শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি বিশ্বে বাংলাদেশকে বিশেষ স্থান দিয়েছে

ওয়ালিউর রহমানঃ Jean Paul Sartre, in his Preface to Franty Fanan’s ‘The Wretched of the Earth’ said, ‘and when one day our human kind becomes full grown, it will not define itself as the sum total of the whole world’s inhabitants, but as the infinite unity of their needs.’

একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মুক্ত ও সম্মানজনক জীবনযাপনের অধিকারের জন্য বাঙালি জাতি বহু শতাব্দী ধরে সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে, তারা চেয়েছে বিশ্বের সব জাতির সঙ্গে শান্তি ও সৌহার্দের মধ্যে বসবাস করতে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের এনে দিয়েছেন একটি স্বাধীন ভূখণ্ড। তারপর তার সুযোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস, শক্তি ও অবস্থান।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বলতে গেলে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটু পেছনে তাকাতে হয়। খুব পেছনে গেলে কলেবর বেড়ে যাবে। শুরু করছি বঙ্গবন্ধু থেকেই। বঙ্গবন্ধু শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন; একজন দার্শনিক এবং অসামান্য বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ। গ্রিক হেরোডেটাসের কথা পড়েছি। পড়েছি রোমান সিসেরো। আর ব্রিটিশ গিবন। আর সাক্ষাৎ হল নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে। বঙ্গবন্ধু তাদের কাতারেরই একজন।

তিনি কিছু প্রশ্নবাণে আমাকে জর্জরিত করেছিলেন। আচ্ছা একটু বল তো কংগ্রেস অব ভিয়েনা সম্বন্ধে! বিসমার্ক নিয়েও কিছু বল (বঙ্গবন্ধু আমাকে তুই বলে ডাকতেন)। বললাম, Great question of the time will not be resolved by speeches

and majority decisions- those were the great mistakes of 1848 and 1849- by Iron and Blood?

বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ক্রুয়েল আনস্টেটসম্যানলাইক।’ আমি বললাম: স্যার, হাম্বুরাবি তো আরও কঠিন ছিল। তার বিচার ছিল ‘অ্যান আই ফর অ্যান আই অ্যান্ড আ টুথ ফর আ টুথ।’

আচ্ছা আমি তো ইতালির কাছেই। বল তো একটু রেনেসাঁ সম্বন্ধে। আমি বললাম: স্যার, অনেক সময় লাগবে। ভাবি খবর পাঠিয়েছেন। আপনাকে গিয়ে বিশ্রাম করতে হবে। তিনি বললেন, ‘ও আচ্ছা’, বঙ্গবন্ধুর বিশ্রাম ম্যান্ডাটরি। এর ভেতর শেখ হাসিনা এসেও তাড়া দিলেন-খেতে হবে।

এখানে কথা উঠল রোলেক্স ঘড়ির দাওয়াত নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর সম্মানে। এখানে একটু ব্যবসায়িক আঙ্গিক ছিল। ভাবি ও শেখ হাসিনা দু’জনেই বলে উঠলেন, ‘যাওয়া ঠিক হবে না। এতে সমালোচনা হবে।’ আমার দিকে তাকালেন বঙ্গবন্ধু। আমিও একমত। ঠিক হবে না। তথাস্তু। এই না যাওয়ার সিদ্ধান্ত একটি বড় দিকনির্দেশনা দেয় এবং শেখ হাসিনার যুগপৎ ‘না বলা’ থেকে তার একটা আদর্শ বা চিন্তাশীল মনের আভাসও পাওয়া যায়। শেখ হাসিনার ‘না’ বলাটায় একটা আগাম সংকেত পাওয়া যায় তার রাজনৈতিক দর্শনের।

যখন লন্ডনে জার্মান বোমারুবিমানের মুহুর্মুহু হামলা হচ্ছে, তখন ইন্দিরা গান্ধী ও ফিরোজ গান্ধী জাহাজে ভারত ফিরছিলেন। ডারবানে নামলেন। ভারতীয়দের অবস্থা দেখে ইন্দিরা রাগে ফেটে পড়লেন। বললেন, ‘Indira likened South Africa’s oppression of the Black population to Hitler’s persecution of the Jews.’ As Christine Toller had observed in London three years earlier, ‘Indira was indeed unafraid of the wind.’

শেখ হাসিনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তখন থেকেই দেখেছিলাম। ইন্দিরার মতে, ‘Hasina was unafraid of the wind.’

