লকডাউন প্রত্যাহার ও বাস্তবতা

এম হাফিজ উদ্দিন খান: অনেকেরই অভিমত, আবারও সরকার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কথা উঠেছে, আমরা কি উত্তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুলায় পড়ব? করোনাদুর্যোগ প্রতিহত করতে সরকারি ছুটি শুরু হয়েছিল গত ২৬ মার্চ থেকে। তারপর কয়েক দফায় তা বাড়ানো হয় এবং ৩০ মে পর্যন্ত টানা ছুটি ছিল। ২৮ মে প্রজ্ঞাপন জারি করে বলা হয়, ৩০ মের পর ছুটি আর বাড়ানো হবে না। কার্যত সামগ্রিকভাবে আমরা করোনাদুর্যোগ প্রতিরোধে লকডাউন অবস্থার মধ্যে ছিলাম না। আক্রান্ত কোনো কোনো এলাকা বা বাড়ি লকডাউন করা হলেও সামগ্রিকভাবে আমরা ছিলাম সাধারণ ছুটির মধ্যে। যদি প্রকৃতই আমরা লকডাউনে থাকতে পারতাম, তাহলে হয়তো আমাদের পরিস্থিতি এত ভয়াবহত হয়ে উঠত না।

একটা পরিসংখ্যান আমরা মেলাতে পারি। দেশে গত এপ্রিলে করোনায় মোট রোগী শনাক্ত করা হয়েছিল প্রায় ৭ হাজার ২৫০ জন। মে মাসে তা ৪০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। দেশে গত ১ এপ্রিল মোট রোগী যেখানে ছিল ৫৪ জন, দুই মাস পর সেই সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৪০ হাজারের ওপরে। একইভাবে মৃত্যুর হারও বেড়েছে। আমাদের দেশে নিয়ম বা বিধি না মানার অপপ্রবণতা রয়েছে। করোনাকালে তা আরও প্রকটভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে ওঠে। এখনও যে হুহু করে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, নিয়ম কিংবা স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণেই। প্রতিদিনই ভাঙছে আগের রেকর্ড। যে সচেতনতার ওপর সঙ্গত কারণেই এত জোর দেওয়া হচ্ছে, এর বেহাল দশাও নিত্য দৃশ্যমান। সন্দেহ নেই, এক ভয়াবহ টানাপোড়েনের মধ্যে সরকার ছুটি না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ছুটির কারণে অর্থনীতি ব্যাপক হুমকির মুখে পড়েছে, একই সঙ্গে জীবিকায় আঘাত লেগেছে।
কিন্তু নানামুখী ক্ষতি ঠেকাতে প্রায় সবকিছু খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত তার পরও প্রশ্নবিদ্ধই। গণপরিবহন কিংবা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ অবস্থায় কী করে কে কতটা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন বা চলতে পারবেন তাও জরুরি প্রশ্ন। যে টানাপোড়েনের কথা বললাম এই অবস্থা শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা বিশ্বের। অনেক দেশই করোনার ধাক্কায় শুরুতেই বেসামাল হয়ে পড়ে। আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ নই। কাজেই এই ধাক্কা এখন পর্যন্ত আমাদের যতটা বেসামাল কিংবা উদ্বিগ্ন করেছে, ভবিষ্যতে এর মাত্রা হবে আরও বেশি। গত ঈদে আন্তঃজেলা যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার কারণে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ সম্পূর্ণভাবে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে শিকড়ের টানে আবেগের বশে ছুটে যান, তারা আবার একইভাবে ঢাকায় ফিরেও এসেছেন। এর ফলে সারাদেশেই করোনা ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে। এখন আবার প্রায় সবকিছু খুলে দেওয়ায় তা আরও বাড়ল।

অর্থাৎ একদিকে ঝুঁকি সামাল দিতে গিয়ে সামাজিক সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলা হলো। কথা হলো, এই পরিস্থিতি কি অন্যভাবে সামাল দেওয়া যেত না। এ নিয়ে নানামুখী বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি, অন্তত ১৫ জুন পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে আরও কঠোরতা অবলম্বন করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অভিমত অনুসারে চললে ভালো হতো। সরকার দেশের বিপন্ন-বিপর্যস্ত মানুষসহ নানা স্তরের প্রতি সহযোগিতা-সহায়তার হাত যেভাবে বাড়িছে, সেভাবেই আরও ১৫ দিন কঠোর নজরদারি রেখে চললে হয়তো স্বাস্থ্যঝুঁকির মাত্রাটা একটু হ্রাস পেত। এখন প্রশাসনের তরফে ‘শর্তসাপেক্ষ’ কিংবা ‘সীমিত পরিসর’-এর যেসব কথা বলা হয়েছে বা হচ্ছে, এর প্রতি মান্যতা কতটা দেখা যাবে তাও বড় প্রশ্ন। আগেই বলেছি, আমাদের সমাজে অনেকেই আইন-নিয়ম-বিধি লঙ্ঘনেই তৎপর থাকেন। এই যে অপপ্রবণতা, তা নতুন কিছু নয়।

আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, সরকারি ‘নিয়ন্ত্রণ’ অনেক ক্ষেত্রে বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরোর মতো হয়। অনেকের মতো আমিও মনে করি, সংক্রমণ বিস্তার ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ না করাটা আরও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। আমাদের অভিজ্ঞতায় এও আছে, যেসব দেশ শুরুতে এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেনি, তাদের অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়েছে। আমার মনে হয়, আমরাও আগামী ১৫ দিন নতুন করে পুনর্বার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছি। এমতাবস্থায় ব্যক্তিগত সতর্কতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এ ব্যাপারে হেলাফেলার ফল ভালো হবে না। বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই বলে আসছেন, সংক্রমণ ঝুঁকি আরও কিছুদিন প্রকট থাকবে। উদ্বেগের বিষয় হলো, জনপরিসরে শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার ব্যাপকভাবে ব্যত্যয় ঘটে চলেছে।
অর্থনীতির আরও ক্ষতি এড়ানো এবং জীবনযাত্রার জন্য আয়-রুজির স্বার্থে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনঃশুরু করার বিকল্প যেহেতু নেই, সেহেতু সংক্রমণ নূ্যনতম মাত্রায় সীমাবদ্ধ রাখার প্রতি অবশ্যই গভীর মনোযোগী হতে হবে। আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবার পথ আরও সুগম করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার গাফিলতি কী ভয়াবহ হতে পারে, এ ব্যাপারে সমাজে গণমাধ্যমের সাহায্যে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে অধিকতর সজাগ করার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সরকারকে আরও মনোযোগ দিতে হবে চিকিৎসার পরিধি ও সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারে। করোনা হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি, সংশ্নিষ্ট জনবল নিয়োগসহ সবার চিকিৎসার পথ নিস্কণ্টক করতেই হবে।
সরকারি তরফে যেসব সতর্কতা ও শর্তের কথা বলা হয়েছে, নতুন প্রেক্ষাপটে প্রকৃতপক্ষে তা যথাযথভাবে মেনে চলা হচ্ছে কিনা এই তদারকি ব্যবস্থায় বিদ্যমান ঢিলেঢালাভাব দূর করতে হবে। সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের দায়দায়িত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি ব্যক্তির দায়ও অধিক। অর্থাৎ নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রত্যেককেই সচেতনতা, দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে নিষ্ঠ হতে হবে। আমাদের এখানে ‘লকডাউন’ ব্যবস্থা কার্যত বিফলে যায় টার্গেট পিপল অব্যবস্থাপনার কারণে। সরকারের নানামুখী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের জন্য বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে। সরকার এমন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বটে; কিন্তু এই দুর্যোগেও কিছুসংখ্যক লোভাতুর মানুষের লোভের গ্রাসের যে অপছায়া সমাজে পড়েছে, ভবিষ্যতের জন্য এ কারণে তিক্ত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আরও কঠোর হতে হবে।
ইতোমধ্যে এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমা অব্যাহত থাকলেও আমাদের পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ‘স্বাস্থ্য নাকি অর্থনীতি’ কোনটা বড়- এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া যেহেতু কঠিন, সেহেতু সচেতনতায়ই আমাদের ভরসার পথ বেছে নিতে হবে। এখনও আমরা করোনা সংক্রমণে ঊর্ধ্বমুখী যে অবস্থান দেখছি, এর জন্য আমরা নিজেরাও কম দায়ী নই। আমরা যেন ভুলে না যাই, রোগী কমানোর জন্য বেশ কিছু ইন্টারভেশন লাগে। লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, টেস্টিং ইত্যাদি অত্যন্ত জরুরি। এসব কতটুকু ভালোভাবে চলবে তার ওপর নির্ভর করবে আক্রান্ত হ্রাসের বিষয়।
আমাদের আরও মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, যেহেতু করোনার ভ্যাকসিন কিংবা সুনির্দিষ্ট ওষুধ এখনও আবিস্কৃত হয়নি, তাই প্রধান অবলম্বন ছিল লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে আরও কিছুদিন ধরে রাখা। এজন্য বিশেষ মনোযোগ দেওয়া দরকার বলে মনে করি, সংক্রমণের ঘনত্বের বিবেচনায় জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে অধিকতর সজাগ থাকা। অর্থনীতির ক্ষত আরও বিস্তৃত না করার জন্য করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকি কতটা বাড়ছে, এ বিষয়টি সার্বক্ষণিক গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রাখতে হবে। কেটে যাক অন্ধকার, মানুষের প্রচেষ্টা-সচেতনতায় মুক্তির পথ প্রশস্ত হোক।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, সভাপতি সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন

শেয়ার করুন