এমসি কলেজে ধর্ষণ, হোস্টেল সুপার-প্রহরীদের দায়িত্বে অবহেলা ছিল

সিলেটের সকাল ডেস্ক ।। সিলেটে এমসি (মুরিরচাঁদ) কলেজে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ঘটনারতদন্ত প্রতিবেদনে হোস্টেল সুপার ও প্রহরীদের দায়িত্বে অবহেলা পেয়েছে এ সংক্রান্ত যৌথ অনুসন্ধান কমিটি। প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে ওই ঘটনায় অধ্যক্ষও  দায় এড়াতে পারেন না বলে প্রতিবেদনের মতামত অংশে উল্লেখ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৬ জানুয়ারি) সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নওরোজ মো. রাসেল চৌধুরী এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘এই প্রতিবেদনটি আগামী ২৮ জানুয়ারি আদালতে দাখিল করা হবে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ঘটনার সময় কলেজ বন্ধ থাকার পরও কয়েকজন ছাত্র ও সাবেক ছাত্র হোস্টেলে অবস্থান করে। একজন সাবেক ছাত্র ৫ নম্বর ব্লকের হোস্টেল সুপারের বাসভবন দখল করে থাকে। সাবেক ওই ছাত্ররা অবৈধভাবে কলেজে হোস্টেলের সিট দখল করে থাকার কারণে এবং সাবেক ছাত্র সাইফুর রহমান হোস্টেল সুপারের বাসভবন দখল করে থাকার কারণেই তারা কলেজের  এলাকায় দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ করার সাহস পায়। ফলে ঘটনার তারিখে হোস্টেল ক্যাম্পাসে ওই ঘটনার নেপথ্যে মূলত হোস্টেল সুপারের তদারকির ঘাটতি ও দায়িত্বে অবহেলাই দায়ী। তবে প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে কলেজের অধ্যক্ষের ওপরও এর দায়ভার চলে আসে।’

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘সাক্ষী পরীক্ষা ও সামগ্রিক বক্তব্য পর্যালোচনা করে কমিটির সর্বসম্মত মতামত হলো— গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে দলবদ্ধ ধর্ষণের পেছনে মূলত হোস্টেলের বর্তমান তত্ত্বাবধায়করা, হোস্টেলের মূল গেটের ডে গার্ড, ৫ নম্বর ব্লকের ডে গার্ড ও নাইট গার্ড (নৈশ প্রহরী) এবং ৭ নম্বর ব্লকের ডে গার্ড ও নাইট গার্ডের দায়িত্বে অবহেলা ছিল।’ একইসঙ্গে এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেজন্য ১৫ দফা সুপারিশ করা হয়েছে।  সুপারিশের মধ্যে রয়েছে— কলেজের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের চাহিদার ভিত্তিতে হোস্টেলে আসন নিশ্চিত করা। অছাত্র বা সাবেক ছাত্রদের হোস্টেলে বসবাস কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

এর আগে ওই ধর্ষণের ঘটনায় যৌথ তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশ দেন বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া এবং বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিবেদন দাখিল করে চার সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি। চার সদস্যের কমিটিতে ছিলেন— সিলেটের জেলা ও দায়রা জজ মো. বজলুর রহমান, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মমিনুন নেসা, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবুল কাশেম এবং সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শারমিন সুলতানা।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর এমসি কলেজে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা অনুসন্ধানে যৌথ কমিটি গঠন করে দেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি অনুসন্ধানকালে কমিটির সদস্যদের নিরাপত্তা ও তাদের সহযোগিতা করতে পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়াও গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে তাদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবেনা, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন হাইকোর্টের নজরে আনেন আইনজীবী মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন। পরে ওই আইনজীবী গৃহবধূর ধর্ষণের ঘটনায় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে আদালতে আবেদন জানান এবং এর শুনানি করেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে এমসি কলেজে বেড়াতে আসেন এক তরুণী। এসময় ক্যাম্পাস থেকে কয়েকজন ছাত্র ওই তরুণীকে স্বামীসহ কলেজ ছাত্রাবাসে তুলে নিয়ে যায়। পরে তারা স্বামীকে বেঁধে মারধর করে এবং গৃহবধূকে দলবদ্ধ হয়ে ধর্ষণ করে। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।

ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামী সেদিন (২৫ সেপ্টেম্বর) রাতে বাদী হয়ে শাহপরাণ থানায় মামলা করেন। মামলায় এজাহার নামীয় আসামি করা হয় ৬ জনকে। সেই সঙ্গে অজ্ঞাতনামা আরও ২/৩ জনকে আসামি করা হয়। আসামিরা হলো— এম. সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেক আহমদ, অর্জুন লঙ্কর, রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান। এরা সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আসামিদের মধ্যে তারেক ও রবিউল বহিরাগত। বাকিরা এমসি কলেজের ছাত্র। এরই মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত  আসামিদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

-বাংলাট্রিবিউন

শেয়ার করুন