বঙ্গবন্ধুকে হারানোর বেদনা আজীবনের

তোফায়েল আহমেদ :: ১৯৭৫-এর ১২ সেপ্টেম্বর আমাকে যখন ময়মনসিংহ কারাগারের ‘কনডেম সেলে’ নিয়ে গেল তখন মনে হলো যেন স্বর্গে এসেছি। সেখানে ফাঁসির আসামিকে রাখা হয়, সূর্যের আলো-বাতাস অনুভব করা যায় না। কিন্তু তারপরও ছিল ভালো। কারণ ১৫ আগস্টের বিভীষিকাময় দিনটির শুরু থেকেই আমার ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছিল, তাতে আমি না পারি হাঁটতে, না পারি দাঁড়াতে। সেই করুণ অবস্থা থেকে কনডেম সেলও ছিল আপাত স্বস্তির।
১৫ আগস্ট থেকেই খুনিচক্র আমাকে গৃহবন্দি করে রেখেছিল। গৃহবন্দি অবস্থায় আমার ওপর তিনবার ভয়াবহ নির্যাতন চালায়। ১৭ আগস্ট মেজর শাহরিয়ার (যার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে) এবং ক্যাপ্টেন মাজেদ (সম্প্রতি যার ফাঁসি হয়েছে) আমাকে বাসা থেকে টেনেহিঁচড়ে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যায়। আমার মা তখন বেহুঁশ। সেখানে আমার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। ১৮ আগস্ট আমার বাসায় তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার শাফায়েত জামিল এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন (তখন মেজর ছিলেন) আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন এবং গোপন কিছু কথা বলেন। তারা চলে যাওয়ার পর আমার ওপর খুনিচক্রের নির্যাতন বেড়ে যায়। যে কথা শাফায়েত জামিল তার বইয়ে লিখেছেন এবং ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াতও তার বইতে উল্লেখ করেছেন যে আমার ওপর কী ধরনের অত্যাচার হয়েছে। ২৩ আগস্ট আমাকে এবং জিল্লুর রহমানকে (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) বঙ্গভবনে খুনি মোশতাকের কাছে ই. এ. চৌধুরী নিয়ে যান। তিনি তখন ডিআইজি এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান। সেখানে আমাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে খুনি মোশতাক সরকারকে সমর্থনের জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়। আমরা কিছুতেই রাজি হইনি দেখে খুনি মোশতাক ইংরেজিতে বলেছিল- ‘ইউ আর ওয়াকিং অন গ্র্যাভ। ইফ সামবডি এন্টার ইউর হাউস অ্যান্ড কিল্ড ইউ, নোবডি উইল টেক রেসপন্সিবিলিটি।’ এরপর খুনি সরকারের সপক্ষে সম্মতি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে আমাদের বাসভবনে ফিরিয়ে দেয়।
আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে ৬ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়। আমি, জিল্লুর ভাই, রাজ্জাক ভাই এবং আবিদুর রহমান (তৎকালীন ‘দ্য পিপল’ পত্রিকার সম্পাদক)- এই চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে রাখে। প্রত্যেক দিন আমার ওপর সেনাসদস্যরা দুর্ব্যবহার করে। পুলিশ কন্ট্রোল রুমের বন্দিদশা থেকেই একদিন খুনিচক্র আমাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যায়। সেদিন রাতে আমি ও রাজ্জাক ভাই এক কক্ষে ঘুমাচ্ছিলাম। রাত ৩টার দিকে মেজর মহিউদ্দিন, মেজর হুদা, মেজর শাহরিয়ার আমাদের কক্ষে ঢুকেই চিৎকার করে বলে, ‘হু ইজ তোফায়েল।’ তারা আমার বুকে স্টেনগান চেপে ধরে। চোখের সামনে মৃত্যু উপস্থিত বিধায় সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণ করে বলি, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।’ আমি অজু করার জন্য অনুরোধ করি। পাশেই বাথরুমে আমাকে অজু করতে দেয়। অজু করে আসার পর খুনিরা আমার চোখ বাঁধে। আমি সহবন্দিদের কাছ থেকে বিদায় নেই এবং ভাবি আজই আমার শেষ দিন। তারপর বারান্দায় নিয়ে আমার দু’হাত পিছমোড়া করে বাঁধে। এরপর মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কোথাও নিয়ে যায়। পরে জেনেছি স্থানটি রেডিও স্টেশন ছিল। সেখানে আমাকে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়। চোখ বাঁধা থাকায় কারা প্রশ্ন করেছিল বুঝতে না পারলেও খুনি ডালিমের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট চিনতে পেরেছি। ডালিম বলছিল, ‘শেখ মুজিব মেজর ডালিমকে ভালবাসত। কিন্তু শেখ মুজিব আমাকে আর্মি থেকে ডিসমিস করেছে। আর তোফায়েল…’ বলেই সে আমাকে ঘুষি মারতে থাকে, বাম হাত দিয়ে অনুমান করতে পারি। তার ডান হাত নষ্ট ছিল। বঙ্গবন্ধু লন্ডনে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করিয়েছিলেন। এরপর শুরু হয় প্রশ্নের পর প্রশ্ন।
বঙ্গবন্ধুর ফান্ড ছিল আমার কাছে, রক্ষীবাহিনী, রক্ষীবাহিনীর অস্ত্র এসব বিষয় নিয়ে লাগাতার প্রশ্ন করা হয়। এক পর্যায়ে তারা আমাকে রেখে নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করে যে, আমাকে কী করবে? খুনিরা আমায় বলে, ‘তোমার প্রাইভেট সেক্রেটারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে ৬০ পৃষ্ঠার স্টেটমেন্ট দিয়েছে। সেখানে লেখা আছে তুমি কাকে কাকে অস্ত্র দিয়েছ। রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টারে গিয়ে তুমি পাল্টা কিছু করতে চেয়েছিলে।’