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সময় কামাল হোসেন বেলগ্রেডে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু পাঠিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের বিষয়ে আমি জানতাম বেলগ্রেডে কী এজেন্ডা ছিল। আমি তো ৮ দিন আগেই অক্সফোর্ড থেকে ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেই ছিলাম। শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা দু’জনই কামাল হোসেনকে অনুরোধ করলেন জার্মানিতে আসতে এ ভয়ংকর মুহূর্তে। তিনি তো পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বললেন, তার একটা পূর্বনির্ধারিত মিটিং আছে।

পাঠক, আপনাকে বুঝতে হবে কামাল হোসেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। হাসিনা-রেহানার আকুতি। এ সময় শেখ হাসিনার বয়স মাত্র ২৩ বছর। তারা মাতৃ-পিতৃহারা অনাথ। শেখ হাসিনা একটি নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হলেন। তার অজান্তেই। সেই রাত, সেই রাতই সৃষ্টি করল আজকের শেখ হাসিনাকে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী।

ক্যাথেরিন ফ্রাঙ্কের বইয়ে আছে, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে শেখ হাসিনার ক্ষমতার শীর্ষে উত্থানের বেশ সামঞ্জস্য আছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতা পাওয়ার সঙ্গে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায় : ‘Nothing was less inevitable in modern Indian politics than Indira Gandhi’s rise to power. Yet as often happens in history, once it happened nothing was more decisive.’

It was ‘Bangladesh history’s most crucial accident! (Last sentence adapted)

তার লিডারশিপ কোয়ালিটি আমি লক্ষ করেছি জেনেভায়। বিভিন্ন ঘটনায়। সময়ের ডাকেই তিনি এসেছেন। বঙ্গবন্ধুর পাশে। ১৫ আগস্টের পর ক্ষুধার্ত নেকড়ের দল দীর্ঘ একুশটি বছর সবকিছু কামড়ে-হিঁচড়ে ছিন্নভিন্ন করছিল। সামরিক বা আধা সামরিক শাসন। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ওরা ভয় পেত। ওরা ভয় পেত ৩০ লাখ শহীদের লাল রক্তকে। তাই তড়িঘড়ি করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সবকিছু দুমড়ে-মুচড়ে ফেলার চেষ্টায় ছিল। যুদ্ধাপরাধীরা দেশকে পাকিস্তানের একটি উপনিবেশ করার তৎপরতা শুরু করল। পাঠ্যপুস্তক বদলাল, পোশাক বদলাল, খাল খননে নতুন কিছু দেখানোর চেষ্টা করল। ইতালির বিখ্যাত দার্শনিক লেখক অ্যান্টোনিও গ্রামসির ভাষায় ‘The old is dying and the new cannot be born; in this interregnum there arises a great diversity of morbid symptoms…’

বাংলাদেশে অবশ্য এটি অনেক সময়। আমরা তো গড়তে চাচ্ছি। যা ধ্বংস হয়েছে। গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মারকুয়েজের ভাষায় ‘Generals, Love never dies. Allende and Neruda live. One minute of darkness will not make us blind!’

গ্রিক ফিলোসফার প্লেটো বললেন, ‘যে মানুষ গুহার ভেতর বাস করে, গুহা থেকে যখন বাইরের পৃথিবীর আলো দেখে, সে আলো দেখে সে ভয় পায়।’ বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই আলো। তার আলোকে ষড়যন্ত্রকারীরা ভয় করত। ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় ওরা নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল। নরেন্দ্র মোদি যথার্থই বলেছেন, ‘নিজের পরিবারের ১৬ জন সদস্যকে হারালেন, তারপরও শেখ হাসিনা ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে যুক্তির মাধ্যমে দেশে এসে বঙ্গবন্ধু ও তার স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে প্রতিজ্ঞা করে কাজ করে যাচ্ছেন।’

শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে কী কী করেছেন বা পররাষ্ট্রনীতিতে অবদানের জন্য কী কী রিওয়ার্ড পেয়েছেন, আমি যদি এখন তা বলতে যাই তাহলে সেটি আমার জন্য একটা ঔদ্ধত্য হবে। তাই আমি ইতিহাসের পিঠে ভর দিয়ে সামনে যাই। রাজনীতিক, চিন্তাবিদ ও দার্শনিকদের সঙ্গে নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়।

আওয়ামী লীগ সরকার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সদ্ভাব রেখে ভারসাম্যের কূটনীতি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এর সুফলও পাচ্ছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে চীন-ভারত, যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া, চীন-জাপান এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব আর লুকোছাপার বিষয় নয়। বাংলাদেশ এ পাঁচ প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সংহত অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে কৌশলগত সামরিক সহযোগিতারও সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছে।

