জেনারেল ওসমানী

এডভোকেট আব্দুল মতিন চৌধুরী:১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আজকের এই দিনে বাংলাদেশের এক মহান পুরুষের মৃত্যু হয়েছে, যার স্মৃতি উপমহাদেশের মানুষ আজও গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তিনি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গণী ওসমানী। এই মহান নেতার সঙ্গে সিলেটের তদানীন্তন বিভাগীয় বনকর্মকর্তা এ কে ফজলুল হক, সহকারী বন সংরক্ষক মরহুম এটি মজহারুল হক ও আমার সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল, তাঁরই আমন্ত্রণে তাঁর নূর মঞ্জিল (বর্তমানে ওসমানী মিউজিয়াম) বাড়ীতে, একটি বিশেষ কারণে। তারিখটি সঠিক মনে নেই, আগস্টের প্রথম দিকে ১৯৮১ সালে। আমি তখন সিলেট বনবিদ্যালয় প্রশিক্ষক হিসাবে কর্মরত। তাঁর মত এত উঁচু মাপের একজন নেতা আমাদের যেভাবে আদর অভ্যর্থনা করলেন সেটা ভুলার নয়। আমরা সকলেই অভিভূত হয়ে অধির আগ্রহে তাঁর কাছ থেকে কিছু শুনার অপেক্ষায় ছিলাম। তিনি অতি বিনীতভাবে আমাদেরকে তাঁর বাড়ীর পশ্চিম দেওয়ালের পার্শ্ববর্তী কয়েকটি মৃতপ্রায় ছোট মাঝারী সাইজের ছয়টি নারিকেলের চারা গাছের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে জিজ্ঞাসা করলেন এগুলোর পরিচর্যার ব্যাপারে কিছু করা যায় কি না? আমরা সরজমিনে গিয়ে দেখলাম, গাছগুলোর অবস্থা নীচু, স্যাঁতসেঁতে
স্থানে বর্ষা কালে জলাবদ্ধতা এবং পার্শ্ববর্তী গাছপালার ছাঁয়াতে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় বাড়তে পারছে না। কাজেই গাছগুলোকে উঁচু স্থানে স্থানান্তর করা দরকার। একথা বলার সাথে সাথে তিনি রাজি হয়ে কাজটি কিভাবে করা যায় এ বিষয়ে আমাদের পরামর্শ চাইলেন। আমার সঙ্গের অপর দুই জন কর্মকর্তা গাছপালা লাগানোর মৌসুমটি প্রায় শেষ হয়ে যাওয়াতে এ কাজটি আগামী সনে সময়মত করার বিষয়ে তাঁদের মতামত ব্যক্ত করলেন। ঐ সময় আমি নীরব ছিলাম। কিন্তু লক্ষ করলাম এই পরামর্শটি ওসমানী সাহেবের মনঃপুত হয়নি। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বল্লেন ‘Hello, What is your opinion’আমি তখন সাহস করে বলে ফেললাম। Sir! I think the job of transplanting may be done even now, though late, but with care. There may be some risk of mortality also. I am really excited to see his smiling face. He said “Yes, I appreciate it. Can you do the job?” আমি বল্লাম ধন্যবাদ স্যার, আমি কাজটি করব। এরপর আমি প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বনবিদ্যালয়ের বাগান কর্মীদের নিয়ে খুব যত্নসহকারে চারাগুলির চতুঃপার্শ্বে গর্ত করে চারাগুলিকে উঠিয়ে বাড়ীর পূর্ব ও দক্ষিণের ওয়ালের পাশ্বের্র উঁচু স্থানে ঠিকমত গর্তকরে চারাগুলি রোপন করি। এতে তিন চার দিন সময় লেগে যায়।
এরপর সকাল বিকাল চারাগুলোর গুড়ায় পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। মাঝে মাঝে বৃষ্টি হওয়াতে চারা গাছগুলো সতেজ হয়ে বাড়তে আরম্ভ করে। ছয়টি চারাগাছের মধ্যে অতিদুর্বল চারাটি মারা যায়। বাকী পাঁচটি গাছ পরিপুষ্ট হয়ে পূর্ণতা লাভ করে এখনও দাড়িয়ে আছে। এই স্মৃতিটুকু আমি ভুলতে পারি না।
গাছগুলির পরিচর্যা তদারকির জন্য আমি অবসর সময়ে প্রায়ই ওখানে যেতাম। অতি দুর্বল চারাটি ব্যতিত বাকী গাছগুলি সতেজ হয়ে সুন্দরভাবে বেড়ে উঠছে দেখে বেশ আনন্দ পাই। আমি মনে করি আমার চেয়েও আনন্দিত ওসমানী সাহেব নিজেই। এ প্রসঙ্গে বলতে চাই, একদিন বেলা অনুমান দুইটার দিকে আমার কর্মস্থল থেকে ফিরে বাড়ী যাওয়ার আগে গাছগুলির পরিচর্যার বিষয়ে খোঁজ নিতে নূর মঞ্জিলে গিয়ে কাজ দেখে ফেরার ঠিক আগ মুহূর্তে স্যারের ওর্ডারলী আমাকে স্যার দেখা করতে বলেছেন বলে জানায়। ফিরতেই দেখি স্যার। সম্মুখের সিড়িতে দাঁড়িয়ে আমাকে আসার ইঙ্গিত করছেন। আমি অগ্রসর হয়ে স্যারকে সালাম দেওয়ার পর বাড়ীর সম্মুখের পর্টিকোতে আমাকে বসতে বলে উনি একটি চেয়ারে বসেই কুশল বিনিময়ের পর আমাকে সরাসরি বল্লেন “` I think you have not taken your lunch. Please take your lunch here and proceeded towards the dining table and asked  to me to follow him’ইত্যবসরে তার ওর্ডারলী টেবিলে আমার জন্য খাবার রেখেছে। আমি আর কোনো বাক্য ব্যয় না করেই খাবার সেরে দেখি ফ্রিজ থেকে আম বের করে তিনি নিজেই সামনে টেবিলে রেখে আমাকে খেতে বললেন। আমি শুধু তার স্নেহমাখা আতিথেয়তায় কেমন যেন অভিভূত হয়ে আছি। লক্ষ করলাম তিনি কী যেন আমার সঙ্গে আলাপ করতে চান। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন,`What is your academic background’.

