এম সাইফুর রহমান, কিছু কথা

আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী:চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট, রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ আধুনিক বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রকৃত রুপকার দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী, বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন ১০ জন সদস্যের অন্যতম, স্থায়ী কমিটির দীর্ঘকালীন সিনিয়র সাবেক সদস্য, এম. সাইফুর রহমান এর একাদশ মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২০। তার একাদশ মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে শ্রদ্ধাচিত্তে স্মরন করছি। এটা আমার পরম সৌভাগ্য যে দুই দশক তাঁর নিবিড় সান্নিধ্যে থেকে তাঁকে চেনা ও জানার এবং তাঁর সাথে কাজ করার এক অনন্য সুযোগ আমার হয়েছিলো।

এম. সাইফুর রহমান একজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি ১৯৪৯ সালে মৌলভীবাজার সরকারি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৫১ সালে সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে আই.কম এবং ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে সাইফুর রহমান ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার জন্য তিনি গ্রেফতার হন এবং প্রায় এক মাস কারাবরণ করেন। পরবর্তিতে ১৯৫৪ সালে চার্টার্ড একাউন্টেসী পড়তে বিলাতে যান এবং ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট (ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস) থেকে চার্টার্ড একাউন্টেসি পাস করেন। সাইফুর রহমান ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্যে অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি আর্থিক ও মুদ্রানীতি এবং উন্নয়ন অর্থনীতিতে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করেন।

সাইফুর রহমান ১৯৬০ সালের প্রথমার্ধ থেকে ১৯৬২ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানী ব্রিটিশ অক্সিজেনের অর্থ-পরিচালক হিসেবে করাচিতে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬২ সালে ঢাকায় ফেরৎ এসে পাকিস্তানের সবেচেয়ে বৃহৎ চার্টার্ডএকাউন্টেন্সী পার্টনারশিপ ফার্ম “রহমান রহমান হক” চালূ করেন। তিনি ১৯৬২ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ পেশাগত জীবনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতমানের ‘রহমান রহমান হক’ কোম্পানির পরিচালনা করেন। তিনি বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় সকল বহুজাতিক কোম্পানী, তেল-গ্যাস উত্তোলন, পরিবহন, ব্যাংকিং, ইন্স্যুরেন্স ইত্যাদি বিষয়সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (ওঈঅই)-এর প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল’ অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স-এর প্রিন্সিপাল এবং বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতির প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

সাইফুর রহমান ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বেতন কমিশনে প্রাইভেট সেক্টর হতে একমাত্র সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৭৩ সালে তৎকালিন সরকার প্রধানের অনুরোধে জাতীয় মজুরী কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

সাইফুর রহমান ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রপতি এম. এস.এম সায়েমের সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। ১৯৭৮ সালের মার্চে তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলের ১০ জন প্রতিষ্ঠাতার একজন ছিলেন। পরবর্তিতে এ দলটিই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) হিসেবে রূপান্তরিত হয়। তিনি ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মৌলভীবাজার সদর এলাকা থেকে প্রথম সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রæয়ারী পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তিতে ১৯৯১ সালের খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় জুলাই ১৯৯১ সালে তিনি VAT System প্রবর্তন করেন। তিনি বাংলাদেশে মুক্ত বাজার সংস্কার প্রক্রিয়াার প্রবর্তক হিসেবে সমধিক পরিচিত। ১৯৭০- এর দশকের শেষের দিক থেকে এ প্রক্রিয়া চালু হয়। তিনি ১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে মৌলভীবাজার সদর-রাজনগর ও সিলেটের জৈন্তাপুর-গোয়াইনঘাট আসন দুইটি থেকে এবং পুনরায় ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সিলেটের সদর-কোম্পানীগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সদর-রাজনগর দুইটি আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।

