নতুন বছরে যা যা করা প্রয়োজন

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: এবার ইংরেজি নতুন বছর শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশ ভিন্ন। আমাদের জাতীয় জীবনে ২০২১ সাল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০ সালে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজন করোনা পরিস্থিতিতে স্থগিত রয়েছে; ২০২১ সালে তা সম্প্রসারিত হবে। এটা আমাদের জন্য আনন্দের। ২০২১ সাল আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের অনেক দিয়েছে। শতবর্ষে দাঁড়িয়ে প্রত্যাশা, এই প্রতিষ্ঠান আরও অনেক কিছু দেবে।

নিজেরা যাই বলি, ২০২০ সালে বিশ্বসমাজ আমাদের ব্যাপারে অনেক ইতিবাচক কথা বলেছে। যেমন বিদায়ী বছরের এপ্রিলে দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকা একটি র‌্যাঙ্কিং প্রকাশ করেছে। সেখানে ৬৬টি অগ্রগামী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান নবম। এই র‌্যাঙ্কিংয়ে তারা চারটি বিষয় বিবেচনায় নিয়েছে। প্রথমত. সরকারি ঋণ ও সামষ্টিক আয় অনুপাত, দ্বিতীয়ত. বিদেশি ঋণের পরিমাণ, তৃতীয়ত. ঋণের পরিশোধযোগ্য দায়, চতুর্থত. বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে মুদ্রা রিজার্ভ। এই র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের পেছনে আছে গণচীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা।

অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আইএমএফ ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, করোনা পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। মনে রাখতে হবে, আইএমএফ খুবই রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠান। তার মানে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হতে পারে। সংস্থাটির মূল্যায়নে ১৯টি দেশ ছাড়া সবার ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হবে। এই ১৯ দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। আইএমএফ আরও বলছে, ২০১৯-২০ সালের মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। মাথাপিছু ১১ ডলার বেশি। কথাটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, ১০-১১ বছর আগে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের অর্ধেক হলেও এর সামাজিক রূপান্তর হৃদয় উষ্ণ করা। যেমন তখন গড় আয়ুর ক্ষেত্রে ভারতের তুলনায় চার বছর এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ। এমন আরও কয়েকটি পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতার পরপরই স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ অনেক বেশি হওয়ায় এই অগ্রগতি। এখন আমরা মাথাপিছু প্রবৃদ্ধিতেও ভারতকে ছাড়িয়ে গিয়েছি। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হারে তার সামষ্টিক আয় বাড়িয়ে থাকতে পারে। অন্য একটি ভবিষ্যদ্বাণীতে বুমবার্গ ও এইচএসবিসি বলেছে, ২০২৯ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতকে স্থায়ীভাবে ছাড়িয়ে যাবে। আর দ্য ইকোনমিস্ট ২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বলেছে, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে আমাদের প্রবৃদ্ধি বা সামাজিক রূপান্তরের প্রশংসাবাক্য উচ্চারিত হচ্ছে, তা ইংরেজি নতুন বছরে ধরে রাখতে হলে কী করা প্রয়োজন?

প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বিনিয়োগ প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি খাতে। সরকারি খাতের যে বিনিয়োগ, সেটা করতে গেলে যে সঞ্চয় ও রাজস্ব আদায়ের প্রয়োজন; সেখানে বাংলাদেশ খুবই পিছিয়ে। ট্যাক্স জিডিপি অনুপাতে বাংলাদেশ তলানির দেশগুলোর একটি। এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৭টি দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই অনুপাত বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বিনিয়োগ জিডিপি বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ ও সামষ্টিক আয়ের অনুপাত বর্তমানে ৩২ শতাংশ। এটাকে ৩৫-৩৬ শতাংশে নিতে হবে।

