খোশ আমদেদ মাহে রমজান

শাহ নজরুল ইসলাম : আজ শুক্রবার, ৩ রমযান ১৪৪২ হিজরী। রহমতের দশকের তৃতীয় দিন। সিয়াম সাধনার অন্যতম আনুসাঙ্গিক বিষয় হচ্ছে সাহরী ও ইফতার। সাহরী খাওয়া সুন্নত। হাদীস শরীফে সাহরীর ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- ‘তোমরা সাহরী খাও। সাহরীর মাঝে বরকত রয়েছে।’ (সহীহ মুসলিম :১/৩৫০ হা. ১০৯৫)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন- ‘আমাদের এবং আহলে কিতাবদের রোযার ব্যবধান হচ্ছে সাহরী।’ (অর্থাৎ তাদের জন্য ঘুমানোর পর পানাহার নিষিদ্ধ। আর আমাদের জন্য সুবহে সাদিক পর্যন্ত পানাহার বৈধ) (সহীহ মুসলিম : ১/৩৫০ হা.১০৯৬)
খাবার বা পানীয় যে কোন একটা দ্বারা এই সুন্নত আদায় হয়ে যায়। ক্ষুধা না থাকলে সামান্য পানি বা শরবত পানের মাধ্যমেও সাহরী খাওয়ার সুন্নত আদায় হয়ে যাবে।
মধ্যরাত থেকে সুবহে সাদিকের পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত সাহরী খাওয়া যায়। তবে সাহরী বিলম্ব করে খাওয়া মুস্তাহাব। কেউ কেউ বলেন সূর্যাস্ত থেকে সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত সময়কে ৬ ভাগ করে সাহরী ষষ্ট ভাগে খাওয়া মুস্তাহাব। সুবহে সাদিক উদয় নিয়ে সন্দেহ হলে তখন সাহারী না খাওয়া মুস্তাহাব।
সাহরীর সময় আছে মনে করে সুবহে সাদিকের পর যদি পানাহার করে, তাহলে রোযা হবে না। তবে, এরূপ ব্যক্তিকে সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে। পরবর্তীতে কাযা করতে হবে; কাফফারা লাগবে না।
সাহরী খাওয়া ছাড়া রোযা রাখলে রোযায় কোন সমস্যা হবে না। সুতরাং সাহরীর জন্য ঘুম থেকে জাগতে না পারলেও রোযা রাখতে হবে।
ইফতার প্রসঙ্গ : সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়ার পরপরই ইফতার করে নিতে হয়। বিনা কারণে ইফতারে বিলম্ব করা মাকরূহ। অবশ্য আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হলে বা অন্য কোন কারণে সূর্যাস্তের ব্যাপারে সন্দেহ হলে কিছু বিলম্বে ইফতার করা উচিত। ইফতারের সময় এ দু‘আ পড়া সুন্নত :‘আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিযকিকা আফতারতু’ অর্থ ‘হে আল্লাহ আপনার সন্তুষ্টির জন্যই রোযা রেখেছি, আর আপনার দেয়া রিযিক দ্বারা ইফতার করছি।’ আর ইফতারের পর এই দু‘আ পড়তে হয় :‘যাহাবায যামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরূকু ওয়া সাবাতাল আজরু ইন্শা-আল্লাহ।’
তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করা মুস্তাহাব। তা না হলে শুকনো খেজুর দিয়ে, নতুবা পানি দিয়ে ইফতার করা মুস্তাহাব। তবে অন্য যে কোন জিনিস দিয়েও ইফতার করা যায়। লবণ দিয়ে ইফতার করা সওয়াবের কাজ মনে করা ঠিক নয়। মসজিদে ইফতার করতে চাইলে ইতিকাফের নিয়ত করে নেয়া উচিত এবং মসজিদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি খুব যতœবান হওয়া উচিত।
হাদীস শরীফে ইফতারের সময় দু’আ কবুল হওয়ার কথা এসেছে। তাই ঐ সময়ে বিশেষভাবে দু‘আ করা উচিত। হাদীস শরীফে এসেছে : ‘যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে সে রোযাদারের অনুরূপ সওয়াব পাবে। এতে রোযাদারের সওয়াব একটুও কমবে না।’ (আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব : ২/১৫৫-১৫৬ হাদীস : ১৬২৫)
