‘করোনার দিন-রাত্রি’ (দুই)

ডেগেনহ্যান আলদি সুপার স্টোরের সম্মুখে দুজন দুজন করে অপেক্ষমান কাস্টামারের লাইন

তাইছির মাহমুদ, লন্ডন থেকে: আটাশ মার্চ ২০২০। বৃটেনে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে বেসামাল গতিতে। কবে যে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলো দেখবো জানিনা। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবমান হচ্ছি আমরা। রাত পোহালেই অগনিত মৃত্যুর খবর। সারি সারি লাশ। আটাশ মার্চ শনিবার পর্যন্ত মারা গেছেন ১০১৯ জন। গত চব্বিশ ঘণ্টায় মারা গেছেন ২৬০ জন।

অষ্টম দিনের মতো হোম-কোয়ারিনটিনে আছি । দিন কাটছে একই রুটিনে। নামাজ কালাম, দোয়া দুরুদ। ফেসবুকিং,পড়াশোনা । বইয়ের প্রতি ছোটকাল থেকেই আগ্রহ ছিলো ভীষণ । বাজার থেকে আনা চিনির কার্টনটি খুলেও খুঁটে খুঁটে পড়তাম। চিনির কার্টনেও অনেক সময় শিক্ষনীয় গল্প পেয়ে যেতাম । রবীন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ, সৈয়দ মুজতবা সব শাখাতেই কিছু কিছু বিচরণ ছিলো। কিন্তু আজ সবকিছুর চেয়ে কাছে টানছে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল কুরআন।

আরও পড়ুন-করোনার দিন-রাত্রি-(এক)

তবে আজকের অর্ধেক দিনই কাটিয়ে দিলাম বাংলদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোয়ারিনটিনে থাকা স্বজনদের সাথে কথা বলে। প্রযুক্তির সুবাদে লাইভ কথা হলো সকলের সাথে। ‘ইমো’র মাধ্যমে একসাথে ছয়জনের সাথে লাইভ কথা যায়। দুপুর বারোটার দিকে শুরু করেছিলাম। একটানা চললো বিকেল ৫টা পর্যন্ত। ভালো মন্দ জানার চেয়ে করোনাই ছিলো কথোপকোথনের মুল বিষয়। সকলের মধ্যেই যেন ‘ইয়া নফসি ইয়া নফসি’ ভাব। আশা করছি আগামীকালও কথা বলবো অনেকের সাথে। যত আত্মীয়-স্বজন আছেন সকলের সাথেই পর্যায়ক্রমে কথা হবে ইনশাল্লাহ । বিলেতের যান্ত্রিক জীবনে যাদের সাথে বছরের পর বছর কথা বলার সময় হয়না সকলের সাথেই মনভরে কথা বলার চেষ্টা করছি। আসলে করোনাই এই সুযোগটুকু করে দিয়েছে। হাজার হাজার মাইল দূরে বিচ্ছিন্নভাবে থাকা আপনজনকে একীভুত করে দিয়েছে করোনা। ইমোতে কথা বললে মনে হয় যেন সকলেই একই পরিবারের সদস্য। একই ঘরে বসে কথা বলছি। গল্প করছি। এটাই করোনার করুণা।

নিয়মিত ব্যায়ামের অংশ হিসেবে বিকেলে সাইকেল নিয়ে বেরুলাম। বেরুনোর সময় স্ত্রী বললেন, দুধ শেষ হয়ে গেছে। তিনি আমাকে চার লিটার দুধের জন্য ভাংতি পয়সা দিলেন। বললেন, ক্যাশ পয়সা পরিশোধের পর যেন কোনো ভাংতি পয়সা ফিরিয়ে না আনি। ১০/২০ পেন্স পাওনা থাকলেও যেন দোকানেই রেখে আসি। কারণ ভয়, ভাংতি পয়সার সাথে করোনা চলে আসতে পারে। সাইকেল চালিয়ে ঘুরতে ঘুরতে গেলাম সুপার স্টোর ‘আলদি’তে। ঘর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। গিয়ে তো চক্ষু চড়কগাছ। স্টোরের সামনে দীর্ঘ লাইন। সুনির্দিষ্ট দুরত্ব বজায় রেখে সমান্তরাল পায়ে দুজন দুজন করে দাঁড়িয়ে আছেন স্টোরের সম্মুখে। দুজন বেরুচ্ছেন, তো দুজন ঢুকছেন।

দেখলাম সেখানে দাঁড়ালে এক ঘণ্টার আগে কিছুতেই মুক্তি পাবো না। তাই স্বেচ্ছায় পালালাম। ঘরের পাশে একটি পেট্রল স্টেশন আছে। দ্রুত চলে এলাম সেখানে। ভেতরে ঢুকে দেখলাম শুধু দোকানীই একা দাঁড়িয়ে আছেন কাউন্টারে। আমি চার লিটার দুধ কিনে কাউন্টারে ভাংতি পয়সা দিলাম। দোকানীর হাতে গ্লাবস ও মুখে মাস্ক। তিনি পয়সা রেখে আমাকে ৯ পেন্স ফেরত দিতে চাইলে আমি সম্প্রদান কারকে সবিনয়ে সেগুলো চ্যারিটি বাক্সে রেখে দিতে বললাম। তিনি বিনাবাক্যে ভাংতিগুলো রেখে দিয়ে আমাকে দ্রুত বিদায় দিলেন। দোকানদারের মুখেও যেন আতংকের ছাপ।

ঘরে ফিরে বাইরে থাকতেই ড্রাইভওয়েতে রাখা ডাস্টবিনে গ্লাবস ও মাস্ক ছুড়ে ফেললাম। ঘরে ঢোকার পর স্ত্রী নির্দেশ জারি করলেন, দুধ কন্টেইনারটি যেন লিকুইড দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে তারপর ফ্রিজে রাখি। নির্দেশ মতোই সবকিছু করা হলো। এবার লিকুইয়েড দিয়ে ৩০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুয়ে, ফের কোয়ারিনটিনে মনোনিবেশ করলাম।

করোনা থেকে বাঁচতে সরকারী নির্দেশনায় যা আছে তারচেয়ে বরং বেশিই করছি। কিন্তু বাঁচানোর মালিক তো একজন। সর্বশক্তিমান আল্লাহ। তিনি চাইলে বাঁচাবেন। চাইলে মারবেন। তবে তাঁর ওপর ভরসা করে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকলে তো হবেনা। সবধরনের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ বিশ্বনবী বলেছেন, উট ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করলে চলবে না। উটকে রশি দিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে রেখে তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। আমরা তা-ই করছি। এখন তিনিই আমাদের রক্ষাকবজ। ইতালির প্রধানমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন, এখন আর আমাদের উপরওয়ালার সাহায্য চাওয়া ছাড়া কোনো কিছুই করার নেই। উপায় একজনই। তিনি হলেন উপরওয়ালা।

ডেগেনহ্যাম, লন্ডন
২৮ মার্চ ২০২০

শেয়ার করুন