ঢাকা আঙ্কারার সাথে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী : প্রধানমন্ত্রী

বাসস : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ তুরস্কের সঙ্গে দু’দেশের পারস্পারিক স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রী আজ বিকেলে আঙ্কারায় নব নির্মিত বাংলাদেশ চ্যান্সেরি (দূতাবাস) কমপ্লেক্সের ভার্চুয়ালি উদ্বোধনকালে এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ তুরস্কের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। তাই, আমরা দু’দেশের জনগণের স্বার্থে এই সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’ এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্কের শিকড় ইতিহাস, বিশ্বাস ও ঐতিহ্য এবং পরস্পারিক আস্থার ভিত্তিতে অনেক গভীরে প্রোথিত।
অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুৎ চাভুসগলু তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারার ওই কমপ্লেক্সে উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনা প্রায় ৫০ বছর আগে ১৯৭৪ সালে দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় বলে উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, যদিও তুর্কী সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর ১৩ শতকে বাংলা জয়ের ফলে দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরো অনেক আগেই স্থাপিত হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এই ঐতিহাসিক সম্পর্ক উদযাপন অনুষ্ঠানে, আমি ২০১২ সালের ১৩ এপ্রিল তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোগানের আমন্ত্রণে আঙ্কারা সফরের কথা উৎফুল্ল চিত্তে স্মরণ করছি।’
আঙ্কারায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আল্লামা সিদ্দিকী অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন। এ উপলক্ষে চ্যান্সেরি কমপ্লেক্সের ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম, আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী চলমান রোহিঙ্গা সংকটকালে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করায় তুরস্ক সরকারকে ধন্যবাদ জানান এবং ভবিষ্যতে এই সংকট সমাধানে আরো সহযোগিতার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার পর (বিপুল সংখ্যক) ইতোমধ্যেই তিন বছর পার হয়ে গেছে এবং তাদের অবশ্যই ফিরে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মনে করি তুরস্ক এ ব্যাপারে ভূমিকা পালন করতে পারে।
শেখ হাসিনা বলেন, রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ অর্জনে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী আরো অনেকগুলো কূটনৈতিক অফিস স্থাপন করছে, আর এর মাধ্যমে বর্হিবিশ্বের সাথে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আঙ্কারায় এই স্থায়ী দূতাবাস কমপ্লেক্স তুরস্কের সাথে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো জোরদারে বাংলাদেশ যে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তার প্রমাণ। ঢাকায় সম্প্রতি নির্মিত তুর্কী দূতাবাসও বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক জোরদারে তুরস্কের আগ্রহের প্রমাণ।’
তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি, চলমান মুজিব বর্ষে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সদয় উপস্থিতিতে শিগগিরই ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে তুরস্কের দূতাবাস ভবনের উদ্বোধন করা হবে।’
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও তুরস্কের সহায়তায় বাংলাদেশ দূতাবাসের এই কমপ্লেক্সটির নির্মাণ সম্পন্ন করতে দুই বছরেরও কম সময় লেগেছে। দূতাবাস কমপ্লেক্সে লাল রঙের ইট বাংলাদেশী স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের স্বতন্ত্র বৈশ্বিষ্ট্যকে তুলে ধরবে। এই ভবনটি অত্যন্ত গর্বের সাথে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি আবক্ষ ভাস্কর্য ও একটি শহীদ মিনার ধারণ করে আছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এটা জানতে পেরে খুব খুশি যে এই কমপ্লেক্সে চমৎকার একটি মিলনায়তনসহ সব ধরনের সুবিধা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি আঙ্কারায় এই নতুন দূতাবাস কমপ্লেক্সটি ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়ায় আমি খুশি।’
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা শুধু একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশেরই স্বপ্ন দেখেননি। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও সংঘাতমুক্ত বিশ্ব।’

‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) মানব কল্যাণে বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর নীতি- সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি শত্রুতা নয়-আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি।’

বিশ্বব্যাপী বর্তমান করোনাভাইরাস মহামারী সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বিশ্বজুড়ে বেশিরভাগ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং অর্থনীতি বিপর্যস্ত হওয়ায় বিশ্ব একটি কঠিন সময় পার করছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা সফলভাবে এ ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছি। একই সাথে আমাদের সময়োপযোগী ও যথাযথ ব্যবস্থা এবং প্রণোদনা প্যাকেজগুলোও এ মারাত্মক রোগের বিপর্যয়কর প্রভাব হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এ পর্যন্ত দেশের জিডিপির ৪ দশশিক ০৩ শতাংশ সমতুল্য ১৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একগুচ্ছ কোভিড -১৯ পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

শেখ হাসিনা মারাত্মক মহামারী মোকাবেলায় সাফল্যের জন্য তুর্কি নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে এর চিকিৎসা সরবরাহ প্রেরণের উদ্যোগেরও আমিও প্রশংসা করি।’

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি হিসাবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহামারীজনিত কারণে প্রাথমিকভাবে এক-দু’মাস কিছুটা মন্থরতা দেখানোর পরে জুলাই থেকে দেশের রফতানি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

তিনি বলেন, ‘দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন রেকর্ড ৩৯.৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমরা এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হওয়ার সঠিক পথে রয়েছি।’

শেখ হাসিনা সরকার এবং তার নিজের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশকে সহায়তা প্রদানের জন্য তুরস্কের সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান।

প্রধানমন্ত্রী তুর্কি ভাষায় প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ই-ভার্সন উদ্বোধন করেন।

 

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বলেন, তুরস্ক এবং বাংলাদেশের ভ্রাতৃপ্রতীম সম্পর্কের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারত উপমহাদেশের মানুষের দ্ব্যর্থহীন সমর্থনের কথা আমরা সবসময় স্মরণ করি।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাপক সাফল্যের প্রশংশা করে চাভুসোগলু বলেন, একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি নিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি সাফল্যের গল্প। তিনি বলেন, শক্তিশালী অর্থনীতি এবং বিপুলসংখ্যক যুব জনসংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশ হবে এশিয়ায় আমাদের অন্যতম প্রধান অংশীদার।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার এক বিপুল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের বদান্যতার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তার ও তুরস্কের ফাস্ট লেডির রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের কথা স্মরণ করেন।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় তুরস্কের চ্যান্সেরি ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য ঢাকা সফরে বাংলাদেশ পররষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন।

আঙ্কারায় বাংলাদেশ চ্যান্সেরি কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজ ৩ সেপ্টেম্বর সফলভাবে শেষ হয়।

কমপ্লেক্সটির মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে চ্যান্সারি বিল্ডিং, দূতাবাসের আবাসিক ভবন, ২২৯ আসনের ‘বিজয় একাত্তর’ নামক হাইটেক অডিটোরিয়াম, স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক সিস্টেম, মসজিদ, জিমনেসিয়াম, বাংলাদেশী আইটেমের জন্য প্রদর্শন কেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও আর্থ-সামাজিক বিকাশের ওপর রেফারেন্স বইসহ প্রন্থাগার।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি হিসাবে কমপ্লেক্সে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি আবক্ষ ভাস্কর্য ও একটি শহীদ মিনার স্থাপন করা হয়েছে।

এছাড়া, কমপ্লেক্সে ‘অজেয় বাংলাদেশ’ শিরোনামের একটি ৩৬ বর্গমিটার ম্যুরাল এবং পাশাপাশি বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন নিয়ে পোড়ামাটির কাজও করা হয়েছে।

শেয়ার করুন