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, রমযানের মূল লক্ষ্য তাকওয়া অর্জন। তাকওয়া হচ্ছে মহান আল্লাহর ভয়ে সকল মন্দকর্ম থেকে বিরত থাকা। মানুষের প্রতিটি কাজকর্ম, চিন্তা ভাবনা ও আচার আচরণে যদি এ বিষয়টি প্রতিফলিত হয় যে আমার স্রষ্টা যিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা তিনি আমার সব কিছু দেখছেন তাহলে সে মানুষটি কি সতর্ক ও সাবধান হবে না? সচেতন এই অনুভূতি এবং মালিকের দরবারে শেষ বিচারে জবাবদিহিতার বিশ্বাস মানুষকে যাবতীয় মন্দ কর্ম থেকে নিবৃত রাখে। এটাই তাকওয়ার মূল কথা। এই চেতনা ও অনুভূতি লালন করা ও জাগ্রত রাখার তাগিদ দিয়ে মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর।’ (কুরআন মাজীদ, সূরা আলে ইমরান ৩/১০২) আমরা সৎকর্ম যা কিছু করি তম্মধ্যে আমাদের নিয়ত এবং তাকওয়াই মহান আল্লাহর নিকট পৌঁছে। সত্যনিষ্ঠার প্রতিদান মহান আল্লাহ দিয়ে থাকেন। ইরশাদ হয়েছে ‘আল্লাহর নিকট ওগুলোর (কুরবানীর পশুর) গোশত ও রক্ত পৌঁছেনা বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (কুরআন মাজীদ, সূরা হাজ্জ ২২/৩৭) তাকওয়া হচ্ছে মহান আল্লাহর নৈকট্য ও ভালবাসা লাভের উৎকৃষ্ট উপায়।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালবাসেন।’ (কুরআন মাজীদ, সূরা তাওবা ৯/৪) ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর আর মনে রেখ! নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।’ (কুরআন মাজীদ, সূরা বাকারা ২/১৯৪) আমাদের যাপিত জীবনে তাকওয়া অবলম্বন জাহান্নাম থেকে মুক্তির অন্যতম উপায়। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করতে পারে না। একটি চোখ যা আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে আর অপর চোখ যা আল্লাহর রাস্তায় পাহারারত অবস্থায় রাত কাটায়।’ (সুনানু তিরমিযী, মিশকাত শরীফ পৃ. ৩৩২)
তাকওয়া কেবল মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয় না বরং জান্নাতে প্রবেশ করতেও সাহায্য করে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং নিজেকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে নিশ্চয় জান্নাত হবে তার আবাসস্থল।’ (কুরআন মাজীদ, সূরা নাযিয়াত ৭৯/৪০-৪১)
তাকওয়া সমাজ জীবনে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করে। নির্ভরতার পরিবেশ তৈরি করে। সমাজে ইতিবাচক মূল্যবোধ সৃষ্টি করে। তাকওয়ার অভাবে মানুষ পাপ ও নিষিদ্ধ কর্মে লিপ্ত হয়ে সামাজিক জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলে। যার নযীর বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র বিদ্যমান। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই বর্তমান সমস্যসংকুল ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাস্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়ার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে যতদিন না তাকওয়া সৃষ্টি হবে ততদিন মানব জাতীর সামগ্রিক কল্যাণ ও মঙ্গল আশা করা যায় না। সুতরাং তাকওয়া হলো মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনের মুক্তি ও নাজাতের জন্য মূল চাবিকাটি। রমযানের সিয়াম সাধনার মধ্যদিয় আমাদের সকলের মধ্যে তাকওয়ার গুণ অর্জিত হোক, মহান মা’বূদের দরবারে এই কামনা। আমীন।

শেয়ার করুন