ক্ষমা ও ভালোবাসায় সামাজিক শান্তি ও সম্প্রীতি


মো. রুহুল আমিন খানঃসামাজিক জীব হিসেবে সমাজে বসবাসরত সব মানুষের মধ্যে একটি আত্মিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এটাকে বলা হয়, সোশ্যাল রিলেশন বা সামাজিক সম্প্রীতি। সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে সমাজে বসবাসরত মানুষের মধ্যে এ সম্পর্ক অটুট রয়েছে। দৈনন্দিন লেনদেন, মতবিনিময় ও দেখাসাক্ষাতের মাধ্যমে এ সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়ে থাকে। এ সম্পর্কের কারণে সমাজে মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে। বর্তমানে মানুষের মধ্যে এ সামাজিক সম্পর্কের অবক্ষয় ঘটছে। তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি-মারামারি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত। তা সত্ত্বেও সমাজে এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে সহনশীলতার অভাব। এ কারণেই আমরা নিজেদের সংযত করতে পারছি না। অল্পতেই রেগে যাচ্ছি। অনেকে আবার নিজের বীরত্ব বা প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রকাশের জন্য তুচ্ছ বিষয়কে নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করছে। অহমিকার বশে অর্থ, বিত্ত ও শক্তির অপপ্রয়োগ করে অযথা মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে।

মানবতার কল্যাণের ধর্ম ইসলাম এমন অমার্জিত ও দুর্বিনীত আচরণ সমর্থন করে না। তাছাড়া মানুষকে কষ্ট দিয়ে বীরত্ব অর্জন করা যায় না। আর প্রকৃত বীরের কাজও এটা নয়। প্রকৃত বীরের সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় রাসুল (সা.) এর হাদিসে। আবু হুরায়রা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, সে ব্যক্তি প্রকৃত বীর নয়, যে কুস্তিতে বিজয়ী হয়। লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! তাহলে প্রকৃত বীর কে? তিনি বলেন, ‘প্রকৃত বীর সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।’ (মুসলিম)।

সুতরাং অর্থ-বিত্ত, শক্তি ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগের মাধ্যমে কারও বীরত্ব প্রমাণিত হয় না। বরং জুলুমের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অর্থ-বিত্ত, শক্তি ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে মানুষের মনে সাময়িক ভীতি সৃষ্টি করা যায়। শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা পাওয়া যায় না।

অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ক্রোধের বশে মানুষ যে কোনো ধরনের অমানবিক ও নিষ্ঠুর কাজ করতে পারে। তাই অমানবিক ও নিষ্ঠুর কাজ থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য ক্রোধ বা রাগ সংবরণে প্রতি ইসলাম ধর্মে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বান্দার ক্রোধ সংবরণে যে মহান প্রতিদান রয়েছে, তা অন্য কিছুতে নেই।’ (ইবনে মাজাহ)।

সুতরাং ঝগড়া বিবাদ থেকে বাঁচতে হলে নিজের ক্রোধকে দমন করতে হবে। লেনদেনে মনোমালিন্য হলে বা কোনো কারণে বাকবিতন্ডার সূচনা হলে ভাষাকে সংযত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই কাউকে গালাগাল করা যাবে না। কেননা গালাগালের কারণেই সর্বাধিক ঝগড়া-বিবাদ সংগঠিত হয়ে থাকে। তাই ইসলাম ধর্মে গালাগাল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কবিরা গোনাহগুলোর মধ্যে একটি হলো নিজের বাবা-মাকে অভিশাপ করা।’ জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহর রাসুল! মানুষ নিজের বাবা-মাকে কীভাবে অভিশাপ করে? তিনি বলেন, ‘যখন সে অন্যের বাবাকে গালাগাল করে, তখন সে নিজের বাবাকেও গালাগাল করে থাকে। আর সে অন্যের মাকে গালি দেয়, বিনিময়ে সে তার মাকেও গালি দেয়।’ (বোখারি)। অন্য হাদিসে গালাগালকে ফাসেকি কর্মকান্ড বলে অভিহিত করা হয়েছে।

মোটকথা, নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রকাশের নিমিত্তে অনর্থক হানাহানি-মারামারি করা যাবে না। কেননা হানাহানি-মারামারি করে দুনিয়ায় কেউ শান্তিতে বসবাস করতে পারে না। অধিকন্তু হানাহানি-মারামারির কারণে অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে। সুতরাং দুনিয়া এবং আখেরাতে সব অকল্যাণ ও শাস্তি থেকে বাঁচতে হলে আমাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে। সব ধরনের ক্রোধ বা রাগ থেকে নিজেকে সংযত রাখতে হবে। তাহলে সমাজে হানাহানি-মারামারি বন্ধ হবে। সামাজিক সম্প্রীতি ও বন্ধন অটুট থাকবে।

শেয়ার করুন