সেদিন ১৫ আগস্টের সকালে যখন রেডিওতে ডালিমের কণ্ঠস্বর শুনলাম তখন আমি সেনাবাহিনী প্রধান সফিউল্লাহ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছি। খুনিচক্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মনোবল নিয়ে, মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত রক্ষীবাহিনীর সদর দপ্তরে গিয়েছি। তখন চারপাশে ১৪টি ট্যাঙ্ক। রক্ষীবাহিনীর গোলাবারুদ ওখানে থাকত না। গোলাবারুদের কোত ছিল পিলখানায়। মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান তখন বিডিআরের ডিজি। তিনি কোনোরকম সহযোগিতা করেননি। অপরদিকে সাভারে ২০০০ আন্ডার ট্রেনিং রক্ষী ছিল। কিন্তু সাভারে ব্রিজের ওপর ট্যাঙ্ক বহর অবস্থান নেওয়ায় কেউ যেতেও পারেনি, আসতেও পারেনি। অর্থাৎ সবদিক থেকেই আমরা অবরুদ্ধ।

রক্ষীবাহিনীর দুই উপপ্রধান আনোয়ার উল আলম শহীদ ও সারোয়ার হোসেন মোল্লা প্রতিরোধের আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা কারও কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাননি। আমরা ছিলাম নিরুপায়। রক্ষীবাহিনীর সদর দপ্তরে আমার উপস্থিতি জানাজানি হলে জিয়াউর রহমানের নির্দেশে ওখান থেকেই সিটি এসপি সালাম সাহেব প্রায় ৫০ জন পুলিশ নিয়ে আমাকে গ্রেপ্তার করে গৃহবন্দি করে রাখে। রক্ষীবাহিনীর উপপ্রধান আনোয়ার উল আলম শহীদ ‘রক্ষীবাহিনীর সত্য-মিথ্যা’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘কিন্তু বাঙালি জাতির দুর্ভাগ্য যে শোকে মুহ্যমান জাতীয় নেতারা (রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত) জাতির এই কঠিন সময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি।’ (পৃষ্ঠা-১৪৯)। বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার্থে আমি চেষ্টা করেছি সে কথা আমি নিজে কখনও বলি না। কারণ আমরা কিছু করতে পারিনি; জাতির পিতাকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি। নিছক ব্যক্তিগত নয়, এটি আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা!
এরপর আসে বিভীষিকাময় ১০ সেপ্টেম্বরের রাত। রমজান মাস। শাহবাগস্থ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে আমি তারাবির নামাজ পড়ে রাজ্জাক ভাইয়ের পাশে ঘুমিয়ে ছিলাম। সেখান থেকে খুনিচক্র আমাকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর সেই একই প্রশ্ন। কোথায় কাদের কাছে অস্ত্র ডিসট্রিবিউট করেছি, আমার প্রাইভেট সেক্রেটারি ৬০ পৃষ্ঠার স্টেটমেন্ট ও নানারকম তথ্য দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর টাকা-পয়সা কোথা থেকে আসত, কীভাবে দিত। এরপর অকথ্য ভাষায় গালাগালসহ শারীরিক নির্যাতন। আমি তাদের সোজাসাপ্টা একটি কথাই বলেছিলাম, ‘বঙ্গবন্ধুর ভালো কাজের সঙ্গে আমি যেমন জড়িত, যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে তবে তার সঙ্গেও জড়িত। এর বেশি আর আমি কিছু বলতে পারব না।’ খুনিরা যখন নির্যাতনে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি দেয় তখন অজ্ঞাত একজন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে খুব করুণ কণ্ঠে চাপাস্বরে বলতে থাকেন, ‘আল্লাহ আল্লাহ করেন, ‘আল্লাহ আল্লাহ করেন’। তারও মনে হয়েছিল মৃত্যু আমার অবধারিত। সন্ধ্যার সময় খুনি মেজর শাহরিয়ার আসে। একগাদা লিখিত প্রশ্ন আমাকে দিয়ে বলে, ‘এর উত্তর দিতে হবে।’ আমাকে আধমরা অবস্থায় পুলিশ কন্ট্রোল রুমে দিয়ে যায়। অসহ্য যন্ত্রণায় আমি চিৎকার করতে থাকি। তখন রাজ্জাক ভাই, জিল্লুর ভাই আমার শুশ্রূষা করেন। কিছুক্ষণ পর যিনি আমাকে গ্রেপ্তার করেছিলেন, সেই সিটি এসপি সালাম সাহেব ডাক্তার নিয়ে আসেন। সন্ধ্যার দিকে আমাকে, আবিদুর রহমান, রাজ্জাক ভাই এবং জিল্লুর ভাই- এই চারজনকে সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাদের নাম-ধাম লিপিবদ্ধ করে সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ চারজনকে জেলগেটে নিয়ে আবিদুর রহমান ও আমাকে ময়মনসিংহ এবং রাজ্জাক ভাই ও জিল্লুর ভাইকে কুমিল্লা কারাগারে প্রেরণ করে।
ময়মনসিংহ কারাগারে ১২ তারিখ সকালের দিকে পৌঁছাই। তখন আমার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। আমাকে আর আবিদুর রহমানকে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখে। এখানে আমি প্রায় ৫ মাস সূর্যের আলো দেখিনি। এই কনডেম সেলেই ফাঁসির আসামির মতো আমার জীবন কেটেছে। এখন তো কারাগার অনেক উন্নত। তখন ভালো বাথরুমও ছিল না। তখনও আমি এমপি, কিন্তু ডিভিশন দেয়নি। অনেক দিন পর ডিভিশন পেয়ে ওয়ার্ডে গেলাম। সেখানে পেলাম আবদুল হামিদ সাহেবকে (বর্তমান রাষ্ট্রপতি)। ২০ মার্চ, ১৯৭৬ তাকে গ্রেপ্তারের পর প্রথমে আর্মি ক্যাম্প, পরে পুলিশ ক্যাম্পে শারীরিক নির্যাতন করা হয়।
কারাগার ভর্তি ছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী দিয়ে। ‘৭৬-এর ৩১ আগস্ট জিয়াউর রহমানের এক আদেশে স্বাধীনতাবিরোধী যারা হত্যা, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং লুটতরাজ করেছে- তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিল। বঙ্গবন্ধু দালাল আইনে তাদের আটকাদেশ দিয়ে বিচারের মুখোমুখি করেছিলেন। স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়া দালাল আইন বাতিল করে ৩১ ডিসেম্বর জেলখানা খালি করে দেয় এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কারাবন্দি করে। এই ময়মনসিংহ কারাগারেই ৩ নভেম্বর জেলহত্যার সংবাদ পাই।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর আমি কখনও ভাবিনি যে বেঁচে থাকব। বঙ্গবন্ধুর স্নেহ-আদর-ভালোবাসার কথা ভাবতাম। পৃথিবীর যেখানে গিয়েছেন, বাংলাদেশের যেখানে গিয়েছেন আমাকে সঙ্গী করেছেন। প্রতিদিন সকাল ৯টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অফিসে যেতাম। আবার রাতে বঙ্গবন্ধুকে তার বাসভবনে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফিরতাম। ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু বলেন- ‘কাল সকালে আসবি। তুই ডাকসুর ভিপি ছিলি। আমার সাথেই ইউনিভার্সিটিতে যাবি।’ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এটাই আমার শেষ দেখা ও কথা!
যাহোক, আমি বেঁচে আছি। কিন্তু সারাজীবন মনের গভীরে এই দুঃখ থেকে যাবে, যে মহান নেতা জাতির পিতা পরম মমতা-স্নেহ-আদর-ভালোবাসায় সিক্ত করে সর্বদা ছায়া দিয়ে নিজের সঙ্গে রেখেছেন, যার স্নেহ-আদর-ভালোবাসা আমার জীবনে পাথেয়- তার মৃত্যুতে কিছুই করতে পারিনি। বেদনার এই ভার আমাকে চিরদিন বয়ে বেড়াতে হবে!

আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

শেয়ার করুন