ওপারে ভালো থাকুন প্রিয় হেড স্যার

মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম:মঙ্গলবার দিবাগত রাত ভোর সাড়ে ৪টা থেকে বাজতে থাকে মোবাইল ফোন। ভাবলাম, নিশ্চয় কোন দু:সংবাদ। ফোন রিসিভ না করে ফেসবুকের নিউজফিডে ঢুকেই জানা গেল, সেই দু:সংবাদটি। আমাদের প্রিয় হেড স্যার জনাব মো: আব্দুল হক আর ইহলোকে নেই। তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না–রাজিউন)।

ভাটরাই উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তণ ছাত্র হিসাবে স্যারের এই অবেলায় মৃত্যু আমাদের জন্য খুবই পীড়াদায়ক। এমনিতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সর্বত্র দু:সংবাদের ছড়াছড়ি। তার ওপর স্যারের মৃত্যু-দু:সংবাদের মাত্রা যেন আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

১৯৫৭ সালে কোম্পানীগঞ্জের ভাটরাই উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে আরো কয়েকজন শিক্ষক প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব পালন করলেও প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর থেকেই স্যার এই প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জনের পর পিতার অনুরোধে স্যার হাল ধরেন এই প্রতিষ্ঠানটির। মূলত, তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠানটি লাভ করে পূর্ণতা। স্যারের পিতা কোম্পানীগঞ্জের ভাটরাই গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মরহুম জনাব ছিফত উল্যাহ ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি। মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জনের পর পিতাই তাকে এ প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেন। কয়েক বছর আগে স্যার আলাপকালে জানিয়েছিলেন, তার বন্ধু-সহপাঠীদের অনেকেই সরকারি-বেসরকারি চাকুরিতে উচ্চ পদে প্রতিষ্ঠিত। স্যার এই প্রতিষ্ঠানে যোগ না দিলে হয়তো চাকুরিক্ষেত্রে অনেক উপরে যেতে পারতেন। কিন্তু, এই প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর তিনি আর অন্য কোন চাকুরিতে যোগদানের চেষ্টাও করেননি।

ছাত্র থাকাকালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে স্যারের অগাধ দখল ও পান্ডিত্য দেখেছি। বিশেষ করে ক্লাসে তাঁর বাংলার লেকচার ছিল খুবই মনোমুগ্ধকর ও উপভোগ্য। পাঠ্য বইয়ের গতানুগতিক পাঠ্যসূচির বাইরে পাঠদানে তিনি আরো অনেক বিষয় সংযোজন করতেন। যা শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দানের ক্ষেত্রে সহজতর হতো। ছিলেন বিদ্যালয়ের একজন জনপ্রিয় শিক্ষকও। তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে ‘হেড স্যার’ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।

১৯৮৮-১৯৯২-এই পাঁচ বছর ছিলাম ভাটরাই উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। আমাকে ও আমার এক বছরের জুনিয়র মুহাম্মদ শাকির উদ্দিনকে (সালুটিকর কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ) বিদ্যালয়ের আদর্শ ছাত্র হিসাবে স্যারের আদর্শ ছাত্র হিসাবে ঘোষণার বিষয়টি আজো চোখে ভাসে। স্যারের সাথে রয়েছে আরো অনেক স্মৃতি। বিশেষ করে ৮ম শ্রেণীর জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার সময় পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে আমাকে ও আমার আরেক সহপাঠী শামছুলকে (নাজিরেরগাঁও) সিলেটে নিয়ে এসে বৃত্তিতে অংশগ্রহণ করিয়েছিলেন স্যার।

স্যারের অনেক ছাত্র আজ বিভিন্ন পর্যায়ে সুপ্রতিষ্ঠিত। বিশেষ করে ভাটরাই উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান সহকারী প্রধান শিক্ষক জনাব রফিকুল হক ঠান্ডা স্যারও স্যারের ছাত্র। এছাড়া, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব জনাব মোহাম্মদ শামছুল ইসলাম, একুশে টেলিভিশনের হেড অব অ্যাকাউন্টস ব্রজমনি সিংহ, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী কমিউনিটি নেতা জনাব নূর উদ্দিন, কোম্পানীগন্জ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রেসিডেন্ট আমিনুর রশীদ, বর্তমান সভাপতি কামাল মোস্তফা গোলাপ,সিলেট জেলা বারের আইনজীবী এডভোকেট বদরুল আলম ও এডভোকেট আজমল আলী, সিলেট চেম্বারের সাবেক পরিচালক জনাব মুজিবুর রহমান মিন্টু, থানা সদর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক সুনীল চন্দ্র বিশ্বাস, কোম্পানীগঞ্জ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অখিল চন্দ্র বিশ্বাস, যুক্তরাজ্য প্রবাসী শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র জয়দেব শেখর রায় মঞ্জু, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক এনায়েতুল ইসলাম. ঢাকায় চাকুরিরত আব্দুল হাই জামান ও ডা: আবুল কাহহার কামরান, কোম্পানীগন্জ প্রবাসী সমাজ কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মঈন উদ্দিন মণি

সহ স্যারের অনেক ছাত্রই আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।

প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সভাপতি ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সদ্য প্রাক্তণ সাংগঠনিক সম্পাদক জনাব মোহাম্মদ আলী দুলাল জানান, ষাটোর্ধ্ব জনাব আব্দুল হকের চাকুরির মেয়াদ শেষ হয় দুই বছর আগে। প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থে তাকে অধ্যক্ষ হিসাবে পুনরায় নিযুক্ত করা হয় । জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এ প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ পদে দায়িত্বরত ছিলেন।

পবিত্র আল কোরআনের অমোঘ বাণী-প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। সৃষ্টিকর্তার সেই অপার নিয়মে স্যার চলে গেছেন পরপারে। স্যারের স্ত্রী, দুটি সন্তান রেদওয়ান ও স্বাথীকে আল্লাহ যাতে-এ শোক সইবার সামর্থ্য দান করেন আল্লাহর কাছে সেই প্রার্থনা করছি। আল্লাহ স্যারকে জান্নাতবাসী করুন। পরপারে ভালো থাকুন স্যার। আমিন।

মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম: চিফ রিপোর্টার দৈনিক সিলেটের ডাক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিলেট প্রেসক্লাব।

শেয়ার করুন