্তম । এছাড়া অন্যান্য রোযার নিয়ত সুবহে সাদিকের আগেই করতে হয়।
রমযানে সাহরী খাওয়ার দ্বারাও নিয়ত হয়ে যায়। সুতরাং কেউ সাহরী খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে আর নিয়তের সময় পার হওয়ার পর ঘুম থেকে উঠলেও তার রোযা হয়ে যাবে। অবশ্য সাহরী খাওয়ার সময় যদি রোযা না রাখার ইচ্ছা করে তবে তা ভিন্ন কথা।
রমযানের প্রতিটি রোযার জন্য পৃথক নিয়ত করা আবশ্যক।
রাতে নিয়ত করার পরও সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত পানাহার ও সহবাস বৈধ। অনেকে মনে করেন নিয়ত করার পর আর কোন কিছু খাওয়া যায় না। এটা সঠিক নয়।
রোযার নিয়ত করার পর তা ভাঙতে চাইলে সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত ভাঙতে পারবে। সুবহে সাদিকের পর নিয়ত ভাঙ্গা যাবে না। তাই সুবহে সাদিকের পর মনে মনে নিয়ত ভেঙে পানাহার বা সহবাস করলে কাযা, কাফফারা-উভয়টি ওয়াজিব হবে। (মুফতি মুহাম্মদ জমিরুদ্দীন, তুহফাতুল খাইর, পৃ. ৪-৫, জামেয়াতুল খাইর-এর বিশেষ প্রকাশনা।)
আসুন! সকলে মিলে গুরুত্ব সহকারে নিয়ম-পদ্ধতি মেনে সিয়াম সাধনায় আত্মনিয়োগ করি। প্রত্যেকেই নিজেকে সর্বপ্রকার অন্যায়-অনাচার ও পাপাচার থেকে পুত-পবিত্র রেখে পরিপূর্ণ মানুষ হবার চেষ্টা করি। রোযা পালনের মূল লক্ষ্য তাকওয়া অর্জনে ব্রতী হই। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন। আমীন।

শেয়ার করুন