তামাকপণ্যে কর বাড়ানো হলে ব্যবহারকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন

সিলেটের সকাল ডেস্ক ।। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে তামাকাসক্ত ফুসফুস কোভিড-১৯ সংক্রমণে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই সতর্কতা আমলে নিলে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪ কোটি তামাক ব্যবহারকারী মারাত্মকভাবে করোনা সংক্রমণ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আসন্ন বাজেটে কার্যকরভাবে তামাকপণ্যের দাম বাড়ানো হলে তামাকের ব্যবহার কমবে এবং রাজস্ব আয় বাড়বে। বাড়তি রাজস্ব সরকার কোভিড-১৯ মহামারী সংক্রান্ত স্বাস্থ্য ব্যয় এবং প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যয় করতে পারবে।

মঙ্গলবার (০২ জুন) সকাল ১১টায় তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স- আত্মা’র যৌথ উদ্যোগে ‘কেমন তামাক কর চাই, বাজেট ২০২০-২১’ শীর্ষক ওয়েবিনারে অংশ নিয়ে এমনটাই সুপারিশ করেছেন একাধিক সংসদ সদস্যসহ অর্থনীতিবিদরা।

বক্তারা বলেন, চলমান কোভিড-১৯ মহামারি বুঝিয়ে দিয়েছে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য তামাক নিয়ন্ত্রণ কতটা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে জানিয়েছে তামাকযুক্ত ফুসফুস করোনা ভাইরাস সংক্রমণে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই সতর্কতা আমলে নিলে দেশে বর্তমানে প্রায় ৪ কোটি তামাক ব্যবহারকারী মারাত্মকভাবে করোনা সংক্রমণ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা এবং ত্রুটিপূর্ণ কর কাঠামোই এর প্রধান কারণ। তামাকপণ্যের দাম কার্যকরভাবে বাড়ানো হলে বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠী তামাক ব্যবহার শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে। শুধু তাই নয় দামের কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠী তামাক ছাড়তে অনেকটা উৎসাহিত হবে বলেও জানান তারা।

তামাক ব্যবহার বন্ধে প্রচার-প্রচারণার ব্যাপক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলেও জানান বক্তারা। এছাড়া আরো বলেন, শুধু দাম নয়, সচেতনতাই পারে এর ব্যবহার রোধ করতে। এছাড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ২৫ শতাংশ মহিলা ধোয়া বিহীন তামাক ব্যবহার করে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এটির ব্যবহার বন্ধে সরকারের নজর বাড়াতে হবে বলেও তারা মনে করেন। এক্ষেত্রে সরকারের কর কাঠামো ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে হবে। দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে কর বাড়াতে হবে। এতে করে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার কমবে বলে তারা আশা ব্যক্ত করেন।

বর্তমানে সিগারেটের মূল্য স্তর চারটি রয়েছে। এটিকে দুটি স্তরে আনার দাবি করেন বক্তারা। এই বাজেট প্রস্তাব সমর্থন করে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং জাতীয় তামাকবিরোধী মঞ্চের আহ্বায়ক ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, করোনা আমাদের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে। আমরা এ সুযোগে কল্যাণের পথ বেছে নিব। এক্ষেত্রে আমাদের তামাক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরে সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী এম.পি বলেন, যদি এবারের বাজেটে তামাকপণ্যে করারোপের ক্ষেত্রে কোন মৌলিক পরিবর্তন না আসে, এই বাড়তি ১১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের সুযোগ আমরা হারাই, এত মৃত্যু, অসুস্থতা অব্যাহতই থেকে যায় তাহলে আমি নৈতিকভাবে এই বাজেটকে সমর্থন করতে পারিনা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ মনে করেন ধূমপান কমাতে সিগারেটের স্তর সংখ্যা কমানোর বিকল্প নেই। তিনি বলেন, আসন্ন ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের বিদ্যমান চারটি মূল্যস্তর বিলুপ্ত করে দুটি নির্ধারণ করা দরকার। কারণ একাধিক মূল্যস্তর এবং বিভিন্ন দামে সিগারেট ক্রয়ের সুযোগ থাকায় ভোক্তা স্তর পরিবর্তন করার সুযোগ পায়। ফলে তামাক ব্যবহার হ্রাসে কর ও মূল্য পদক্ষেপ সঠিকভাবে কাজ করেনা। এর পাশাপাশি তামাক নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সংসদ সদস্যদের বিড়ির কর না বাড়ানোর পক্ষে চিঠি দেয়াকে দু:খজনক উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা: হাবিবে মিল্লাত এম.পি বলেন, তামাকের বিপক্ষে আমাদের শক্তিকে আরো জোরালো করতে হবে। প্রস্তাবিত কর ও দাম পদক্ষেপ সমর্থন করে তিনি বলেন এবারের বাজেট অধিবেশনে কমপক্ষে ১৫০ সাংসদকে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে কথা বলার জন্য উদ্বুদ্ধ করবো।

বাংলাদেশে মোট তামাক ব্যবহারকারীর অর্ধেকেরও বেশি ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য ব্যবহার করলেও এসব তামাকপণ্যের দাম সবচেয়ে সস্তা এবং রাজস্ব আয় খুব কম উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যে করারোপের ভিত্তিমূল্য খুব কম, তাই কর বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যও বাড়াতে হবে। এছাড়া তিনি অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থাৎ লাইসেন্সবিহীন উৎপাদনকারীদের কর জালের আওতায় আনার সুপারিশ করেন।

তামাকপণ্যে করারোপ বিষয়ে সাংসদদের সারা বছর ধরেই জোরালো ভূমিকা পালন করা উচিত বলে মনে করেন ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এম.পি। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা অধিবেশন চলাকালে বিভিন্ন ধারায় বছর জুড়েই তামাক বিষয়ে সংসদে প্রশ্ন এবং আলোচনা করতে পারেন। তিনি আরো বলেন, আমাদের তামাককে ব্যয়বহুল করে ফেলতে হবে। এতে তামাকের দাম বাড়বে, রাজস্ব বেশি আসবে এবং তামাকপণ্য ব্যবহারে মানুষ নিরুৎসাহিত হবে।

তামাকপণ্যের ওপর বিদ্যমান করকাঠামো সংস্কার ও এর সুফলের উপর গুরুত্বারোপ করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এর রিসার্চ ডিরেক্টর ড. মাহফুজ কবীর বলেন, তামাকপণ্যে করারোপ সহজ করতে সম্পূরক শুল্কের একটি অংশ সুনির্দিষ্ট কর আকারে আরোপ করতে হবে এবং অন্যান্য কর পদক্ষেপের সাথে সব ধরনের তামাকপণ্যের খুচরা মূল্যের ওপর ৩ শতাংশ হারে সারচার্জ আরোপ করা যেতে পারে। সবমিলিয়ে, তামাক-কর বিষয়ক এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে সম্পূরক শুল্ক এবং ভ্যাট বাবদ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত রাজস্ব এবং সারচার্জ থেকে আরো প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আয় অর্জন করা সম্ভব হবে। এই অর্থ সরকার তামাক ব্যবহারের ক্ষতি হ্রাস, করোনা মহামারী সংক্রান্ত স্বাস্থ্য ব্যয় এবং প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যয় করতে পারবে।

এটিএন বাংলার নিউজ এডিটর নাদিরা কিরণের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে মূল উপস্থাপনা তুলে ধরবেন প্রজ্ঞা’র হেড অব টোব্যাকো কন্ট্রোল প্রোগ্রাম হাসান শাহরিয়ার।

শেয়ার করুন