রমজানের শুভ উদ্বোধন শবেবরাত


ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী:শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে বলা হয় শবেবরাত, মুক্তির রাত। এই মহিমান্বিত রাতকে ‘লাইলাতুল মোবারাকা বা বরকতময় রাত বলেও অভিহিত করা হয়েছে। কোরআন মাজিদের সুরা দুখানের শুরুতে লাইলাতুল মোবারাকা নামকরণের তাৎপর্য সম্পর্কে দুটি মত রয়েছে। প্রথম মত হলো, এর অর্থ লাইলাতুল কদর। অপর মত অনুযায়ী এটি শবেবরাত। শবেবরাত নামকরণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে : এ রাতকে লাইলাতুল মোবারকা নামে অভিহিত করার কারণ হচ্ছে, ‘এই পুণ্যরাতে বিশিষ্ট ফেরেশতারা দুনিয়ায় আগমন করেন, দুনিয়ায় আল্লাহর রহমতের বারিধারা বর্ষিত হয়। মানুষের আর্ত-ফরিয়াদ রাব্বুল আলামিনের দরবারে মঞ্জুর করা হয় এবং ইবাদত-বন্দেগির মর্যাদা ও গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। অথবা এর কারণ, এই রাতে মানুষের ধন-সম্পদ, জীবিকা ও জীবন-মৃত্যুসহ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির বার্ষিক বাজেট নির্ধারিত হয়। আর এই রাতে আল্লাহর দরবারে উম্মতের গোনাহ মুক্তির জন্য হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কৃত সুপারিশ সম্পূর্ণভাবে মনজুর করা হয়। এই শেষোক্ত অর্থে একে লাইলাতুল বরাত বা মুক্তির রাত বলা হয়েছে।’ (তফসিরে রহুল মাআনী সুরা দুখানের ৩নং আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গ)।

তাফসিরে খাজেনে হজরত ইকরামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : লাইলাতুল মোবারাকা অর্থ হচ্ছে ১৪ শাবান দিবাগত রাত। এই রজনীতে সারা বছরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির ফয়সালা করা হয় এবং জীবিতদের তালিকা থেকে মৃতদের বাদ দেওয়া হয়। অতঃপর তাতে কোনোরূপ বৃদ্ধিও করা হয় না বা কমানোও হয় না। ইমাম বাগবী নিজস্ব বর্ণনাসূত্রে বর্ণনা করেন, হজরত নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন : ‘এক শাবান থেকে অপর শাবান মানুষের পুরো এক বছরের হায়াতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তাতে এমনকি এক ব্যক্তি যে বিবাহ-শাদি করবে এবং তার সন্তান-সন্তুতি হবে তাও নির্ধারিত হয়।’ হজরত ইবনে আব্বাসত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা নিসফে শাবান (মধ্য শাবান) রাতে দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়ের বার্ষিক বাজেট ও ফায়সালা নির্ধারণ করেন এবং শবে কদরের রাতে সেগুলো সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের ওপর ন্যস্ত করেন।’ (তাফসিরে খাজেন)।

কোরআন-হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনাভঙ্গি ও বুজুর্গানে দ্বীনের কর্মজীবনের দৃষ্টান্তগুলো পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, শবেকদরের পর বছরের সর্বাধিক সম্মানিত ও বরকতপূর্ণ রাত হলো শবেবরাত। অন্যদিকে শবেকদর পরম সম্মানিত ও তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ায় আল্লাহ তায়ালা সেই রাতকে সৌভাগ্যশালী বান্দাদের জন্য লুক্কায়িত রেখেছেন। অর্থাৎ শবেকদর কোন দিন হবে নির্ধারিত নেই। শুধু আল্লাহর অনুগ্রহশীল বান্দারাই তা লাভ করতে পারে। কিন্তু শবেবরাতের রাত সুনির্দিষ্ট ও সবার জানা আছে এবং শাবান মাসের মধ্যগগনে চতুদর্শী চন্দ্রের প্রবল জোছনা ধারায় সমুজ্জ্বল। প্রত্যেক মুসলমান নর-নারী এ রহমতের জোছনা প্লাবনে অবগাহন করে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র হতে পারে। আল্লাহর দরবারে আর্তি-ফরিয়াদের মাধ্যমে আপন ভাগ্যলিপিকে স্বীয় চাহিদা মাফিক লিপিবদ্ধ করানোর সুযোগ লাভে সক্ষম হয়। এই মহিমান্বিত পবিত্র রজনীর মহাত্ম্য ও তাৎপর্য সম্পর্কে এখানে খুব সংক্ষেপে আলোকপাত করতে চাই। হাদিস শরিফে এরশাদ হয়েছে :

হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘একদা রাত্রিতে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে শয্যাপাশে পেলাম না। (তখন তালাশে বের হয়ে) দেখি, তিনি বাকি নামক (মদিনাবাসীদের) কবরস্থানে আছেন। (তিনি আমাকে দেখে) বললেন, আয়েশা! তুমি কি মনে করেছ যে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল তোমার প্রতি অবিচার করবেন? আয়েশা বলেন, আমি বললাম : ইয়া রাসুলাল্লাহ! (সত্যিই) আমি ধারণা করেছিলাম যে, হয়তো আপনি আপনার অপর কোনো বিবির ঘরে চলে গেছেন। তখন হুজুর (সা.) বললেন : আল্লাহ তায়ালা অর্ধ শাবানের রাতে এই নিকটতম আসমানে অবতীর্ণ হন এবং কালব গোত্রের মেষপালের পশম সংখ্যারও অধিক ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন। (আজ সেই রজনী)।’ (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ মিশকাত)।

উপরোক্ত হাদিসের বর্ণনা মোতাবেক হুজুর (সা.) জান্নাতুল বাকি নামক কবরস্থানে গমন ও জিয়ারতের ঘটনা দ্বারা শবেবরাতের রাতে কবর জিয়ারতের বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত প্রমাণিত হয়। তবে জিয়ারতে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে আলোকসজ্জা ও উৎসব করা অবশ্যই শরিয়ত বিরুদ্ধ, বর্জনীয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হারাম।

অপর এক হাদিসে হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত : ‘একদা নবী করিম (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, (আয়েশা) তুমি জান কি এ রাত্রিতে অর্থাৎ শবেবরাতের রাতে কি কি আছে? তিনি বললেন : ইয়া রাসুলাল্লাহ! তাতে কি আছে? হুজুর (সা.) বললেন : এই রাতে নির্ধারিত হয় এই বছর মানুষের মধ্যে কারা মারা যাবে। এই রাতে ওপরে নিয়ে যাওয়া হয় মানুষের কর্মগুলো এবং অবতীর্ণ করা হয় তাদের রিজিকগুলো। অতঃপর হজরত আয়েশা (রা.) হুজুরকে জিজ্ঞেস করলেন : ইয়া রাসুলাল্লাহ কোনো ব্যক্তি কি আল্লাহর রহমত ব্যতীত (আমল দ্বারা) বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না? হুজুর তিনবার করে বললেন : কোনো ব্যক্তিই বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না, আল্লাহর রহমত ব্যতীত। আয়েশা (রা.) বললেন : তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম : আপনিও কি পারবেন না, ইয়া রাসুলুল্লাহ! তখন তিনি আপন মাথার ওপর হাত রেখে বললেন, আমিও না। তবে যদি আল্লাহ তায়ালা আপন রহমত দ্বারা আমায় ঢেকে নেন। এভাবে তিনি তিনবার বললেন।’ (রায়হাকির বরাতে মিশকাত, কিয়ামে শাহরে রামাদান অধ্যায়)।

হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন : অর্ধ শাবানের রাত্রিতে (শবেবরাতে) আল্লাহ তায়ালা (নিকটতম আসমানে) অবতীর্ণ হন এবং তাঁর সব সৃষ্টিকে মাফ করে দেন, মুশরিক ও বিদ্বেষ ভাবাপন্ন ব্যক্তি ব্যতীত।’ (ইবনে মাজাহ)।

অপর হাদিসে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী, অহংকারে পায়ের নিচের গিরা ঢেকে কাপড় পরে এমন ব্যক্তি, পিতা-মাতার আবাধ্য সন্তান, মদ্যপায়ী, অন্যায়ভাবে ট্যাক্স উসুলকারী, সুদখোর, জাদুকর, গণক, ঠাকুর, মানুষ হত্যাকারী ও বাদক প্রভৃতিকেও শবেবরাতে ক্ষমা পাওয়ার হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

(এই রাতে ইবাদত ও পরদিনের রোজার গুরুত্ব সম্পর্কে) হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : যখন অর্ধ শাবান রাত উপস্থিত হয় তোমরা সেই রাতে (নামাজ ও ইবাদতে) জাগ্রত থাক এবং পরের দিন রোজা রাখ। কেননা, এই রাতে আল্লাহ তায়ালা সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই নিকটতম আসমানে অবতীর্ণ হন এবং (দুনিয়াবাসীর প্রতি ডাক দিয়ে) বলতে থাকেন : কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছ কি, যাকে আমি ক্ষমা করে দিতাম। কোনো রিজিক প্রার্থনাকারী আছ কি, তাকে আমি বিপদমুক্ত করতাম। এইভাবে আরও আরও ব্যক্তিকে ডাকেনÑ যতক্ষণ না ফজর হয়।’ (ইবনে মাজাহ মিশকাত)।