সাইফুর রহমান ১৯৯১ সালে দ্বিতীয়বার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো করের পরিসর বৃদ্ধি লক্ষ্যে মূসক (মূল্য সংযোজন কর) প্রথা প্রবর্তন করেন। ১৯৯১-১৯৯৬ সালে তিনি ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। এছাড়াও তিনি ১৯৯৫ সালে টাকাকে সীমিত আকারে ভাসমান মুদ্রা বিনিময় হার প্রথার চালু করেন। তিনি বাণিজ্য উদারীকরণ ও বেসরকারীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীর সূচনা করেন।

সাইফুর রহমান ১৯৯৫ সালে কলাম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ দেশ সমূহের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব প্রদান করেন। এছাড়া ঐ বছর মালেয়েশিয়ায় বসনিয়া যুদ্ধপরবর্তি পুনর্বাসনের জন্য আয়োজিত ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানদের সম্মেলনেও বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। সাইফুর রহমান ১৯৯৪ সালে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ^ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) এর ৪৯তম সম্মেলনে উক্ত দুই সংস্থার বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং পরবর্তি বছর ১৯৯৫ সালে স্পেনের মাদ্রিদে সংস্থা দুইটির ৫০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সম্মেলনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ছিলেন একজন খাটি দেশদরদি মানুষ। বিশেষত সিলেট বিভাগে যত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, তার বেশির ভাগ কৃতিত্বের অধিকারী সাইফুর রহমান। তাঁর একান্ত কাছে থাকার কারণেআমি জানি কী পরিমাণ দায়িত্ব নিয়ে তিনি অনেক যুগান্তকারী কার্য সম্পন্ন করেছেন। বহু উদাহরণ থেকে আমি এই নিবন্ধের জন্য কয়েকটি অভিজ্ঞতা এখানে আপনাদের সামনে পেশ করলাম।

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মদন মোহন কলেজ তাঁরই ঐকান্তিক প্রয়াস ও একক প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করা হয়েছিলো। সিলেটবাসীর সার্বিক ও ঐতিহাসিক প্রয়োজনে তিনি নিয়ম নীতির লাল ফিতাকে অগ্রাহ্য করে তা বাস্তবায়ন করেছিলেন। যার সুবিধা আজ সিলেটবাসী উপভোগ করছে। মনে রাখতে হবে এটিই প্রথম কোন বেসরকারি কলেজ যা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত হয় এবং প্রথম স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদানরত শিক্ষকদের জন্য এমপিও সুবিধা প্রদান করা হয়। যে কারণে তৎকালীন শিক্ষা সচিব তার নোটে লিখেছিলেন- সিলেট মদন মোহন কলেজের স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদানরত শিক্ষকদের এমপিওভূক্তিকরণ বিশেষ ব্যতিক্রমের কারণে অনুমোদন করা হল। কিন্তু এটি উদাহরণ হিসেবে অন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে গণ্য হবে না। এই প্রক্রিয়ার সাথে আমি নিজেও জড়িত ছিলাম বলে আমি জানি এটি সম্ভব হয়েছিলো একমাত্র সাইফুর রহমানের কারণেই।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর আরও এক অনন্য কীর্তি। সাইফুর রহমান সিলেট সরকারি ভেটেনারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৯৯১-৯৬ মেয়াদের সরকারে থাকার সময় এবং ২০০১-০৬ মেয়াদের সরকারের সময় কলেজকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তর করে প্রতিষ্ঠিত করেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এই উত্তরণের প্রতিটি স্তরেই ছিলো তাঁর একক অবদান। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে তাঁর অবদান বিবেচনা করে এটি তাঁর নামে করার প্রস্তাব করা হলে তিনি সাথে সাথে সে প্রস্তাব নাকচ করে দেন।

সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজও তাঁর অবদানে স্থাপিত। এক সময় ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও চট্রগ্রামে বাংলাদেশ ইনিস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি) নামে পরিচিত প্রকৌশল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরের জন্য মন্ত্রীপরিষদে প্রস্তাব আসলে তিনি সিলেটের নাম নাই কেন শিক্ষা মন্ত্রীর কাছে জানতে চান। শিক্ষা মন্ত্রী বলেন, সিলেটে তো কোন বিআইটি নেই, সেহেতু সিলেটের কোন প্রস্তাব আসে নাই। তখন তিনি সিলেটে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আগ্রহের কথা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্ট আকর্ষণ করলে প্রধানমন্ত্রী সিলেট প্রথমে প্রকৌশল কলেজ স্থাপন করে পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরের নির্দেশ প্রদান করেন। সেই বৈঠকের আলোকে সিলেট প্রকৌশল কলেজ স্থাপিত হয়।

সিলেটে একটা দৃষ্টিনন্দন সার্কিট হাউস হবে, এটা ছিল তাঁর আরেক বাসনা। এই বাসনাও তিনি বাস্তবায়ন করে গেছেন। উল্লেখ্য যে, সার্কিট হাউস নির্মাণে সরকারের একটা নীতিমালা আছে, যে সব সার্কিট হাউস একই ধরনের হতে হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত সরকারী ডিজাইন তার একেবারে পছন্দ ছিল না। তিনি চাইছিলেন একটা দৃষ্টিনন্দন ডিজাইনের সার্কিট হাউস। বিষয়টি নীতিমালায় আটকে গেলে তিনি এর উপায় বের করে দেন এই বলে যে, বিভাগীয় সদর হিসেবে সিলেটে একটা দৃষ্টিনন্দন ডিজাইনের সার্কিট হাউস হবে। তখন প্রশ্ন আসলো, বরিশালও তো নতুন বিভাগীয় সদর। তখন তিনি ঘোষনা দিলেন বরিশালেও একই ডিজাইনের সার্কিট হাউস হবে। তাঁর দৃঢ়চেতা অবস্থানের কারণে সিলেট ও বরিশালে আজ নিকারের প্রেসক্রাইবড ফর্মের বাইরে এসে দুটি দৃষ্টিনন্দন ডিজাইনের সার্কিট হাউস স্থাপিত হয়েছে। একজন সাইফুর রহমান ছিলেন বলেই এটি সম্ভব হয়েছিল।

আখাউড়া রেল লাইন বাইপাস প্রসঙ্গেঃ
বৃটিশ আমলে স্থাপিত ঢাকা-সিলেট রেল পথে আসা যাওয়ার সময় আখাউড়া ষ্টেশনে যাত্রীদের অহেতুক বিড়ম্বনা ও অযথা সময় নষ্টের বিষয়টি ছিলো একটি শতাব্দী প্রাচীন সমস্যা। কারণ, সিলেটের সাথে ঢাকার রেলপথ সোজা লাইন না থাকায় আখাউড়া ষ্টেশনে ট্রেনের ইঞ্জিন সামনে থেকে পিছনে এনে সংযোগ করে তারপর সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করতে হতো। এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সময় লেগে যেতো আধা ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা। এই বিষয়টির আশাব্যঞ্জক সমাধানের জন্য বিভিন্ন সময়ে দাবী ও সুপারিশ উত্থাপিত হলেও কেউ কর্ণপাত করেননি। কিন্তু ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে বিষয়টি আমলে নিয়ে সাইফুর রহমান ২০০২ সালে আখাউড়া ষ্টেশনকে বাইপাস করে সরাসরি রেল লাইন স্থাপনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু কাজটি এতো সহজসাধ্য ছিলো না। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের রেলপথ বিভাগ এ সংক্রান্ত টেন্ডার আহবান করে কাজ শুরু করে। কিন্তু আখাউড়া সহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকজন প্রকল্পটি বাতিলের জন্য আন্দোলন শুরু করে। তারা বিক্ষোভ ও হরতালের মতো কর্মসুচী গ্রহণ করে, কারণ, তাঁদের মতে, আখাউড়া ষ্টেশনকে বাইপাস করে সরাসরি রেল লাইন স্থাপিত হলে, আখাউড়ার গুরুত্ব কমে যাবে।

