কেন, কখন, কিভাবে পড়বেন তাহাজ্জুদ নামাজ

নূর মুহাম্মদ রাহমানী:তাহাজ্জুদে রয়েছে মোমিনের মর্যাদা। তাহাজ্জুদ ছাড়া কেউ নেককার হতে পারে না। কোনো ব্যক্তি নেককার আর সে তাহাজ্জুদ পড়বে না, এটা হতে পারে না। এ নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। এটি আমাদের পূর্বসূরিদের নিয়মিত আমল ছিল। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা উচিত। কেন না, তা তোমাদের আগেকার সজ্জনদের প্রতীক এবং তোমাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের বিশেষ মাধ্যম। এ নামাজগুলো পাপরাশী বিমোচনকারী।’ (তিরমিজি : ৩৫৪৯)।

মহানবী (সা.) তাহাজ্জুদের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করতেন। তাহাজ্জুদ পড়তে পড়তে তার পদযুগল ফুলে যেত। মুগীরা ইবনে শুবা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী (সা.) এত দীর্ঘ সময় তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন যে, তার পা দুটো ফুলে যেত। তাকে বলা হলো, আপনি এত কষ্ট করছেন কেন? অথচ আপনার পূর্বাপর ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে (এবং কোরআনে আপনাকে সান্ত¡না দেওয়া হয়েছে) তিনি বললেন, তাই বলে কি আমি (এ মহাঅনুগ্রহের জন্য অধিক ইবাদত করে শোকর আদায়কারী বান্দা হব না? (বোখারি : ৪৮৩৬)।

পবিত্র কোরআনে মহানবী (সা.)কে তাহাজ্জুদ পড়ার নির্দেশ দানের সঙ্গে সঙ্গে জান্নাতের একটি উঁচুস্তর মাকামে মাহমুদ দানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে ‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করবে, এ হলো তোমার জন্য এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৭৯) মাকামে মাহমুদ আখিরাত ও জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা। মাকামে মাহমুদ ও জান্নাতের সঙ্গে রয়েছে গভীর সম্পর্ক। তা শেষ দিবসে নবীজিকে দান করা হবে। কোনো বান্দা যদি নিয়মিত তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হয়, তাহলে আশা করা যায় কোনো এক পর্যায়ে হলেও আখিরাতে নবীজির সাহচর্য তার নসিব হবে।

তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হওয়ার মাধ্যমে নিজ প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। আর রাতে যেহেতু পরিবেশ শান্ত থাকে, চারদিকে অখ- নীরবতা বিরাজ করে; তাই তখন তেলাওয়াত, দোয়া সুন্দর ও সঠিকভাবে সম্পন্ন করা যায় এবং তাতে মনোযোগও দেওয়া যায় পূর্র্ণমাত্রায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই রাত্রিকালের জাগরণ এমন যা কঠিনভাবে প্রবৃত্তি দলন করে এবং যা কথা বলার পক্ষে উত্তম।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল : ৬)।

হাদিসেও তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার অসংখ্য ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে ও বিভিন্নভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বোৎকৃষ্ট নামাজ হলো মধ্যরাতের (তাহাজ্জুদের) নামাজ।’ (মুসলিম : ১১৬৩)।

রাতের শেষাংশ দোয়া কবুলের সময়। আল্লাহর কাছ থেকে যে কোনো চাওয়াকে মঞ্জুর করানোর জন্য রাতের শেষাংশ খুবই উত্তম সময়। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মহামহিম আল্লাহ তায়ালা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ থাকাকালে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন কে আছ এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি ডাকে সাড়া দেব। কে আছ এমন, যে আমার কাছে প্রার্থনা করবে? আমি তার প্রার্থিত বস্তু তাকে দান করব। কে আছ এমন, যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।’ (বোখারি : ১১৪৫)।

নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায়কারীর তাহাজ্জুদ ছুটে গেলে তা কাজা করার সুযোগ রয়েছে। ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের নির্ধারিত অজিফা বা এর কোনো অংশ না পড়েই ঘুমিয়ে পড়ে, তারপর তা ফজর ও জোহরের মাঝখানে পড়ে, তার জন্য এমন সওয়াব লেখা হয়, যেন সে রাতেই তা আদায় করেছে।’ (মুসলিম : ৭৪৭) রাসুল (সা.) নিজেও কোনো কারণে তাহাজ্জুদ ছুটে গেলে কাজা করে নিতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রোগব্যাধি কিংবা অন্য কোনো কারণে যদি রাসুল (সা.) তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতে না পারতেন তবে তিনি দিনের বেলায় আদায় করে নিতেন।’ (মুসলিম : ৭৪৬)।

তাহাজ্জুদ সম্পর্কে অনেকের ভুল ধারণা হলো, তাহাজ্জুদ শুধু শেষ রাতেই পড়তে হয়। হ্যাঁ, এটা ঠিক, তাহাজ্জুদ মূলত ঘুম থেকে ওঠে নামাজ পড়ারই নাম; কিন্তু এর বাইরে হাসান বসরি (রহ.)সহ বড় বড় তাবেয়িদের মত হলো এশার পর থেকেই তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত শুরু হয়। এশার পর থেকে যে কোনো নফল নামাজ পড়া হবে তা তাহাজ্জুদ বলে গণ্য হবে এবং রাত জেগে নামাজ পড়ার সওয়াব লাভ করা যাবে। তবে এতে সন্দেহ নেই যে, ভোর রাতে আদায় করলে সে নামাজের মর্যাদা অনেক বেশি। বঞ্চিত হওয়ার চেয়ে প্রথম রাতে পড়ে নেওয়া অনেক ভালো। এশার ফরজ নামাজের পর বিতরের আগে দুই থেকে চার রাকাত তাহাজ্জুদের নিয়তে পড়ে নেওয়া যেতে পারে।

তাহাজ্জুদের সর্বনিম্ন রাকাত সংখ্যা হলো দুই। সর্বোচ্চ রাকাতের কোনো সীমা নেই। হাদিসে কোনো সীমা বলা হয়নি। নবীজি (সা.) সাধারণত আট রাকাত পড়তেন দুই দুই রাকাত করে। তিনি বলেছেন, ‘রাতের নামাজ দুই দুই রাকাত করে।’ (তিরমিজি : ৪৩৭)।

রাকাত বেশি হওয়ার চেয়ে দীর্ঘায়িত করার ফজিলত বেশি। বোখারিতে এসেছে, আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) তাহাজ্জুদে এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, মনে হয় তার পা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হবে। আর নফল নামাজ দীর্ঘায়িত করার মধ্যেও আবার মধ্যে মূল বিষয় হলো কালামে পাকের তিলাওয়াত। এজন্য যথাসাধ্য তিলাওয়াত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়িত করে নামাজটা প্রাণবন্ত করতে সচেষ্ট হওয়া। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.)কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন নামাজ উত্তম? তিনি বললেন, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা।’ (তিরমিজি : ৩৮৭)।

তাই আসুন, শীতের এই দীর্ঘ রাতগুলোকে কাজে লাগাই। তাহাজ্জুদ পড়ে সর্বদাতা মহান রবের কাছ থেকে চেয়ে নেই ব্যক্তিগত জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া।

শেয়ার করুন