আমি ইংরেজীতে বল্লাম`In addition to my Forestry education, I am a Law graduate Sir. `Then why are you lingering your service? As a Law graduate you may join the legal profession and contribute a lot in various   social services.’

তিনি আমাকে আরও উপদেশমূলক অনেক কথা বল্লেন। অতঃপর তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও সালাম জ্ঞাপন করে বিদায় নিলাম।

বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী বৃহত্তর সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর পিতার কর্মস্থল সুনামগঞ্জে ১৯১৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের সদস্য হিসাবে সরকারী বিভিন্ন উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। তাঁর মাতা মরহুমা জুবেদা খাতুন একজন ধার্মিক রমণী ছিলেন।
শৈশবে ওসমানী “আতা” নামে সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন। বাল্যকাল থেকেই ওসমানী লেখাপড়ায় মনোযোগী ছিলেন। পিতামাতার নিরলস অনুশাসন এবং যোগ্য গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ওসমানী প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর তিনি গৌহাটির কটনস স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। তিনি সিলেট গভর্ণমেন্ট হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করেন এবং ইংরেজীতে কৃতিত্বের জন্য “প্রিটোরিয়া অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। ১৯৩৪ সনে তিনি উচ্চশিক্ষার্থে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ছাত্র হিসাবে সবসময়ই ওসমানী অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন।
ওসমানী ১৯৩৯ সনের জুলাই মাসে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৪০ সনের ৫ই অক্টোবর ব্রিটিশ আর্মির সর্বকনিষ্ঠ মেজর পদে উত্তীর্ণ হন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি একটি ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক হয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেন। সৈনিক জীবনের দীর্ঘ পরিসরে বঙ্গবীর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়েছেন। ওসমানী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্ণেল পদে কর্মরত থাকাকালীন একজন স্বাধীনচেতা বাঙালি সেনা কর্মকর্তা হিসাবে পরিচিত ছিলেন। অত্যন্ত দূরদর্শী সেনাকর্মকর্তা হিসাবে বাঙালি সেনাদের স্বার্থে পাকিস্তানীদের সঙ্গে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে তিনি ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’ পুনর্গঠন করে দুই থেকে ছয় ব্যাটালিয়ানে উন্নীত করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অধিক হারে বাঙালিদের নিয়োগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। এজন্য বাঙালি সেনারা তাকে পিতৃতুল্য শ্রদ্ধা করেন এবং তাঁকে ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জনক, হিসাবে সম্মান প্রদর্শন করেন। তিনি ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল এর দায়িত্বে নিয়োজিত থাকাকালে ইপিআরএ পাকিস্তানি সেনাদের নিয়োগ বন্ধ রাখেন। বাঙালি সেনাদের স্বার্থ রক্ষার্থে তিনি নিজের পদোন্নতির তোয়াক্কা করেননি। বাঙালিদের প্রতি ওসমানীর এ সমস্ত ত্যাগ এবং নি:স্বার্থ অবদান সমূহ বঙ্গবন্ধুর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ওসমানী ১৯৬৭ সনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন কর্ণেল পদে কর্মরত থাকাকালে অবসর গ্রহণ করেন।
