আমেরিকায় আজ করোনা যেন পিলোউ পাসিং গেইম

মাহমুদুর রহমান, আমেরিকা: হাতে বালিশ নিয়ে গোলাকার হয়ে খেলোয়াড়রা বসে কিংবা দাঁড়িয়ে থাকেন। বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে যার হাতে বালিশ থাকে সে তাড়াতাড়ি পাশের জনের কাছে দিতে থাকে। কারণ পরবর্তী বাঁশি যখন বাজবে তখন যার হাতে বালিশ থাকবে সে আউট। আবার শুরু হবে, আবার বাঁশি বাজবে, আবার আরেকজন আউট হবে। এভাবে সর্বশেষ ব্যক্তি পর্যন্ত খেলা চলতে থাকবে। করোনা ভাইরাসও সারাবিশ্বে এই পিলোউ পাসিং গেইম শুরু করেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী, নতুন নতুন এলাকা সংক্রমণের খবর আসছে। আমরা সবাই অপেক্ষা করছি কোনদিনের বাঁশিতে কে আউট হয়ে যাব।

অবাধ তথ্য প্রবাহের অভাবে চীনের হিসাব অনেকেই বিশ্বাস করেন না। কিন্তু করোনা যখন ইউরোপের ইতালীতে আস্তানা গাড়লো তখন বিশ্ববাসীর টনক নড়ে উঠে। এখন চীন, ইতালী সবাইকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র করোনা সংক্রমণে সবার উপরে। বিশ্ব রাজধানী হিসেবে পরিচিত নিউইয়র্ক হতে যাচ্ছে মৃত্যুপুরী। হাসপাতালে জায়গা নেই। করোনা ভাইরাসের আলামত নিয়ে শত শত রোগী হট লাইনে ফোন দিচ্ছেন পরীক্ষার জন্য।। তাদেরকে বাসায় থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। আলামত আরও নিশ্চিত হলে পরীক্ষা করা হবে বলা হচ্ছে। জ্বর, কাশি, গলাব্যথা এসবের জন্য পরীক্ষা করা হচ্ছে না বললেই চলে। চুড়ান্ত আলামত শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তখন পরীক্ষা করা হচ্ছে। স্বামী আইসিইউতে করোনা রোগী হিসেবে আছেন। স্ত্রী সব আলামত নিয়ে এখনও বাসায়। বার বার বলা হচ্ছে তবুও করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে না। কারণ এরচেয়েও জটিল রোগী সিরিয়ালে আছেন। আবার আরেকজনের কথা জানি, যার শ্বশুর ক্যান্সার নিয়ে কিছুদিন থেকে হাসপাতালে ছিলেন। শ্বশুরকে দেখাশোনার জন্য নিয়মিত হাসপাতালে যেতে হতো। কিছুদিন পর তার জ্বর আসে। সে বাসায় কোয়ারান্টাইনে চলে যায়। তারপর শ্বশুরের করোনা পরীক্ষার রেজাল্ট পজিটিভ আসে। এখন সে প্রতিদিন হাসপাতালে সব বিবরণ বলে ফোন দেয় কিন্তু কেউ তার পরীক্ষার ব্যবস্থা করেনি। তাকে বলা হয়েছে অবস্থার আরও অবনতি হলে তারা দেখবে। এই দুই ঘটনা নিউইয়র্ক সিটির। এ দুটো মিশিগান বসে আমি জানি। আমার এ লেখা যারা পড়বেন তারা হয়তো আর শত শত ঘটনা জানেন।

সবার ধারনা নিউইয়র্ক এর ৬০ শতাংশের উপর মানুষ করোনায় আক্রান্ত হবে। হয়তে ইতোমধ্যেই আক্রান্ত। পরীক্ষা ও হাসপাতালের অপর্যাপ্ততার কারণে তা জানা যাচ্ছে না। করোনায় আক্রান্ত রোগীর যখন প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তখন হাসপাতালে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা হয়। কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রয়োজন প্রচুর ভেন্টিলেটর যা এখন নেই। ডাক্তাররা এখন রেশনিং করে এক ভেন্টিলেটর দিয়ে দুজন রোগী কাভার করছেন। আসলে ধনী-গরীব বিশ্বের কোনো দেশেরই এ ধরনের মহামারী মোকাবেলার কোনো প্রস্তুতি ছিল না। আমি যখন লিখছি তখন যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা অফিসিয়েলি এক লাখ ষোল হাজারের উপরে। এর মধ্যে শুধু নিউইয়র্ক স্টেটে বায়ান্না হাজারের উপরে রোগী।

আমেরিকার অন্যান্য স্টেটগুলোতেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনা রোগী। পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে নিউইয়র্ক এর পর মহামারীর নতুন কেন্দ্রস্থল হতে যাচ্ছে মিশিগানের মেট্রো ডেট্রয়েট এলাকা। ডেট্রয়েট পুলিশের প্রধান করোনা পজিটিভ। এর আগে একজন পুলিশ অফিসার সহ দুজন ডেট্রয়েট পুলিশের সদস্য মারা গেছেন করোনায়। ডেট্রয়েট সিটি মেয়র ঘোষণা করেছেন নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকবে দুটো কারণে। এক. তারা তাদের প্রতি ঘন্টায় করোনা রোগী পরীক্ষার ক্যাপাসিটি বাড়িয়েছেন। দুই. ডেট্রয়েটের মানুষ যদি ঘরে থাকার শর্ত সঠিকভাবে পালন না করেন।