আশার কথা হচ্ছে, অর্থমন্ত্রী গত বছর বাজেট অধিবেশনের সমাপনী পর্বে বলেছেন, ১০-এর নিচে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত আমাদের জন্য লজ্জাজনক। এটাকে আমরা ১৪ শতাংশে উন্নীত করব। আমি মনে করি, সে জন্য আমাদের কর প্রশাসনকে প্রযুক্তিতে দক্ষ করতে হবে। কর ব্যবস্থা ও কর আদায়কারীদের করবান্ধব করতে হবে। অনেকেই আছেন, যাদের অবশ্যই কর দেওয়া উচিত; অথচ তারা করজালের বাইরে। তাদের করের আওতায় এনে বর্তমানে মাত্র ২৫ লাখ করদাতাকে ৫০ লাখে উন্নীত করার জন্য ২০২১ সাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা সাদা এবং মুদ্রা পাচার বন্ধের ঘোষণা আছে। কিন্তু গত ছয় মাসে এমন কোনো কর্মকাণ্ড নজরে আসেনি, যাতে আমদানি ও রপ্তানিতে যথাক্রমে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ এবং ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’ বন্ধ করা যায়।

ওয়াশিংটনের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি ইনস্টিটিউট এবং হালে জাতিসংঘ ও আইএমএফ বলছে, বাংলাদেশ থেকে বছরে ৬০০-৭০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়ে যায়। এটা বন্ধ করা অসম্ভব কিছু নয়। বন্ধ করতে পারলে এবং কালো টাকা সাদা করার ঘোষণায় কয়েকটি পরিবর্তন আনতে পারলে কর রাজস্ব অনেক বেড়ে যাবে। পরিবর্তনের ক্ষেত্রগুলো হলো- ব্যাংকিং ব্যবস্থা, রাজস্ব বোর্ড, আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান। জল, স্থল ও বিমানে যারা তদারকি করেন, তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় মুদ্রা পাচারও বন্ধ করা যাবে। এ ছাড়া কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে যে স্তরের কালো টাকা সাদা হবে, সে স্তরে প্রযোজ্য কর আদায় করতে হবে। সবার জন্য ১০ শতাংশ হার নিয়মমাফিক করদাতাদের প্রতি খুবই অন্যায়। দুটো সরকারি ঘোষণা থাকতে হবে- এভাবে যারা কালো টাকা সাদা করবে, ভবিষ্যতে সরকারের কোনো অঙ্গ এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে পারবে না। ৩০ জুন ২০২১ তারিখের পর যদি কারও কাছে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় থাকে, তাহলে সরকার সেটা বাজেয়াপ্ত করবে। কোনো আদালতে এর বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। এ কয়টা শর্ত পূরণ করা হলে বিপুল কালো টাকা সাদা হবে এবং সেখান থেকে বিপুল কর আদায় হবে।

কৃষিতে বাংলাদেশের যে সাফল্য, এটাকে প্রক্রিয়াজাত শিল্পে রূপান্তর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হতে পারে ২০২১ সাল। একই সঙ্গে কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটিয়ে কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি, বৈষম্য হ্রাসের মাধ্যমে করোনার মারাত্মক ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে নেওয়া যাবে। জনবন্ধু শেখ হাসিনা ঘোষিত চমৎকার প্রণোদনা প্যাকেজের এই কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে কোনো অগ্রগতি নেই। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার খুব প্রয়োজন। বাংলাদেশে মধ্যস্বত্বভোগী চালকলের মালিক এবং কিছু অসাধু খাদ্য কর্মকর্তা এমন শক্তিশালী হয়েছে যে, সম্প্রতি ধান কাটার মৌসুমেও চালের মূল্যে ঊর্ধ্বগতি; পেঁয়াজের সংকট মাঝেমধ্যেই সৃষ্টি হচ্ছে, আলুর দামের অগ্রহণযোগ্য ওঠানামা। পত্রপত্রিকা দেখে মনে হয়, কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রী এই মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যাপারে অসহায়। মিল মালিকরা হুমকি দিচ্ছেন, তারা সরকারের কাছে খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করবেন না। সরকার যদিও আমদানি করছে, সেখানে শুল্ক্ক কমিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদেরই সুবিধা করে দিচ্ছে। আমদানিকৃত চালের ফলে মূল্যও এমন সময় কমবে, যখন চাষিদের নতুন ফসল বিক্রির সময়।

সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদের আলোকে এবং ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ জাতির পিতার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে শক্তিশালী সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সেখানে উৎপাদন ও বিপণন সমবায়ের কিষান-কিষানিরা চাল, আলু, পেঁয়াজ সরকার প্রদত্ত সাশ্রয়ী সুদের ঋণে কিনে নেবেন এবং বছরব্যাপী স্থিতিশীল মূল্যে বিক্রি করবেন। এতে উৎপাদকরা বেশি দাম পাবেন, ভোক্তারা কম দামে কিনতে পারবেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের বিপুল লাভ উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে ভাগাভাগি হবে। এর বিকল্প হিসেবে ছোট ছোট কোম্পানি করেও মৌসুমের সময় ফসল কিনে অন্য সময় বাজারজাত করে মূল্য স্থিতিশীল রাখা যায়।

২০২০ সালে করোনার অভিঘাত ১৯৭টি দেশকে তছনছ করে দিয়েছে। অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান- সবকিছু। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতা, সমন্বয়হীনতা ও ঠিকাদারি দুর্নীতি সত্ত্বেও সরকারপ্রধানের দৃঢ় হস্তক্ষেপে বাংলাদেশে করোনা ব্যবস্থাপনা বেশ ভালো হয়েছে। ব্লুমবার্গ যে করোনা সহনশীলতা সূচক তৈরি করেছে, সেখানে প্রথম ২০টি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে আমূল সংস্কার সময়ের দাবি।

করোনা প্রতিষেধক টিকা আসছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ব্যাপকভাবে টিকা দেওয়া হচ্ছে। সেগুলো মূলত ফাইজার ও মডার্নার। অক্সফোর্ড উদ্ভাবিত টিকা এখনও কোনো দেশে অনুমোদন পায়নি। এর মূল ও পারিপার্শ্বিক ব্যবস্থাপনা, যেমন তাপমাত্রা আমাদের জন্য অনুকূল। তবুও একটি মাত্র টিকার ওপর নির্ভর করা বোধ হয় সমীচীন হচ্ছে না। চীন তাদের টিকা এই দেশে পরীক্ষা করতে প্রস্তুত ছিল, সম্ভব হয়নি। রাশিয়ার প্রস্তুতকৃত স্পুটনিক-ফাইভ টিকা আর্জেন্টিনার মতো জনবহুল ও মারাত্মকভাবে করোনা আক্রান্ত দেশে অনুমোদিত হয়েছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ শুধু একটি টিকা একটি দেশ থেকে আনবে, নাকি এ ব্যাপারে অন্যান্য সম্ভাব্য টিকা এবং সরবরাহকারী ও দেশে বাজারজাতকারী ব্যবস্থা নেবে- ২০২১ সালে সেটা একটা বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে। তবে যদি অক্সফোর্ডের টিকা এ দেশে আমাদানিকারী একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান তাদের সুনাম বৃদ্ধির জন্য বিনামূল্যে অন্তত তিন কোটি প্রথম কিস্তির টিকা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিতরণ করে, তাহলে আমরা সবাই কৃতজ্ঞ থাকব ও ধন্যবাদ দেব।

বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় ও সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি অসহনীয়। সরকার চেষ্টা করছে ই-টেন্ডারের মাধ্যমে এর প্রতিবিধান করতে। কিন্তু ই-টেন্ডার বা অন্য কোনো সংগ্রহ ব্যবস্থা হোক; দৃঢ়হস্ত নীতিমালায় যে পণ্য ও সেবা সংগ্রহ করা হবে তার মান, মাপজোখ, মূল্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হতে হবে। তা বালিশ হোক, ঘরের পর্দা হোক, সড়কের নির্মাণ হোক, ওষুধ হোক- টেন্ডারদাতাদের জানা থাকতে হবে যে, আন্তুর্জাতিক মানে নির্ধারিত মূল্যের বেশি সংবলিত টেন্ডার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে। তারপর চাই বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন। এ ব্যবস্থা চালু করা হলে নূ্যনতম দুর্নীতিতে সরকারি ক্রয় ও সংগ্রহ সম্ভব হবে। বিদায়ী বছরে ক্ষমতাসীন দলের বেশ কয়েকজন যুব নেতা, রাজনীতিক, সংসদ সদস্য আইনের আওতায় এসেছেন। কয়েকজন ‘অপরাধীর’ বিরুদ্ধে এখনও অভিযান চলছে। নতুন বছরে এর আরও প্রসার ও যুক্তিগ্রাহ্য পরিণতি আশা করা যেতেই পারে। ধর্ষণ, হত্যা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও ২০২১ সালে দেখা যাবে, আশা করা যায়। এখানে দ্রুত আইনের বিচার কয়েকটি ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

