আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা কি খুবই দুর্বল!

রেজানুর রহমান

মাথায় অনেক প্রশ্ন আসে দিচ্ছে না কেউ জবাব তার। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—একটি রাষ্ট্রের মানুষের জন্য এ পাঁচটি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান তো ঠিকই আছে। শুধু ঝামেলা হচ্ছে শিক্ষা আর স্বাস্থ্য নিয়ে। দেশে শিক্ষার মানের অবনতি ঠেকানো যাচ্ছে না। আর তাই মেধাবীরা সুযোগ পেলেই বিদেশে চলে যাচ্ছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে করুণ অবস্থা। অথচ দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর চিকিৎসাকেন্দ্রের অভাব নেই। হাত বাড়ালেই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছড়াছড়ি। হাত বাড়ালেই নামিদামি অনেক হাসপাতাল। তবুও মেধাবীরা ছুটছে বিদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটু সর্দি হলেই সাধারণ মানুষও ছুটে যাচ্ছে পাশের দেশ কলকাতায়, বেঙ্গালুরু ও দিল্লিতে। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের নাম জানে না বাংলাদেশে এমন মানুষ বোধকরি পাওয়া যাবে না। ভারতের অনেক ছোট শহরেও লেখাপড়ার জন্য শিশু-কিশোরদের পাঠাচ্ছি। আর কলকাতা তো চিকিৎসাসেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেরই বিশ্বস্ত শহর। কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকার হোটেল ব্যবসা বলা যায় বাংলাদেশের মানুষের কারণেই জমজমাট। একজন রোগীর সঙ্গে হয়তো আরো তিনজন যায়। থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা ও মার্কেটিং বাবদ অনেক টাকা খরচ করে। তবুও সেখানে যায়। কারণ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে একটা বিশ্বাস পোক্ত হয়েছে যে কলকাতায় ভালো চিকিৎসা হয়। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসাব্যবস্থা অনেক ভালো। বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের এই আস্থাটা আসছে না কেন? সমস্যাটা কোথায়? শরীরের একটু সমস্যা হলেই আমরা কেন বিদেশের কথা ভাবছি। গ্রামের সাধারণ মানুষও জমিজমা বিক্রি করে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। কেন যাচ্ছে? দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থা পাচ্ছে না বলে তো বিদেশে যাচ্ছে। তার মানে কি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় যাঁরা জড়িত আছেন তাঁরা দক্ষ নন? তাঁরা ভালো চিকিৎসা দিতে জানেন না? সেটাই বা বলি কী করে? আমরা যারা সাধারণ মানুষ, যাদের বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই, তারা তো দেশেই চিকিৎসাসেবা নিয়ে বেঁচে আছি। আমাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ অনেক সরকারি- বেরসকারি হাসপাতালে উন্নতমানের চিকিৎসা হচ্ছে। তবু চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী প্রবণতা কমছে না; বরং বেড়েই চলেছে।

ভারত অপেক্ষা সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড তো একটু দূরের দেশ। অথচ সেখানেও চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের মানুষের অনেক আগ্রহ। আর ভারতের কলকাতা তো চিকিৎসাসেবার জন্য অনেকের কাছে প্রিয় শহর? কলকাতা একটি দেশের প্রাদেশিক রাজধানী শহর মাত্র। আর ঢাকা একটি দেশের রাজধানী শহর। অবস্থানগত কারণে তো কলকাতার মানুষের ঢাকায় আসার কথা চিকিৎসাসেবা নেওয়ার জন্য। অথচ ঘটছে তার উল্টোটা। ঢাকার মানুষই কলকাতায় যাচ্ছে চিকিৎসাসেবা নিতে। আবারও ওই প্রশ্নটাই মাথায় খেলছে—তাহলে কি বাংলাদেশে চিকিৎসার মান ভালো নয়? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ভারতেরই একজন নামকরা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। নাম দেবী শেঠি। সবার প্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য জরুরিভাবে আকাশে উড়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন তিনি। মাননীয় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তিনি বলেন, এখানে (ঢাকায়) এরই মধ্যে যা চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে পৃথিবীর উন্নত দেশেও তাই দেওয়া হতো। তার মানে দেবী শেঠির কথায় স্পষ্ট প্রমাণিত বাংলাদেশেও উন্নতমানের চিকিৎসা হয়। তাহলে আমরা কেন দেশ ছেড়ে বিদেশের প্রতি এত আগ্রহ প্রকাশ করি।

বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে হলে কতই না ঝক্কি-ঝামেলা। ভিসার জন্য লাইনে দাঁড়াও। ভিসা হলেই তো ঝামেলা দূর হয় না। একজন রোগীর জন্য আরো দুজনকে সঙ্গে যেতে হয়। সেটা না হয় হলো। বিদেশে গেলে তো আর খালি হাতে যাওয়া যাবে না। পর্যাপ্ত অর্থ নিয়ে তবেই যেতে হয়। ফলে ধারদেনা করতে বাধ্য হয় অনেকে। জমিজমা, ঘরবাড়ি বিক্রি অথবা বন্ধক রেখেও অনেকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যায়। অথচ দেশেই যদি চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থাটা গড়ে উঠত, তাহলে এভাবে অসহায় মানুষকে বিদেশে যেতে হতো না। অহেতুক বিদেশ যাত্রার ঝক্কি-ঝামেলা কমে যেত। সবচেয়ে বড় কথা, চিকিৎসার জন্য দেশের টাকা দেশেই থাকত…তবু কেন মানুষ বিদেশে যায় চিকিৎসার জন্য? এর একটাই কারণ, আস্থা ও বিশ্বাসের কারণে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে ডা. দেবী শেঠির পরিচিতি ব্যাপক। এর একটাই কারণ তাঁর অমায়িক ব্যবহার। কথায় আছে চিকিৎসকের ব্যবহারের গুণেই রোগী অর্ধেক ভালো হয়ে যায়। তার মানে কথাটি কী দাঁড়াল, আমাদের দেশের সম্মানিত চিকিৎসকরা রোগীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি ছোট্ট ঘটনার কথা বলি। আমার স্ত্রীর চোখের সমস্যা দেখা দিলে দেশের নামকরা একটি চক্ষু হাসপাতালে প্রথমে চিকিৎসার জন্য গেলাম। চিকিৎসক মহোদয় রোগীকে দেখে বললেন, চোখে ইনজেকশন পুশ করতে হবে। ইনজেকশনের তিন ধরনের মূল্য তালিকা দেখে অবাক হলাম। ১৫ হাজার থেকে শুরু করে ৪৫ হাজার টাকায় তিন ধরনের ইনজেকশন পাওয়া যাবে। রোগীকেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হলো। দোটানায় পড়ে গেলাম। ১৫ হাজার টাকার ইনজেকশন নিশ্চয়ই ভালো হবে না। সবচেয়ে দামিটার প্রতিই রোগীর আগ্রহ। বাধ্য হয়ে ৪৫ হাজার টাকার ইনজেকশন চোখে পুশ করা হলো। পর পর আরো দুই মাস রোগীর চোখে দুটি ইনজেকশন পুশ করতে হবে। কিন্তু চিকিৎসক চোখ ভালো হওয়ার নিশ্চয়তা দিলেন না। তবে এটা বললেন, চোখ এখন যেমন আছে তার থেকে আর অবনতি হবে না। তিন মাস ইনজেকশন দেওয়ার পরও কাজের কাজ কিছুই হলো না। তত দিনে রোগীর মাথায় আত্মীয়-স্বজনরা গোপন মন্ত্র ঢুকিয়ে দিয়েছেন, কলকাতায় যাও। ওখানে ভালো চিকিৎসা হবে। ঢাকা থেকেই একজন চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে কলকাতায় রওনা দিলাম। বলা বাহুল্য, আমার স্ত্রীর চোখ আগের চেয়ে এখন অনেক ভালো। কলকাতার চিকিৎসক রোগীর চোখে কোনো ইনজেকশনই পুশ করেননি। শুধু কিছু তরল পদার্থ চোখে নিয়মিত ড্রপ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাতেই কাজ হয়েছে। সেই থেকে আমার স্ত্রী কলকাতার ডাক্তার বলতে অজ্ঞান।

আমরা দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখতে চাই। ছোট্ট এই দেশে অনেক মানুষ। সে তুলনায় বোধকরি চিকিৎসকের সংখ্যা কম। গ্রামের হাসপাতালগুলোতে দক্ষ চিকিৎসকরা থাকতে চান না। ফলে অনেক রোগীই ঢাকার হাসপাতালগুলোর দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়ে। অনেকে বাধ্য হয়ে বিদেশেও চিকিৎসার জন্য পাড়ি জমায়! এই পরিস্থিতির একটা সন্তোষজনক সমাধান হওয়া জরুরি। কেউ কি কখনো শুনেছেন সিঙ্গাপুরের কোনো সাধারণ মানুষ বাংলাদেশে চিকিৎসা নিতে এসেছে? কলকাতার কোনো রোগী ঢাকায় এসেছে চিকিৎসা নিতে? বোধকরি শোনেননি। কিন্তু এটাই তো হওয়ার কথা ছিল। প্রিয় দেশটা তো উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সগৌরবে এগিয়ে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আমরা বোধকরি কম নজর দিচ্ছি।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক-আনন্দ আলো

উৎস: কালের কণ্ঠ

শেয়ার করুন