‘ক্যাপ্টেন’ মাশরাফির রাজকীয় বিদায়

মিজান আহমদ চৌধুরী, স্টেডিয়াম থেকে : দেশের জনপ্রিয়তম অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার নেতৃত্বের শেষ দিন ছিলো আজ। আজকের ম্যাচেই তিনি শেষবার টস করেছেন। এরপর থেকে তিনি একজন সাধারণ ক্রিকেটার হয়ে থাকবেন। প্রিয় অধিনায়ককে বিদায় জানাতে বৃষ্টি ভেজা স্টেডিয়ামে দর্শকের ঢল নামে। তাদের নিরাশ করেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। জিম্বাবুয়েকে উড়িয়ে দিয়ে সতীর্থরা রাজকীয় বিদায় দিয়েছে ক্যাপ্টেন ম্যাশকে। ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের প্রতিটি ক্রিকেট প্লেয়ার ‘থ্যাংক ইউ ক্যাপ্টেন’ লেখা জার্সি পরে মাঠে নামে। সেখানে জার্সি নাম্বার ছিলো মাশরাফির জার্সির সংখ্যার সাথে মিল রেখে ‘২’। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপন শুভেচ্ছা স্বারক ক্রেস্ট তুলে দেন তাকে।

জিম্বাবুয়েকে ১২৩ রানে হারিয়ে মাশরাফির নেতৃত্বে বাংলাদেশের এটি ছিলো ৮৮তম ম্যাচে ৫০তম জয়। ৩ ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করলো বাংলাদেশ।

২০০৯ সালে দলের গুরুদায়িত্ব বুঝে পেয়েছিলেন ম্যাশ। কিন্তু হাঁটুর ইনজুরির কারণে ঠিকভাবে পারেননি সেই দায়িত্বে মনোনিবেশ করতে। এরপর ২০১৪ সালে ফের পুরোদমে টাইগারদের দায়িত্ব বুঝে নেন টাইগার এই দলপতি। তার নেতৃত্ব বাংলাদেশ খেলেছে দুইটি বিশ্বকাপে।২০১৫ সালের ওয়ানডের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে বাংলাদেশ তার নেতৃত্বে । ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সেমি ফাইনাল খেলেছে বাংলাদেশ তার হাত ধরে।এছাড়া এশিয়া কাপের একটি ওয়ানডে আসরের ফাইনাল ও টি-টোয়েন্টি আসরের ফাইনাল খেলেছে দল। মাশরাফি বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়।তার অধিনে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো করে ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ে উঠে এসেছিলো ৬ নম্বরে।ওয়ানডেতে পাকিস্তান,ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজ জয় রয়েছে মাশরাফির অধীনে।

জিম্বাবুয়ে বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ দু’হাত ভরে দিয়েছে তামিম ইকবাল ও লিটন দাসকে। তারা দুজন মিলে করেছেন একের পর এক রেকর্ড।সিরিজে দুটি করে সেঞ্চুরি করেছেন এই দুই ওপেনার।সেই সাথে প্রথম উইকেট জুটিকে ২১ বছরের পুরনো রেকর্ড ভেঙ্গেছে করেছেন ২৯২ রানের জুটি । ১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চ ঢাকায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৭০ করেছিলেন মেহরাব হোসেন অপি ও শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ।প্রধম উইকেট জুটিতে তামিম-লিটনের ২৯২ রান জুটি বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ। এবং সকল উইকেট জুটিতে বিশ্বের মধ্যে ৬ষ্ঠ সর্বোচ্চ জুটি।
এর আগে বাংলাদেশের যেকোন উইকেট জুটিকে ২২৪ রানের জুটি ছিলো সর্বোচ্চ। ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে সাকিব ও মাহমুদ উল্লাহ মিলে করেন এই রেকর্ড জুটি। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে তামিম ১৫৮ রান করে বাংলাদেশের পক্ষে ওয়ানডেকে ব্যাক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়েন। এক ম্যাচ পর সেই রেকর্ড ভেঙ্গে লিটন করেন বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত ইনিংস ১৪৩ বলে ১৭৬ রান । ৫ বছরের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে আগে যেখানে একটি সেঞ্চুরি ছিলো সেখানে তিন ম্যাচেই করে দিলেন দুটি দুর্দান্ত সেঞ্চুরি। আগের ম্যাচে ১৫৮ রান করা তামিমও কম যাননি। ১০৯ বলে করেন ১২৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস । যেটি তার ক্যারিয়ারের ১৩তম সেঞ্চুরি। প্রথমবারের মতো কোনো ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি পেলেন বাংলাদেশের দুই ওপেনার।

তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট এ নিয়ে চতুর্থবার এক ম্যাচে জোড়া শতক আসল। এর আগে ২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া শতক পেয়েছিলেন তামিম ও মুশফিক। ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে মাহমুদউল্লাহ ও সাকিব জোড়া শতক পান। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রামে ইমরুল ও সৌম্য হাঁকান সেঞ্চুরি। এবার একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লিটন ও তামিম পেলেন সেঞ্চুরি।
একইসঙ্গে তামিম ইকবালের ৭ ছক্কা ছাড়িয়ে ইনিংসে সর্বোচ্চ ৮ ছক্কায় আরেকটি রেকর্ডও গড়েন লিটন। তাদের এই রেকর্ড জুটিতে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ৪৩ ওভারে ৩ উইকেটের বিনিময়ে ৩২২ রান করে বাংলাদেশ। তবে বৃষ্টি আইনে জিম্বাবুরেয়র কাছে লক্ষ্য দাড়ায় ৪৩ ওভারে ৩৪২ রানের।

৩৪২ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকে যেভাবে ব্যাট করা উচিত সেভাবে ব্যাট করতে পারেনি জিম্বাবুয়ে।প্রথম ওভারেই উইকেট হারায় জিম্বাবুয়ে। মাশরাফি বিন মুর্তজার করা চতুর্থ বলে উইকেটের পেছনে লিটন কুমার দাসের হাতে ক্যাচ দেন তিনাসে কামুনহকামউয়ি। ৪ রান আসে তার ব্যাট থেকে। মাশরাফির পর জিম্বাবুয়ে শিবিরে দ্বিতীয় আঘাত করেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। দলীয় ২৮ রানের মাথায় তার বলে শর্ট মিডউইকেটে মোহাম্মদ মিথুনের হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হন ব্রেন্ডন টেলর। ১৫ বলে ৩ চারে ১৪ রান করে যান তিনি।
২৮ রানেই ২ উইকেট হারানোর পর প্রতিরোধ গড়েন অধিনায়ক শন উইলিয়ামস ও রেগিস চাকাবা। তৃতীয় উইকেটে জিম্বাবুয়েকে টানছিলেন শন উইলিয়ামস ও রেগিস চাকাবা। তবে ৪৫ রানের বেশি যোগ করতে পারেননি তারা। দলীয় ৭৪ রানের মাথায় এই জুটি ভাঙেন আফিফ হোসেন ধ্রুব। তিনি সরাসরি বোল্ড করে দেন উইলিয়ামসকে। ৫ চারে ৩০ রান করে যান জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক।
ওয়েসলি মাধভেরের সঙ্গে ৩৯ রানের জুটি গড়ে ফিরেছেন রেগিস চাকাবা। তাকে আউট করেছেন তাইজুল ইসলাম। তাইজুলের বলে বোল্ড হয়ে যান তিনি। ৪৫ বল খেলে ১ চারে ৩৪ রান করে যান তিনি। আগের দুই ম্যাচের মতো এই ম্যাচেও জিম্বাবুয়েকে টানছিলেন ওয়েসলি মাধভেরে। দ্রুতই তুলে ফেলেছিলেন ৪২ রান। কিন্তু আজ তাকে আর হাফ সেঞ্চুরি ছুঁতে দেননি সাইফউদ্দিন। দলীয় ১৫০ রানের মাথায় পয়েন্টে মেহেদী হাসান মিরাজের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন তিনি। ৩ চার ও ১ ছক্কায় ৪২ রান করে যান তিনি। নিজের শততম ওয়ানডে ম্যাচে সিকান্দার রাজা করের স্রুতের বিপরীতে দাড়িয়ে ৫০ বলে ৬১ রানে ইনিংস।শেষ দিকে কেউ বলার মতো রান না করলে জিম্বাবুয়ে ৩৭.৩ ওভারে ২১৮ রানে অল আউট হয়ে যায়।
বাংলাদেশের হয়ে সাইফউদ্দীন চারটি,তাইজুল দুটি,মাশরাফি,মুস্তাফিজ ও আফিফ ১টি করে উইকেট লাভ করেন।