শিক্ষা খাতে করোনা আমাদের ভবিষ্যৎকে তমসাচ্ছন্ন করে দিয়েছে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা এবারের মতোই চিরতরে স্থগিত করার সুপারিশ করা যায়। তবে আগের মতোই বৃত্তি পরীক্ষা হতে পারে। করোনার কারণে একটি শিক্ষাবর্ষ হারিয়ে গেছে। ২০২১ সালের শুরুতেই বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থায় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় খোলার ব্যবস্থা খুবই জরুরি। উচ্চ মাধ্যমিক ২০২০ সালের পরীক্ষা নিয়ে সঙ্গত কারণেই বিশাল বিতর্ক রয়েছে। সংক্ষিপ্ত পরিসর ও সময়ে বাধ্যতামূলক ইংরেজি ও বাংলা এবং দুটো ঐচ্ছিক বিষয়ে পরীক্ষা প্রথম ও তৃতীয় দিনে নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক দিয়ে তদারকির মাধ্যমে নেওয়া যেতে পারে। এভাবেই যারা পরীক্ষা দেবে, তারা যেন শর্ত সাপেক্ষে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে, সে ব্যবস্থা রাখতে হবে।

রোহিঙ্গা বিষয়ে তৎপরতা ২০২০ সালে সামান্য হলেও তাকে আগামী বছর বেগবান করা যাবে। গাম্বিয়ার আইসিসিতে করা মামলা মিয়ানমারের ওপর একটা চাপ অবশ্যই। ইদানীং আঞ্চলিক চাপও বাড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অকৃত্রিম চিরদিনের বন্ধু জাপান বলেছে, ২০২১ সালে নিজ দেশ থেকে অন্যায়ভাবে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের দেশে প্রত্যাবাসন শুরু- সেটা খুবই আশাব্যঞ্জক। বিবিসি এবং এনজিও প্রভাবিত সংস্থাগুলোর আপত্তি অগ্রাহ্য করে দেশে সাময়িকভাবে আশ্রয় দেওয়া (তারা মোটেও শরাণার্থী নয়) রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করা একটি অতি উত্তম পদক্ষেপ। আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো ২০২০ সালে দুই তীরকে সংযুক্ত করেছে। এর নেপথ্যে ছিল জনবন্ধু শেখ হাসিনা এবং আমাদের বাঙালি জাতির ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা। বিশ্বব্যাংকের খেলো অভিযোগ অবজ্ঞা করে বাংলাদেশের অর্থায়ন, বাংলাদেশের প্রকৌশল ও ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশের শ্রমজীবীদের শ্রমের চমৎকার সমন্বয়ে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান এই সেতু নির্মাণ প্রকল্পে আরেকটু অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে চালু করা যেতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি। এর ফলে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১ দশমিক ৩ শতাংশ যুক্ত হতে পারে। দারিদ্র্য কমতে পারে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, পর্যটন ও অন্যান্য খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান হতে পারে। এর ফলে আয়, সম্পদ ও সুযোগ বৈষম্য কমতে পারে।

পরিশেষে, ২০২১ সাল হতে পারে স্বাধীনতার একটি অপূর্ণ সাধ পূরণের বছর। আমরা জাতি হিসেবে এখনও একাত্তরের সেই নির্মমতা, হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অন্যায়, অবিচারকে জেনোসাইড হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত করাতে পারিনি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে হত্যা ও ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী, সম্মিলিতভাবে তার দলিল-দস্তাবেজ ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারলে এটা সম্ভব। এ ব্যাপারে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, গবেষক মফিদুল হক, অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ ও ড. তুরিন আফরোজের নেতৃত্বে প্রাথমিক কার্যাবলি শুরু করা যেতে পারে।(সংকলিত)।

অর্থনীতিবিদ; বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।

শেয়ার করুন