খাদ্য নিরাপত্তা ও নারী কৃষিকর্মীর মূল্যায়ন

ড. এজাজ মামুন

‘সাম্যের গান গাই-/আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।/ বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”

কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘নারী’ কবিতায় এই কথাগুলো লিখে গেছেন বহু বছর আগে। এ শুধুই পঙিক্তমালা মাত্র নয়, নারী-পুরুষ সমতার শাশ্বত বিবৃতিও বটে। বিশ্বব্যাপী নারীরা তাদের মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য এখনো সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এই সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল শতাধিক বছর আগে। আমাদের দেশে মহীয়সী বেগম রোকেয়া, যিনি ছিলেন এ অঞ্চলের মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত, এর সূচনা করেছিলেন আঠার শতাব্দীর শেষ দিকে প্রথমত শিক্ষার আলোহীন নারী সমাজের একজন হয়ে নিজেকে স্বশিক্ষিত করার মতো দুঃসাহসিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়ে। তারপরেও নারীর অগ্রযাত্রার পথ আজও সম্পূর্ণ অবারিত হয়নি। তারপরেও বললে অত্যুক্তি হবে না যে পরিবারে শুধু মা, আত্মজা, ভগ্নি কিংবা জায়া হিসেবেই নয়, আমাদের অর্থনীতি আর প্রগতির চাকাকেও আজ বহুলাংশে সচল রেখেছেন নারীরাই। আমাদের কৃষি আর পোশাক শিল্প যা দেশের সার্বিক উন্নয়নে অপরিসীম ভূমিকা রাখছে, তার মূল চালিকা শক্তি হলো নারী। গত এক দশকে শিল্পখাতে নারীর কর্মসংস্থান ৩৫ শতাংশ বাড়লেও পুরুষের কর্মসংস্থানের তুলনায় তা অনেক কম। দেশের মোট কর্মসংস্থানের (প্রায় ৬.৪ কোটি) মাঝে মাত্র ২৮.৪ শতাংশ (১.৮ কোটি) নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। শিল্পখাতে নারীর কর্মসংস্থানের হার অনেকটা বাড়লেও এখনো কৃষিই তাদের কর্মসংস্থানের প্রধান খাত।

আমাদের দেশে কৃষি উত্পাদনে নারীদের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য অনেক অবদান রয়েছে। প্রত্যুষে গবাদিপশুর যত্ন থেকে শুরু করে, সবজি চাষ, বীজ সংরক্ষণ, বীজতলার যত্ন, ফসল কর্তন, ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষেতে সেচযন্ত্র পরিচালনা ও পরিচর্যা, হাঁস-মুরগি পালন সব কাজেই তারা সক্রিয়। বলা হয়ে থাকে কৃষি উত্পাদনে নারীরা ২০টির অধিক ধরনের কাজ করে থাকেন। বেসরকারি হিসাবে বলা হয়, প্রায় ৬ কোটি নারী কৃষি উত্পাদনের সাথে জড়িত। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশের কৃষকের মোট সংখ্যার ৫০ শতাংশই নারী। অথচ নারী কৃষিকর্মীরা কৃষক হিসেবে স্বীকৃত নন। আর কৃষিতে তাদের শ্রমকে যথাযথ মূল্যায়নও করা হচ্ছে না। বহু বছর থেকে গ্রামীণ তথা সামগ্রিক অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখা কৃষাণীরা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় অনেকটা উপেক্ষিত হয়ে আসছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ যাবত দেশের জাতীয় সংসদে নারী সংরক্ষিত আসনে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তির অন্যতম এই নারী কৃষিকর্মীদের প্রতিনিধিত্ব করার মতো কাউকে নির্বাচন করা হয়নি। অন্যদিকে একজন পুরুষ কৃষক আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিতে যে ধারণা ও জ্ঞান পেয়ে থাকেন, তাদের দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে পারেন, নারী কৃষিকর্মীরা অনেক ক্ষেত্রেই তা থেকে বঞ্চিত হন। গৃহস্থালি কাজের সাথে অধিক সম্পৃক্ততা ও সুযোগের অভাব নারী কৃষিকর্মীদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।

বৈশ্বিকভাবে ২০৫০ সালে ৯ বিলিয়ন মানুষের খাদ্য নিশ্চয়তা বিধান করার জন্য নারী কৃষিকর্মীর ভূমিকা অপরিসীম। নারী কৃষিকর্মীকে পুরুষের সমান সুযোগ দিলে কৃষি উত্পাদন ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের যুগান্তকারী গবেষণা প্রমাণ করেছে অপুষ্টি আর মঙ্গা সরাসরিভাবে খাদ্য নিরাপত্তার সাথে যুক্ত। শুধু খাদ্যের উত্পাদন বাড়ালে হবে না, খাদ্যের প্রাপ্যতা যাতে সবার জন্য যথাযথ ও সহজ হয় সে ব্যবস্থাও নিতে হবে। আর এজন্যও এই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। যেখানে কৃষাণীরা মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারেন। আমাদের দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পুষ্টির নিশ্চয়তা বিধান করতে হলে দেশের ৬ কোটি কৃষাণীকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের প্রথাগত শিক্ষা, প্রয়োজনে বয়স্ক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে— যাতে করে তারা নতুন প্রযুক্তি যথাযথভাবে বুঝতে পারেন। গ্রামীণ পর্যায়ে কৃষাণী কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কিংবা মোবাইল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেখান থেকে তারা কৃষি উত্পাদনের যে ধরনের কাজের সাথে জড়িত সে বিষয়ে আধুনিক ও জুতসই জ্ঞান অর্জন করতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন কম্পিউটার, ইলেক্ট্রনিকস ডিভাইস চালনায় তাদের প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করাও আবশ্যক। পাশাপাশি নারী কৃষিকর্মীরা যাতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে পারেন সে ব্যাপারেও তাদেরকে সচেতন করা দরকার। সবচে বড় কথা হলো, গ্রামীণ এই কৃষাণীদের কৃষক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা দিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ও কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা নারীদের বঞ্চিত রেখে নারীর উন্নয়ন সম্ভব নয়, সম্ভব নয় দেশের অর্থনীতিকে নিরাপদ করা।

লেখক :প্রবাসী বিজ্ঞানী

উৎস: ইত্তেফাক

শেয়ার করুন