আমার বাবা

ডা: আব্দুল হাই মুকুল: শৈশবেই তিনি মাতৃহারা। পিতাকেও হারালেন অসময়ে। সংগ্রামী জীবন ছিল তার। যুদ্ধ করেছেন দারিদ্রের সাথে এবং সমাজের সাথে ও। গোয়াইনঘাট উপজেলার যে স্থানে উনার জন্ম, সেখানে তখন কোন স্কুল ছিল না। দূরের স্কুলে ভর্তি হলেন। মৌলভীরা বাবার এই ইংরেজি শিক্ষাকে মেনে নিতে পারেনি। বারবার তার পরিবারের উপর এসেছিল কঠিন চাপ।
সব দুর্ভেদ্যতাকে অতিক্রম করে তিনি তার থানার প্রথম গ্রাজুয়েট এবং প্রথম এলএলবি। বাংলা এবং আরবি দুটোই খুব ভালো জানতেন। পবিত্র কুরআন শরীফে ছিল তার অগাধ জ্ঞান। সরকারের রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে চাকুরী জীবন তার সুখের ছিল না। সারা জীবনই চাকরি করতে হয়েছে দেশের আনাচে-কানাচে। তবুও হাল ছাড়েননি। ৯ জন সন্তানের প্রত্যেককে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করিয়েছেন। ভাই বোনদের মধ্যে আমরা তিনজন প্রকৌশলী, তিনজন চিকিৎসক, একজন ব্যাংকার এবং একজন শিক্ষক।
বাবাকে নিয়ে বললে একটি বই লিখতে হবে। একটা ঘটনাই শুধু বলব, যা আমার প্রফেশনাল জীবনের সাথে সম্পৃক্ত।তখন আমার মেডিকেল জীবনের সবচেয়ে কঠিন, ফাইনাল প্রফেশনাল এক্সাম চলছে। গভীর রাত অবধি আমি তখন পড়ছি। পরদিন মেডিসিন পরীক্ষার ভাইভা। হঠাৎ গ্রাম থেকে অসুস্থ একজন নারী এবং কয়েকজন পুরুষ এসে আমাদের বাসায় উপস্থিত। আমাদের বাসা তখন ছিল গরীব আত্মীয়-স্বজনের আশ্রয়স্থল। বাবা ওদেরকে খাইয়ে-দাইয়ে পাশের একটি ঘরে শুইতে দিয়েছেন। কিন্তু মহিলাটি তলপেটের ব্যথায় চিৎকার দিচ্ছিল। বাবার ইচ্ছে ছিল সকালে তিনি নিজেই তাদেরকে নিয়ে হাসপাতালে যাবেন।এখন মত বদলালেন। আমাকে নির্দেশ দিলেন এখনই ওদেরকে নিয়ে আমাকে হাসপাতালে যেতে হবে। আমি তখন স্তম্ভিত , উদভ্রান্ত। পরীক্ষার আগের রাতে কেউ একটা সেকেন্ডও নষ্ট করে না, আর মেডিসিন পরীক্ষা সব সময় আমার কাছে ছিল ভীতিকর। শেষ পর্যন্ত শেষ রাতেই তাদের কে নিয়ে আমি হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে গেলাম। মহিলার ইউরিনারি রিটেনশন ছিল। নল দিয়ে প্রস্রাব করিয়ে দিতেই মহিলা শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লো। ওদেরকে হাস্পাতালে ভর্তি করিয়ে আমি যখন রিকশায় বাসায় ফিরছি, তখন ভোরের ঠান্ডা বাতাস বইছে।আমার মনেও তখন এক ধরনের প্রশান্তি। বাবা বললেন, দেখিস, তোর পরীক্ষা কিন্তু ভালই হবে। মেডিসিন পরীক্ষায় পরীক্ষক ছিলেন তখনকার খ্যাতনামা চিকিৎসক প্রফেসর এমএ খালেক স্যার। তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলাম আর স্যার বারবার পাশের পরীক্ষককে বলছিলেন, দেখো আমার ছেলে কেমন সুন্দর উত্তর দিয়েছে।সত্যিই পরীক্ষায় খুব ভালো করেছিলাম।
বাবার নির্দেশ ছিল কখনো তোমার দরজা থেকে কাউকে ফিরিয়ে দেবে না। বাবার অনেক নির্দেশ হয়তো জীবনে চলার পথে পালন করতে পারিনি।কিন্তু জীবনে সত্যিই দরজা থেকে কাউকে কখনো তাড়িয়ে দেইনি।
হে আল্লাহ আমার বাবাকে তোমার দরজা থেকে ফিরিয়ে দিও না।
ডাক্তার আব্দুল হাই মুকুল: অধ্যাপক চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগ, রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ।

শেয়ার করুন