প্রসঙ্গ : মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বিপক্ষ

মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার::আমাদের স্বাধীনতার একটি অ-সুখ আছে। ব্যক্তির অ-সুখ থাকে ক্ষুদ্রবৃত্তে, হয় নিতান্ত ব্যক্তিগত। জাতির স্বাধীনতার অ-সুখ বিরাট বিশাল, সেটা ছড়ানো থাকে জাতির গোটা মানচিত্র জুড়ে। একটি জাতির স্বাধীনতারও ‘বিপক্ষ’ বলে যখন একটা কিছু থাকে, তখন সেই জাতির স্বাধীনতার অ-সুখটি সনাক্ত হয়, প্রয়োজন হয় তার নিরাময়ের। অদ্ভুত শোনালেও সত্যি যে, স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব যখন বয়স ৫০ পূর্ণ করতে চলেছে, তখন এই বাংলাদেশেই স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলে দু’টি ধারার অস্তিত্বের কথা উচ্চারিত হয়ে চলেছে। মোটা দাগে স্বাধীনতার ‘পক্ষ’ তাঁরাই যাঁরা বাংলাদেশের বাঙালি জনগোষ্ঠির স্বাধিকার আন্দোলনের পথ ধরে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্যে জাতিকে প্রস্তুত করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে সফল হয়েছেন এবং সেই সাথে এই ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রাম-যুদ্ধের রাজনৈতিক, সামরিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে আরও যাঁরা ছিলেন মূল ধারার সংগ্রামে সহযোগি-সহযাত্রি, তাঁরা সকলেও আছেন মুক্তিযুদ্ধের ‘পক্ষ’ হয়ে। আর স্বাধীনতার ‘বিপক্ষ’ কারা? এক কথায় এর জবাব: মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে যাদের অবস্থান ছিলো তারা। একাত্তরে জাতির মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে তৎপর কিছু বাঙালিরও অস্তিত্ব ছিলো তখন বাংলার মাটিতে। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে যুদ্ধে বিজয় অর্জন পর্যন্ত স্বাধীনতার এই বিপক্ষের সুসংগঠিত মানুষজন ইসলামের নাম ব্যবহার করে বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে আমাদের স্বাধীনতা ঠেকাতে অস্ত্র হাতেই সক্রিয় ছিলো।
আমরা দেখেছি, পাকিস্তান আমলে বাঙালির ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলনের সময় যেমন, তেমনি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ক্ষুদ্র এই গোষ্ঠি ‘ইসলাম গেলো’ বলে রব তুলে বাঙালির বিপক্ষে পাকিস্তানী শাসকচক্রকে মদদ যুগিয়েছিলো। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আর তার ধারাবাহিকতায় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় – কোনটিই ধর্মভিত্তিক অথবা ধর্মবিরোধী কোন প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হয়নি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক ছিলো না। আমাদের সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ ছিলো পাকিস্তানী রাষ্ট্রযন্ত্রের বৈষম্য এবং তাদের শোষণ-নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা গড়বার লক্ষ্যে । ধর্ম নিয়ে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠির সাথে আমাদের কোন বিবাদ ছিলো না। আমাদের কোন বিরোধ ছিলো না ধর্মের সাথেও। প্রকৃতপক্ষে, পাকিস্তানীদের বৈষম্যের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার বাঙালি জনমানুষের আন্দোলন-সংগ্রাম ছিলো ইসলামের ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ গড়বার মূলনীতির পরিপূরক। সেই অর্থে বাঙালির ওপর বৈষম্য-শোষণ-নির্যাতন চালিয়ে এবং এর প্রতিবাদে জেগে ওঠা বাঙালি জনগোষ্ঠির ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে পাকিস্তানী শাসকচক্রই বরং ইসলামের সেই আদর্শের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো। ইসলামের মহান শিক্ষা ও বাণীর বিরুদ্ধে এই অ-ধর্মযুদ্ধে তারা সাথে পেয়েছিলো ধর্মীয় পরিচয় বহন করা মুষ্টিমেয় কিছু বাঙালিকে, যারা পাকিস্তানী শাসকচক্রের মতোই গোষ্ঠিগত স্বার্থে বাঙালির গণআকাংখার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিজেরাও শামিল হয়েছিলো এই ধর্মবিরোধী যুদ্ধে।
মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানের বর্বর দখলদার বাহিনী আর তাদের বাঙালি সশস্ত্র দোসররা বাংলাদেশে প্রতিটি দিন ইসলামের মানবিক আদর্শের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, প্রকৃতপক্ষে তারা সেদিন পবিত্র ইসলামের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছে প্রতিটি দিনরাত্রির প্রতিটি ক্ষণ। চেতনাগত দিক থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিলো সেই অধর্মের বিরুদ্ধেই। ইসলামের ধ্বজাধারী পাকিস্তানী আর তাদের বাঙালি দোসররা বাংলাদেশের মাটিতে পরাজিত হয়েছে, সে কারণে একাত্তর-পরবর্তীকালে বাংলাদেশ থেকে ইসলামের নাম-নিশানা মুছে যায়নি। এক মুহূর্তের জন্যেও মুসলমানদের ইবাদত-বন্দেগী থেমে থাকেনি স্বাধীন বাংলাদেশে, নামায-রোযা-ঈদ উদযাপন, কোন কিছুতেই কোন বাধা আসেনি, আসবার প্রশ্নও ছিলো না। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে এবং তারও অনেক পরে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া আওয়ামী লীগের পাঁচ শাসনামলে কখনোই এমনটা হয়নি। ২০০৯ থেকে এই ২০২০ সাল পর্যন্ত সেই আওয়ামী লীগই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। এই সময়গুলোতে বাংলাদেশে ইসলাম বিপন্ন হয়নি, ইসলাম বিপর্যস্ত হয়নি, কোন প্রতিবন্ধকতারই শিকার হয়নি পবিত্র ধর্ম ইসলাম। কিন্তু কোন কোন মহল থেকে যে কোন সুযোগে ইসলামকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে স্বাধীনতার মুখোমুখি । বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ যে ইসলাম ধর্মের অনুসারি, একাত্তর সাল থেকেই সেই পবিত্র ধর্ম ইসলামকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর একটা প্রচ্ছন্ন প্রবণতা সেই তখন থেকে আজ পর্যন্ত বিদ্যমান রয়েছে। এখানেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার অ-সুখ। যে স্বাধীনতাকে সর্বজনীন হতে বাধা দেয়া হয়, সে স্বাধীনতায় অ-সুখের প্রকোপ থাকবে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির লগ্নে আমাদের স্বাধীনতার এই অ-সুখটি নিরাময়ের প্রয়োাজন এখন গুরুত্ব দিয়ে ভাববার সময় হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার অন্যতম শক্তি হচ্ছে যে, ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশে এতো এতো ডামাডোলের পরও কেউ এখনো পর্যন্ত বুক চিতিয়ে বলার সাহস রাখে না যে, ‘‘আমি রাজাকার, আমি স্বাধীনতার ‘বিপক্ষে’। তাতে কার কী”? না, কেউ এমনটা বলে না। বলতে পারে না।
আমাদের স্বাধীনতার অন্তর্নিহিত এই যে শক্তি, তা সমুন্নত করে এখন এগিয়ে যাবার সময় হয়েছে। এ কাজে নেতৃত্ব দিতে হবে মুক্তিযুদ্ধের ‘পক্ষ’ শক্তিকেই। পক্ষের শক্তির দায়িত্ব অনেক বেশি। চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। এই চ্যালেঞ্জ ‘বিপক্ষ’কে সত্য বুঝতে পারায় সহায়তা করার, যুক্তি মেনে নেয়ায় সাহায্য করার, দেশের গৌরবময় ইতিহাস বুঝতে পারার এবং সত্যিকারের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার। এ কাজে প্রয়োজন প্রেরণাদায়ী, উদ্যমী, সহিষ্ণু নেতৃত্বের আর প্রয়োজন যথার্থ শিক্ষার এবং অবশ্যই ধর্মেরও। দেশের বিরাট সংখ্যক জনমানুষ, যাঁরা অপপ্রচারণার শিকার।
লেখক : সাবেক নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক সিলেটের ডাক।

শেয়ার করুন