করোনা পরীক্ষার সামর্থ্য কম মানে অফিসিয়েলি রোগীর সংখ্যা কম। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে এখন পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ মনে করা হচ্ছে অধিক সংখ্যক মানুষকে পরীক্ষার মাধ্যমে আইসোলেশনে নিয়ে যাওয়া। সংক্রমিত ব্যক্তির কাছ থেকে সুস্থ মানুষকে দূরে রাখাই করোনা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। হয়তো ভবিষ্যতে ওষুধ ও ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে অবস্থার উন্নতি হতে পারে। এখনও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, সামাজি দূরত্ব বজায় রাখা ব্যক্তি পর্যায়ে এগুলোই করোনা মোকাবেলায় করণীয়। আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যত বেশি সম্ভব মানুষকে করোনা পরীক্ষার মাধ্যমে আইসোলেশনে নিয়ে যাওয়া ছাড়া কিছুই করার নেই। তারপর ক্রিটিক্যাল রোগীদের আইসিইউ সাপোর্ট ও ভেন্টিলেশন দেয়া। কিন্তু আজ বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রই পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত কীট, আইসিইউ, ভেন্টিলেশন ও পিপিই সরবরাহ করতে পারছে না। এমন অসহায়ত্ব পৃথিবীবাসীর ইতিহাসে বিরল। বিশ্বের প্রচন্ড ক্ষমতাধর সরকার প্রধানদের চেহারায় ভয় ও অসহায়ত্বের ছাপ দেখা যাচ্ছে। অথচ এরা হাতের আঙ্গুলের এক চাপে পৃথিবী পরমাণু বোমায় ধ্বংস করে ফেলতে পারে। একে অন্যকে ধ্বংসের জন্য তারা যত গবেষণা করেছে, জনগনের ট্যাক্সের যত টাকা বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে তার সামন্য এক অংশও এরকম রোগবালাই প্রতিরোধের জন্য বরাদ্দ থাকলে আজ এত অসহায় হতে হতো।

মৃত্যুকে সামনে নিয়েও বিশ্বনেতারা তাদের পারস্পারিক প্রতিশোধস্পৃহা ত্যাগ করতে পারছে না। এখনও ইরান তার উপর অবরোধ নিয়ে করোনা মোকাবেলা করছে। এখনও গাজার মানুষরা বছরের পর বছর যেভাবে বন্দী ছিল আজও তেমনি আছে। এখনও পৃথিবীর সব জায়গায় সংখ্যালঘুরা কমবেশি নির্যাতিত। যুদ্ধবাজ ও ধর্মবাজরা তাদের স্ব স্ব চেহারায় এখনও বর্তমান। তাই খুব সহজে আমরা করোনা থেকে মুক্তি পাবো বলে মনে হচ্ছেনা।

আমরা যারা আমেরিকায় বাংলাদেশী প্রবাসী তাদের সবচেয়ে বড় অংশটির বসবাস নিউইয়র্ক শহরে। তারপরেই হয়তো মিশিগান। দুটো জায়গাই আমেরিকার সবচেয়ে করোনা বিধ্বস্ত এলাকা। তবুও আমাদের দেশের অনেক আলেম ইহুদি-নাসারা গজবে নিপতিত বলে আপাত সুখে আছেন। অথচ এদের অনেক মসজিদ মাদ্রাসায় উল্লেখযোগ্য পরিমান অনুদান এসব গজবে নিপতিত এলাকা থেকে গিয়ে থাকে। এখনও দুনিয়ার মানুষের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করার মতো উদারতা অনেক আলেমের হয়নি। শুধু দোয়া করছেন মুমিন মুসলমানের জন্য। আশাকরি যুদ্ধবাজ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ধর্মবাজ আলেমদেরও হুশ হবে। এরা সবাই আরও উদার ও মানবিক হবেন।

আপাতত আমরা নিয়তির হাতেই আমাদেরকে সঁপে দিয়ে দিন যাপন করছি। কাল কী হবে জানি না! আজকের দিনটিই উপভোগ করছি। দেশের আত্মীয়-স্বজনরা আমাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। আমরাও তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করছি। প্রকৃতি যদি আপন খেয়ালে করোনা ভাইরাস প্রতিহত না করে তাহলে বাংলাদেশের কী হবে এ দুশ্চিন্তা প্রতিটি প্রবাসী বাংলাদেশীর। যদিও বাংলাদেশের আগে ইউরোপ আমেরিকা প্রবাসীরাই অধিক ঝুঁকিতে আছেন!

তবে কিছু আশার কথা আছে। করোনা সংক্রমিত হলেই মৃত্যু নয়। অনেকেই সুস্থ হয়ে উঠছেন কোনো ধরনের ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে না গিয়ে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সহ সারা দুনিয়ার বিজ্ঞানীরা রাতদিন কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিষেধক ও ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য। যেকোনো দিন সকালে হয়তো শোনা যাবে সবকিছুই মানুষের নিয়ন্ত্রণে। মাস্ক পিপিই ও কীটের বদলে আমরা বিতরণ শুরু করবো ওষুধের। তারপর শুরু হবে ভ্যাকসিনেশন পৃথিবী থেকে বিদায় হবে ঘাতক ভাইরাস করোনা। দুনিয়ার মানুষ মুক্ত হবে শ্বাসরুদ্ধকর পিলোউ পাসিংয়ের মতো করোনা পাসিং মরণ খেলা থেকে।

এই আশাবাদ নিয়ে আপাতত আমরা ভালো আছি। সবাই স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলুন। নিজে ভালো থাকুন ও অন্যকে ভালো রাখুন। আল্লাহ সবার প্রতি সহায় হোন।

মার্চ ২৮, ২০২০
মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র।
Mahmudpukra@gmail.com

শেয়ার করুন