হাদিস শরিফ অনুযায়ী শবেবরাতে সম্পূর্ণ রাত নামাজে তেলাওয়াতে, তওবা ইস্তেগফারে কাটিয়ে দেওয়া ও পরের দিনের রোজা রাখার বিরাট সওয়াব ও গুরুত্ব রয়েছে। এছাড়া লাইলাতুল বরাতের বিশেষ নামাজ বা অন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতার ধরাবাধা নিয়ম নেই। বুজুর্গানে দ্বীন বিভিন্ন নিয়মে নামাজ পড়ে ও ইবাদত বন্দেগি করে এই রাত জাগ্রত অবস্থায় কাটিয়েছেন। কোনো কোনো কিতাবে বুজুর্গানে দ্বীনের নিয়ম অনুযায়ী লাইলাতুল বরাতের বিশেষ নামাজের যেসব নিয়ম উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে কেউ ১০ রাকাত, কেউ ২০ রাকাত, কেউ ১০০ রাকাত বা ততোধিক রাকাত নামাজ পড়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার প্রায় প্রত্যেক বর্ণনাতেই প্রতি রাকাতে সুরা ফাতেহার পর সুরা এখলাস ৩ বার, ৫ বার, ৭ বার, ১১ বার, ২১ বার বা ১০০ বার পড়ার কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ প্রত্যেকেই নিজের মনের আগ্রহ ও চাহিদা মোতাবেক পড়তে পারেন। নিয়ত করতে হবে ‘আমি কিবলামুখী হয়ে লাইলাতুল বরাতের দুই রাকাত নফল নামাজের নিয়ত করলাম।’ এ সম্পর্কে হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালি (রহ.) এর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘এহয়াই উলুমুদ্দীন থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে এই আলোচনার ইতি টানছি। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন :

‘১৪ শাবান দিবাগত রাতে ১০০ রাকাত নামাজ পড়বেন। প্রত্যেক দুই রাকাতে সালাম ফিরাবেন। প্রত্যেক রাকাতে সুরা ফাতেহার পর সুরা এখলাস ১১ বার পড়বেন। যদি ইচ্ছা হয় ১০ রাকাত পড়তে পারেন। প্রত্যেক রাকাতে সুরা এখলাস ১০০ বার। পূর্ববর্তীরা এই নিয়মে নামাজ পড়তেন এবং একে কল্যাণের নামাজ বলে নামকরণ করেছিলেন। মহাত্মা হাসান বসরি (রা.) বলেছেন : আমাকে প্রায় ৩০ জন সাহাবি বলেছেন যে ব্যক্তি এই নামাজ এই রাতে পড়ে আল্লাহ তায়ালা তার দিকে ৭০ বার নজর করবেন। প্রত্যেক দৃষ্টিতে তার ৭০টি হাজত (প্রয়োজন) পূরণ করবেন। ছগিরা গোনাহ মাফ হওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।’ (এহয়াউ উলুমুদ্দীন)।

মনে রাখতে হবে, এই মহিমান্বিত রাতে অহেতুক আলোকসজ্জা, বাজি পোড়ানো, পটকা ফুটানো প্রভৃতি শরিয়ত ও শান্তিশৃঙ্খলাবিরোধী জাহেলি প্রথা শবেবরােেতর শিক্ষা ও চেতনার বরখেলাফ। অতীতের গোনাহখাতার জন্য তওবা ইস্তেগফার করা, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও ইবাদত বিশেষত তাহাজ্জুদের নামাজের প্রতি যতœবান হতে হবে।

শবেবরাত বলা যায়, মাহে রমজানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এ জন্য আবহমান কাল থেকে মাদ্রাসা শিক্ষায় পাঠ্য মিশকাত শরিফে শববরাত সম্পর্কিত উল্লেখিত হাদিসগুলো ‘কিয়ামু শাহরি রামাদান’ বা রমজান মাসে রাত জেগে ইবাদত অধ্যায়ে আনা হয়েছে। কারণ শবেবরাত থেকেই শুরু হয় মাহে রমজানকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতিপর্ব।

শেয়ার করুন