একসময় বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে উপহাস করা হতো, যে রকমটি বলেছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। জুস্ট ফালেন বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ইজ আ টেস্ট কেইস অব ডেভেলপমেন্ট।’ সে জায়গা থেকে বিশ্বব্যাংকের মতে বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের আদর্শ। প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপার্সের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৯তম এবং ২০৫০ সাল নাগাদ ২৩তম অর্থনীতিতে উন্নত দেশে পরিণত হবে। মানুষের জীবনে সব ধরনের স্বস্তি ফিরে এসেছে। ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি হ্রাস পেয়েছে। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশ এখন খাদ্য নিরাপত্তা, শান্তিচুক্তি, সমুদ্রবিজয়, নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক উন্নতিতে অনুকরণীয়।

১৫ মার্চ ২০০৮-এ জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট (সিডিপি) সভায় বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ওঠার যোগ্যতার স্বীকৃতিপত্র প্রদান করা হয়। ২০০০ সালে শুরু হওয়া মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস বা এমডিজি অর্জনের সময় শেষ হয় ২০১৫ সালে। বাংলাদেশ এমডিজি অর্জনে সফলতা দেখিয়েছে। এরপর জাতিসংঘ ঘোষণা করে ১৫ বছর মেয়াদি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস বা এসডিজি। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। ১৭টি অভীষ্ট লক্ষ্যের মধ্যে বেশিরভাগই অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বাকিগুলোও অর্জনের পথে রয়েছি আমরা। এর মধ্যে দু-একটি লক্ষ্য বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে চলেছে তাতে ২০৩০ সালের আগেই এসডিজি বাস্তবায়নে সক্ষমতা অর্জন সম্ভব।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ৩৭টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রদান করা হয়। এর মধ্যে গণতন্ত্রের মানসকন্যা থেকে শুরু করে মাদার অব হিউম্যানিটি, ইউনেস্কো থেকে ১৯৯৮ সালে ‘হুপে-বোয়ানি’ শান্তি পুরস্কার, চ্যাম্পিয়ন্স অব দি আর্থসহ রয়েছে আরও অনেক প্রণিধানযোগ্য স্বীকৃতি।

প্রতিবেশী ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের চেয়ে দ্রুতগতিতে বড় হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। চীন, ভারত, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্টে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২১ সাল নাগাদ এটি ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে বলে আমরা আশা করছি। ২০১৮-১৯ সালে ভারতের সঙ্গে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মধ্যে বাংলাদেশের রফতানি ১ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ একটি স্ট্র্যাটেজিক প্লেয়ার হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। এটি যেমন আঞ্চলিক সংস্থাগুলো যথা- বিমসটেক, বিসিআইএম, বিআরআই, বিবিআইএনের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। উল্লেখযোগ্যভাবে চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্রসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিগত দশ বছরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, ন্যামসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় করণীয় বিষয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সমুন্নত করেছেন। পদ্মা সেতু তৈরিতে বিশ্বব্যাংকের পক্ষপাতদুষ্ট নীতির প্রতি নতি স্বীকার না করে বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বতন্ত্র স্ট্র্যাটেজিক প্লেয়ার হিসেবে সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জন্য একটি আদর্শ হিসেবে উপনীত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল থেকে এটিকে ব্যাহত করার প্রয়াস ছিল। পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট আন্তর্জাতিক আইনের পরিমার্জন ও পরিবর্ধনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

ইটলস (International Tribunal for the Law of the Sea)-এ মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যৌক্তিক সমুদ্রসীমা নির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বতন্ত্রভাবে কমপিট করার সক্ষমতা দেখিয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট আমাদের জন্য একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাম্বিয়ার সৌজন্যে আমরা আইসিজেতে পক্ষে রায় পেয়েছি। যদিও সেটি একটি অর্জন, তবে রায় কার্যকর বাধ্যবাধকতামূলক নয়। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা এটির শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রত্যাশা করি। নয়তো এটি একদিন অন্তর্বিস্ফোরণে (Implosion) রূপ নেবে।

বাংলাদেশ বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। সাফটা, বিমসটেক, আপটা, ডি-৮, পিটিএ, এফটিএ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বিগত দশ বছরে আরও কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। যেমন, EAAFP (East Asian Australasian Flyway Partnership) in 2010, Nagoya Protocol in 2010, MFF (Mangrove for Future) in 2012, SAWEN (South Asia Wildlife Enforcement Network) in 2013, APAP (Asia Protected Area Partnership) in 2014.

