“আমি যা বলব, তাই বলবে, সত্য কথা বললে বুকে গুলি করব, পিঠ দিয়ে বের হবে ”

দুই কনস্টেবলকে এস আই আকবরের হুমকি

সিলেটের সকাল রিপোর্ট: সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে মো. রায়হান আহমদকে ধরে এনে নির্যাতনের ঘটনার দুই পুলিশ সদস্যকে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে প্ররোচিত করেছিল বরখাস্ত এসআই আকবর হোসেন ভূঞা। সিনিয়র অফিসারদের কাছে সত্য কথা বললে ‘বুকে গুলি করব, পিঠ দিয়ে বের হবে’ বলে হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।
ঘটনার দিন (১০ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত ফাঁড়িতে সেন্ট্রি পোস্টে কর্তব্যরত তিনজন কনস্টেবল শামীম মিয়া, সাইদুর রহমান ও দেলোয়ার হোসেন। সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো: জিয়াদুর রহমানের আদালতে গত ১৯ অক্টোবর ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য জবানবন্দি দিয়েছেন। এর মধ্যে সাইদুর ও দেলোয়ারকে আকবর মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে প্ররোচিত করেছিলেন বলে তাঁরা জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের পেশকার তিন কনস্টেবলের জবানবন্দি দেবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জবানবন্দিতে যা বলেন শামীম মিয়া
১০ অক্টোবর রাতে ডিউটি না থাকায় ফাঁড়ির কক্ষে ঘুমিয়েছিলেন কনস্টেবল শামীম মিয়া। রাত আনুমানিক তিনটায় কান্নার আওয়াজ শুনে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। শামীম জবানবন্দিতে বলেন, ‘ঘুম ভেঙে দেখি, একজন লোক দুই হাত পেছন দিক করে হাতকড়া লাগানো, মেঝেতে বসে চিৎকার করছে। তখন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস তাঁর হাতে থাকা মোটা লাঠি দিয়ে লোকটিকে হাতে, পায়ে ও কোমরে এলোপাতাড়িভাবে মারপিট করছেন এবং বলছেন, “গ্রেফতারের সময় কেন এত শক্তি দেখালি? কেন এত ধস্তাধস্তি করলি?”’
শামীমের জবানবন্দি অনুযায়ী, টিটুর মারপিটে লোকটি ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। তখন টিটু লোকটির পায়ের তলায় আঘাত করে। এরপর কনস্টেবল হারুন অর রশিদ রুমে প্রবেশ করে লোকটিকে মারধর করতে থাকে। তখন কনস্টেবল টিটু, এএসআই আশেক এলাহি, এএসআই কুতুব আলী উপস্থিত ছিলেন। রুমের দরজার কাছে কনস্টেবল সজীব ও তৌহিদ দাঁড়ানো অবস্থায় ছিলেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ ফাঁড়ির আইসি আকবর হোসেন ভূঞা রুমে প্রবেশ করেন। তিনি টিটুর হাতে থাকা লাঠি নিয়ে লোকটির নাম ও ঠিকানা জিজ্ঞেস করেই বেধড়ক মারপিট করতে থাকেন। আকবরের মারমুখী আচরণ দেখে এএসআই কুতুব আকবরের হাত ধরে বলেন, ‘স্যার এভাবে আর মাইরেন না।’ আকবর তখন লাঠি হাতে রুমের বিছানায় বসে পড়েন।
এ সময় রুমে একটি লোক প্রবেশ করেন। তিনি আকবরকে বলেন, রায়হান তাঁর মুঠোফোন ও টাকা চুরি করেছেন। তখন রায়হান বলেন, ‘স্যার, আমি টাকা নিই নাই। শুধু মোবাইল ফোনটি নিয়েছিলাম, ফোনটি ফেরত দিয়েছি। টাকা অন্য দুজন ছিনতাইকারী নিয়েছে।’ তখন অজ্ঞাত লোকটি বলেন যে, ‘না, এই লোকটিই (রায়হান) আমার টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়েছে।’ আকবর তখন অজ্ঞাত লোকটিকে ফাঁড়ির বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে রায়হানকে আবার মারতে থাকেন।
এরপরও মারধর চলতে থাকলে কক্ষে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন শামীম। সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে ঘুম থেকে উঠে ডিউটির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তিনি দেখেন, ‘যে স্থানটিতে রাতে রায়হানকে মারধর করা হয়েছিল, সেই স্থানটি পানিতে ভেজা।’ এরপর কর্মকর্তাদের নির্দেশে তিনি ওসমানী মেডিকেল কলেজে গিয়ে হৃদরোগ বিভাগের সামনে রায়হানের লাশ দেখতে পান। এ সময় লাশের এক পাশে এএসআই তৌহিদ দাঁড়ানো ছিলেন। কিছুক্ষণ পর লাশটি হিমঘরে নেওয়া হয়।