এ পরিস্থিতিতে সাইফুর রহমান ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার স্থানীয় সকল দলীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ সর্ব জনাব মুশফিকুর রহমান, হারুন আল রশিদ ও প্রতিমন্ত্রী উকিল আব্দুস সাত্তারকে ডেকে তাঁদেরকে এ আন্দোলন বন্ধ করতে বলেন। এটি সম্ভব হয়েছিলো তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণেই। স্থানীয় নেতৃবৃন্দ অনুরোধ করেন যে, তিনি যেভাবে সিলেটের উন্নয়ন করছেন, আখাউড়া- ব্রাহ্মণবাড়ীয়া উন্নয়নও সেভাবে করবেন, এই প্রতিশ্রæতি দিলে তাঁরা তাঁদের আন্দোলনরত জনতাকে এ বলে নিবৃত্ত করতে সক্ষম হবেন। প্রকল্পের স্বার্থে সাইফুর রহমান তাই করলেন। তিনি আখাউড়া ও ঢাকাস্থ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সমিতির সভায় এ সংক্রান্ত প্রতিশ্রæতি দেন। এই প্রতিশ্রæতির ফলে সকল আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। এই যুগান্তকারী কর্মের সুবিধা আজ ভোগ করছেন সিলেট অঞ্চলের লাখো জনগণ ।

আরও একটি উদাহরণ দেই, তাহলে বোঝা যাবে তিনি কতোটুকু জনদরদি মানুষ ছিলেন। ১৯৯৩ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে দেশের প্রাচীন ও প্রথম সারকারখানা ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানাকে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। বন্ধের বিষয়ে সরকারের প্রজ্ঞাপনও জারী হয়ে যায়। এর প্রতিবাদে ‘সর্বদলীয় সারকারখানা রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ আন্দোলনের ডাক দেয়। তাঁদের দাবী ছিলো ফেঞ্চুগঞ্জে নতুন সারকারখানা নির্মাণ না করে সারকারখানা বন্ধ করা যাবে না। সেই সময় একটি নব্বই মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র প্রকল্পেরভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করতে ফেঞ্চুগঞ্জে আসার কথা জনাব সাইফুর রহমানের। আন্দোলনরত জনতার পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল- সারকারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল করা না হলে মন্ত্রীকে ফেঞ্চুগঞ্জে আসতে দেয়া হবে না। সাইফুর রহমান আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনায় বসেন এবং বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সারকারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল করার ব্যাপারে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তিতে কিছু সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণের ফলে সেই কারখানা আরও ১৫ বছর চালু ছিলো।

৫ই সেপ্টেম্বর ২০০৯, গোটা জাতির জন্য এক দুর্ভাগ্যের দিন। ঐ দিন মৌলভীবাজার থেকে ঢাকা আসার পথে ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার আশুগঞ্জের কাছে এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ । তিনি শারীরিকভাবে হয়তো আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর বর্নাঢ্য কর্মময় জীবনে দেশ ও জাতির জন্য যা করে গেছেন, মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরঞ্জীব হয়ে বেঁচে থাকবেন। দেশের অন্যতম অর্থমন্ত্রী যিনি ১২ বার জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করেছেন। উন্নয়নমূলক অর্থনীতির একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি উন্নয়নের যে স্বপ্ন দেখতেন তা বাস্তবায়নও করতেন। ১৯৯০ এর দশকে ভ্যাট, ট্যাক্স সংস্কার এবং মুক্ত বাজার নীতি প্রবর্তন করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ও উদারীকরণের স্থপতি হিসেবে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশিদের উন্নতি ও সমৃদ্ধি আনতে তাঁর ভূমিকার জন্য জাতি তাঁকে চিরকাল স্মরণ করবে।
আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী: এম সাইফুর রহমানের সাবেক রাজনৈতিক সচিব

 

শেয়ার করুন