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আজ বাংলাদেশকে আপনি একটি রোল মডেল বানিয়েছেন; পৃথিবী দেখেছে। এর কারণ জানেন? একটি। আপনি তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। আপনি জাতির পিতার কন্যা। বিশ্বাস করা মুশকিল কীভাবে এত বাধা এত বিপত্তি সত্ত্বেও নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে এগিয়ে চললেন। বাংলাদেশের শত্রু যারা বাংলাদেশকে চায়নি, পাকিস্তানের কলোনি হয়ে থাকতে চেয়েছে, তারা ১৯ বার আপনাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। শেষবার ২১ আগস্ট ২০০৪ সালে।

তাই যখন ২১ আগস্ট ২০০৪ সালের সরকার একটা মিথ্যা ঢালের পেছনে মুখ ঢাকতে চায়, অনর্গল মিথ্যা কথা বলে, তখন তাদের নিয়ে আমার দুঃখ হয়, কষ্ট হয় যে এরাই তো মীরজাফরের বংশধর। ওরা চেয়েছিল স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করতে। কিন্তু সেটা তারা পারেনি। সর্বশক্তিমান আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করেছেন।

আপনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। ডিসেম্বর ১২, ১৯৯৬, হায়দরাবাদ হাউসে ৩০ বছরের গঙ্গা চুক্তি করলেন। একটা বিরল ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। এরপর আপনি চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টসের শান্তিচুক্তি করেছেন (সিএইচটি অ্যাকর্ড, ২ জানুয়ারি, ১৯৯৭)। রক্তের নদী বন্ধ করলেন। সেই শান্তিচুক্তি এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিছু বাকি আছে। আপনি নোবেল প্রাইজ পাবেন। আমরা শুধু সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু অদৃশ্য শক্তি সেটি বন্ধ করে দিল। আমি নিশ্চিত আপনি নোবেল পাবেন। শুধু সময়ের ব্যাপার।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এখানে একটা কথা না বললেই নয়, সেটি হল পদ্মা সেতুর উপাখ্যান। আমি উপাখ্যানই বলি। কারণ, এটা অনেকেই চাননি। স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে নির্দেশ গেল, গ্রামীণ ব্যাংকের বিষয়টি সমাধা ছাড়া পদ্মা সেতুতে কোনো ঋণ দেয়া হবে না। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোলিকের নাম ইতিহাসের নর্দমায় পড়ে থাকবে।

অবাক লাগে আজ যদি কোনো ফেডারেলিস্ট বা তাদের কোনো অনুসারী আমেরিকায় থাকতেন, তারা কী বলতেন? বিশ্বব্যাংক থেকে একটি প্রতিনিধি দল এলো। তারা আপনাকে বলল অমুক অমুক লোককে সরিয়ে দিতে হবে। তাহলে তারা টাকা দেবে। তারা নাকি দুর্নীতি করেছে। আপনি বললেন, আপনারা প্রমাণ করুন, আমি সরিয়ে দেব। তারা অনেক চেষ্টা করেছে; কিন্তু আপনি ঠাণ্ডা মাথায় অবিচল ছিলেন এবং বললেন, আমি বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করব।

আমি পেছনে ফিরে দেখি, একটা দেশ যখন বড় হয়, দরকার লিডারশিপ। মার্কিন মুলুকে জর্জ ওয়াশিংটন না থাকলে ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স হতো না। আব্রাহাম লিংকন যদি চিফ জাস্টিস ট্যানির কথা শুনতেন- পাওয়ার অব হেবিয়াস করপাস তুলে নিতে হবে, কোনো ব্যক্তিকে অ্যারেস্ট করা যাবে না, তাহলে আজ এক আমেরিকা থাকত না। দুটি আমেরিকা থাকত। ঠিক একইভাবে নেপোলিয়ন এবং ডি গল দিয়েছেন আধুনিক ফ্রান্স। আর মজ্জিনি ও গ্যারিবল্ডি দিয়েছেন ইতালি। ম্যাগনাকার্টা ব্রিটেনকে আধুনিক দেশ দিয়েছে, আইনের দেশ। মাও সে তুং চীন দিয়েছেন। মহাত্মা গান্ধী ও নেহেরু আধুনিক ভারত সৃষ্টি করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশ দিয়ে গেছেন। আর শেখ হাসিনা আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ তৈরি করেছেন। পদ্মা সেতু ও আপনার লিডারশিপ আপনাকে পৃথিবীতে প্রথম সারির ৩-৪ জন নেতার ভেতর একজন করেছে। বাঙালি জাতির উন্নতির অগ্রনায়ক আপনি।

আপনার আঞ্চলিক নীতি, আপনার পররাষ্ট্রনীতি, পরাশক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সঠিক নীতি- এসবই আপনাকে একটি বিশেষ স্থান দিয়েছে পৃথিবীতে। সঙ্গে আপনি বাংলাদেশকে দিয়েছেন একটি মর্যাদার স্থান। আজ জার্মানির চ্যান্সেলর বা সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীর নাম বা মাহাথির মোহাম্মদের নাম উঠলেই আসে আপনার নাম। আপনাকে নিয়ে গর্ব করে বাঙালি জাতি।

ওয়ালিউর রহমান : সাবেক সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; সাবেক রাষ্ট্রদূত; প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহায়ক (আইসিটিবিডি); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ হেরিটেজ ফাউন্ডেশন


শেয়ার করুন