তখন হতে অনেক নেতৃবৃন্দ তাঁকে রাজনীতিতে যোগদান করার জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু, ওসমানী রাজনীতিতে যোগ দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিনের সংগ্রামের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে, পাকসেনাদের হাত থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হলে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ব্যতিত উপায় নেই। কাজেই স্বাধীনচেতা বাঙালি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন যোগ্য সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ওসমানীকেই যোগ্য মনে করেন এবং আওয়ামী লীগে যোগদান করার জন্য ওসমানীকে আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ওসমানী সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দকে সংগঠিত করেন এবং তাঁর সঙ্গে কাজ করার জন্য আহ্বান জানান। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে গণঅভ্যুত্থানের সময় ওসমানী বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মরত সকল অফিসার এবং জোয়ানদের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করার জন্য আহ্বান জানান। তারই ডাকে সাড়া দিয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর সকল কর্মকর্তা সেনা সদস্য তার সঙ্গে যোগ দেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করায় তাদের নেতৃত্বে সাড়া দিয়ে দেশের সকল শ্রেণি পেশার মানুষ আওয়ামী লীগের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়ে দলে দলে যোগদান করেন। এ সমস্ত সেনা সদস্যদের সুযোগ্য নেতৃত্ব ও দক্ষ পরিচালনায় দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে লাখো লাখো মানুষের শাহাদাতের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এই কষ্টার্জিত স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের।
১০ই এপ্রিল ১৯৭১ অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হওয়ার পর ১২ই এপ্রিল ১৯৭১ হতে বঙ্গবীর ওসমানীকে দিয়ে মুক্তি বাহিনী গঠন করা ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে মন্ত্রীর সমমর্যাদায় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সহ মুক্তি বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। জাতির প্রতি দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকার বঙ্গবীর ওসমানীকে ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে কর্ণেল পদ হতে জেনারেল পদে পদোন্নতি দেন।
বঙ্গবীর ওসমানী ১৯৭১ সনের ১০ই এপ্রিল মন্ত্রীসভায় যোগদান করেন। তিনি ১৯৭৩ সনের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং মন্ত্রীসভায় যোগদান করেন। ১৯৭৫ সনের ২৫শে জানুয়ারী সংসদীয় গণতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটিয়ে একদলীয় শাসন “বাকশাল প্রতিষ্ঠাকালীন ওসমানী তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং বিফল হয়ে সংসদ সদস্য পদ, মন্ত্রীত্ব এবং আওয়ামী লীগ হতে পদত্যাগ করেন। তিনি ‘জাতীয় জনতা পার্টি’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। “সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ, অস্ত্রমুক্ত শিক্ষাঙ্গণ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। একজন সেনা শাসক হয়েও গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর এমন অবিচল আস্থা গোটা জাতিকে গণতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এবং অনেক রক্তের বিনিময়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হয়েছে। এটা ওসমানীরই অবদান।
এই মহান নেতা ১৯৮৪ সনের ১৬ই ফেব্রুয়ারী লন্ডনের সেন্টপল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঐতিহাসের এই প্রবাদ পুরুষের প্রতি আমি আমার শ্রদ্ধা জানাই এবং তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করি।

শেয়ার করুন