কনস্টেবল সাইদুর রহমানের জবানবন্দি
ঘটনার দিন রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত ফাঁড়ির সেন্ট্রি ডিউটিতে ছিলেন সাইদুর রহমান। জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, রায়হানকে থানায় ধরে নিয়ে আসা এবং নির্যাতনের ঘটনা তিনি দেখেছেন। ফাঁড়ির সেন্ট্রি পোস্ট থেকে তিনি রায়হানের চিৎকার শুনতে পেয়ে রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেন, কনস্টেবল হারুন রায়হানের দুই পা উঁচু করে ধরে রেখেছেন, আকবর ও টিটু লাঠি দিয়ে লোকটির পায়ের পাতায় আঘাত করছেন। তিনি মারধরের কারণ জানতে চাইলে এসআই আকবর বলেন, ‘সে একজন ছিনতাইকারী। সঙ্গে থাকা দুজনের নাম জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করছি।’ এ সময় পাশ থেকে এএসআই আশেক এলাহি বলেন, ‘সে পুলিশের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে। পায়ে মারেন, পায়ে মারেন…সমস্যা নাই।’ এ অবস্থায় আকবর সাইদুরকে ধমক দিয়ে সেন্ট্রি পোস্টে ডিউটিতে যেতে বলেন। এরপর তিনি ডিউটিরত অবস্থায় বেশ কয়েকবার রায়হানের চিৎকার শোনেন।
জবানবন্দিতে সাইদুর বলেছেন, ‘পরদিন দুপুর সাড়ে ১২টায় ফাঁড়িতে ডিসি (উপকমিশনার) স্যার আসবেন বলে আমাকে আসতে বলা হয়। আকবর স্যার তখন আমাকে বলেন, “ডিসি স্যার জানতে চাইলে বলবা রাতে ফাঁড়িতে কোনো লোক এনে নির্যাতন করা হয় নাই। সে (রায়হান) কাস্টঘর থেকে গণপিটুনি খেয়ে ধরা পড়েছে, তাঁকে (রায়হান) সরাসরি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।” এই কথা বলে আকবর স্যার হুমকি দেন। আকবর স্যার বলেন, “আমি যা বলব, তাই বলবে। সত্য কথা বললে বুকে গুলি করব, পিঠ দিয়ে বের হবে।” এই হুমকি দিয়ে আকবর স্যার আমার বুকে হাত বুলান।’

দেলোয়ার হোসেন যা বলেছেন
১১ অক্টোবর ভোর ৪টার সময় কনস্টেবল সাইদুরের কাছ থেকে সেন্ট্রি পোস্টের ডিউটি বুঝে নেন দেলোয়ার হোসেন। তখন সাইদুর তাঁকে জানান ছিনতাইকারী একজন ধরে এনে মারধর করা হয়েছে। এ সময় এসআই আকবর ও অন্যদের সঙ্গে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া লোকটিও ছিলেন। ঘটনাটি ফাঁড়ির মুন্সির কার্যালয়ের কক্ষে হয়।
দেলোয়ার হোসেন মুন্সির কক্ষের দরজার কাছে গিয়ে দেখেন, এসআই আকবরের হাতে একটি মোটা লাঠি। তিনি চেয়ারে বসা। তাঁর পায়ের কাছে হাতকড়া পরা এক লোক। সেখানে পুলিশের সঙ্গে অজ্ঞাত একজন লোক ও তাঁর সঙ্গে আরও একজন লোককে দেখতে পান। দেলোয়ারকে দেখে আকবর বলেন, ‘তুমি সামনে চলে যাও।’ তখন তিনি সেন্ট্রি পোস্টে ডিউটিতে যান।
ঘটনার বর্ণনায় দেলোয়ার বলেন, এরপর কনস্টেবল তৌহিদ তাঁর কাছে আসেন। আকবর তখন তৌহিদকে ডেকে ভেতরে নিয়ে যান। আকবর তৌহিদের মুঠোফোন থেকে গ্রেফতার হওয়া লোকটির (রায়হান) বাড়িতে ফোন দিয়ে ১০ হাজার টাকা নিয়ে আসতে বলেন। তৌহিদ ফোন দেওয়ার পর দেলোয়ার তাঁর কাছে জানতে চান, টাকা কেন নিয়ে আসতে বলেছেন? তখন তৌহিদ বলেন, ‘আকবর স্যার বলেছেন, ছিনতাইয়ের টাকা উদ্ধার দেখাতে ফোন দেওয়া হয়।’ এরপর আকবর এএসআই আশেক এলাহিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমি ঘুমিয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর তাঁকে (রায়হান) হাসপাতালে নিয়ে যেও।’ ভোর পাঁচটার দিকে আশেক এলাহি ও কনস্টেবল হারুন লোকটিকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে হাসপাতালে রওনা করার প্রস্তুতি নেন। তাঁরা রওনা দেওয়ার পর আকবরও তাড়াতাড়ি ফাঁড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর দেলোয়ারের ডিউটি শেষ হলে কনস্টেবল ইলিয়াছকে ডিউটি বুঝিয়ে দিয়ে ঘুমাতে চলে যান।
মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সূত্র জানায়, তিন কনস্টেবলের জবানবন্দির পরদিনই বরখাস্ত কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাসকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। টিটুর রিমান্ড শেষে তিন প্রত্যক্ষদর্শী কনস্টেবলের জবানবন্দিতে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে তদন্ত চলছে। এর অংশ হিসাবে শুক্রবার রাতে গ্রেফতার করা হয়েছে কনস্টেবল হারুনকে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স সূত্র জানায়, কনস্টেবল হারুন ও টিটু ছাড়া বাকি ৫ জনকে তাদের নজরদারি মধ্যে রাখা হয়েছে।

শেয়ার করুন