এর আগে শুক্রবার দুপুর ২টায় শুরু হওয়া ম্যাচে টস জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। দলকে দুর্দান্ত শুরু এনে দেন তামিম ইকবাল এবং লিটন দাস। বাংলাদেশের দুই ওপেনারের একসঙ্গে জ্বলে ওঠার ঘটনা খুব বিরল। আজ সেই বিরল ঘটনাই দেখল সিলেট স্টেডিয়াম। দুজনেই তুলে নিয়েছেন সেঞ্চুরি। গড়েছেন ২৯২ রানের ওপেনিং জুটি। ওয়ানডে ফরম্যাটে এটা যে কোনো উইকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। ডাবল সেঞ্চুরির খুব কাছে গিয়ে ফিরেছেন লিটন। তামিম ছিলেন অপরাজিত।

সিরিজের প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরি হাঁকানো লিটন আজ একটু ধীরে ১১৪ বলে ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি তুলে নেন। এরপর ভয়ংকর হয়ে ওঠে তার ব্যাট। একসময় মনে হচ্ছিল, কর্তিত ওভারের ম্যাচেও বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে ডাবল সেঞ্চুরি হতে যাচ্ছে। তবে দুর্ভাগ্য, মুম্বার বলে সিকান্দার রাজার তালুবন্দি হয়ে শেষ হয় লিটনের মহাকাব্যিক ইনিংস। ১৪৩ বলে ১৭৬ রানের টর্নেডো ইনিংসে ছিল ১৬টি চার এবং ৮টি ছক্কার মার।

অন্যপ্রান্তে থাকা দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবালও সিরিজে টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন আজ। ক্যারিয়ারের ১৩ তম সেঞ্চুরি হাঁকাতে তিনি খেলেছেন ৯৮ বল। শেষ পর্যন্ত তিনি ১০৯ বলে ৭ চার ৬ ছক্কায় ১২৮* রানে অপরাজিত ছিলেন। মাহমুদউল্লাহ মুম্বার বলে এলবিডাব্লিউ হওয়ার আগে করেন ৩ রান। অভিষিক্ত আফিফ হোসেন একেবারে শেষদিকে নেমে ইনিংসের শেষ বলে আউট হন ৭ রানে। বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩ উইকেটে ৩২২ রান।

শুক্রবার ২টায় সিলেট ক্রিকেট আন্তর্জাকিত ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ম্যাচ শুরু হয়। তবে বাংলাদেশের রান যখন ৩৩.২ ওভারে বিনা উইকেটে ১৮২ তখন বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ থাকে। ৪টা ৭ মিনিটে বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর থেমে থেমে চলে। তবে বিকেল ৫টা ৩৯ মিনিটে বৃষ্টি থেমে যায়।সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে মাঠ পরিদর্শন করেনআম্পায়াররা। পরিদর্শন শেষে সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে ম্যাচ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। খেরা শুরু হলে মাত্র ৯.৪ ওভার ব্যাটিং করতে বাংলাদেশ আবার মাঠে নামে। মোট ৪৩ ওভার পায় বাংলাদেশ।

মাশরাফির অধিনায়কত্বের বিদায়ী ম্যাচে চার পরিবর্তন করেছে ম্যানেজমেন্ট। মূলত, পাকিস্তান সিরিজে ওয়ানডে দলকে খেলানোর পরিকল্পনা দলের। তাই দল বিশ্রামে রেখেছে মুশফিকুর রহিমকে। এছাড়াও ইনজুরির জন্য বিশ্রামে আছেন নাজমুল হোসেন শান্ত। শফিউল পারিবারিক কারণে ফিরেছেন ঢাকায়। বাদ পড়েছেন আল আমিন হোসেন। বাংলাদেশের পক্ষে ওয়ানডে অভিষেক হচ্ছে মোহাম্মদ নাইম ও আফিফ হোসেনের। দলে ফিরেছেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দীন ও মুস্তাফিজুর রহমান। জিম্বাবুয়ে নেমেছে অপরিবর্তিত একাদশ নিয়ে।

বাংলাদেশ একাদশ

তামিম ইকবাল, লিটন দাস, মোহাম্মদ নাইম, আফিফ হোসেন, মোহাম্মদ মিথুন, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মোহাম্মদ সাইফউদ্দীন, মেহেদি হাসান মিরাজ, মাশরাফি বিন মুর্তজা (অধিনায়ক), তাইজুল ইসলাম, মুস্তাফিজুর রহমান।

জিম্বাবুয়ে একাদশ

তিনাশে কামুনহুকামউই, রেগিস চাকাবা, ব্রেন্ডান টেলর, শন উইলিয়ামস (অধিনায়ক), ওয়েসলি মাধবেরে, সিকান্দার রাজা, রিচমন্ড মুতুম্বামি, তিনোটেন্ডা মুতুমবোজি, ডোনাল্ড টিরিপানো, চার্লটন টিসুমা, কার্ল মুম্বা।

শেয়ার করুন