নাগরী ভাষা হারিয়ে গেছে, বর্ণ টিকে রয়েছে:: ভাষা গবেষক ড.আশ্রাফুল করিম

হাবিবুল হাসান রিজভী, শাবি প্রতিনিধি:: নাগরী লিপি বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে এবং ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় ব্যবহৃত ভাষার একটি লিপি। সিলেটের বাইরে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ জেলায় এই লিপির প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। এই লিপি দিয়ে প্রমিত বাংলা, সংস্কৃত কিংবা প্রাকৃত নয়, বরং সিলেটি ভাষাই লেখা হত। আর এই নাগরী ভাষা হারিয়ে গেছে, কিন্তু বর্ণ টিকে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নাগরী ভাষার গবেষক সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আশ্রাফুল করিম। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সিলেটের সকালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বাংলা ভাষার হারিয়ে যাওয়া একটি লিপি ‘নাগরী’। বর্তমানে অপ্রচলিত এ লিপিতে এক সময় সিলেট অঞ্চলে রচিত হয়েছে অনেক মূল্যবান সাহিত্য। জটিল সংস্কৃত প্রধান বাংলা বর্ণমালার বিকল্প লিপি হিসেবে সে সময় নাগরী লিপির উদ্ভব ঘটেছিলো। লিপিটি এতটাই সহজ জনপ্রিয় হয়েছিলো যে, মাত্র আড়াই দিনে তা শেখা যেতো বলে বলা হতো ‘আড়াই দিনে হিকা যায়’। এক সময় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল প্রধানত সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত ছিলো এ লিপির সাহিত্য। তবে সিলেট ছাড়াও কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ভৈরব, আসাম, করিমগঞ্জ ও শিলচরে এর ব্যবহার ছিলো। ড. আশ্রাফুল করিম এই নাগরী লিপিমালাকে বিজ্ঞানসম্মত এবং রীতিমতো বিস্ময়কর বলে জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, আধুনিককালের ভাষাবিদরা ভাষাকে সহজ করতে যে পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করছেন, প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বছর আগে নাগরী লিপিতে তা করা হয়েছিল।  তিনি আরও জানান, এটা এতোটাই সহজ যে, নারীরা মাত্র আড়াই দিনে শিখতে পারতেন। আর পুরুষদের শিখতে লাগতো মাত্র একদিন। ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থ থেকে জানা গেছে, নাগরী লিপিতে বর্ণমালায় বর্ণসংখ্যা ৩২টি। বর্ণগুলো হচ্ছে- আ ই উ এ ও ক খ গ ঘ চ ছ জ ঝ ট ঠ ড ঢ ত থ দ ধ ন প ফ ব ভ ম র ল ড় শ হ।

নাগরী লিপির উৎপত্তি সম্পর্কে ড. আশ্রাফুল করিম বলেন, ইসলাম প্রচারের জন্য ৩৬০ জন আউলিয়াকে নিয়ে এখানে হযরত শাহজালাল(রাঃ) আসার পর এটি শুরু হয়। তখন হিন্দুরা সংস্কৃত আর মুসলমানরা আরবির প্রতি অনুরক্ত থাকায় তাদের একই লিপিতে নিয়ে আসতে এ ৩৬০ জন আউলিয়ার মধ্য থেকে একটি কমিটি করা হয়েছিল। তারা হিন্দু-মুসলমান সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি লিপি বের করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, সবার মধ্যে ইসলাম প্রচার। তিনি আরও বলেন, সহজে শেখা যায় বলে এটি আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।  এর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, নাগরী বর্ণগুলো আমাদের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক গৃহস্থালি দ্রব্যের মতো হওয়ায় এটি শেখা ছিল সহজ। যেমন- লাঙ্গলের অনুরূপ বর্ণ আছে নাগরীতে।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নাগরী লিপি চর্চার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে চালু করা হয়েছে নাগরী লিপির ফন্ট। নাগরীর উৎপত্তিস্থল সিলেটে নাগরী লিপি শেখার জন্য একটি ইনস্টিটিউট ও নাগরী চর্চা কেন্দ্র খোলা হচ্ছে।

গবেষক ড. আশ্রাফুলের মতে, ভাষাটির চর্চা ও গবেষণা হলে অনাবিষ্কৃত অনেক পুঁথি উদ্ধার সম্ভব, যার মাধ্যমে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য নতুন করে বিনির্মাণ হবে। বিভিন্ন গবেষণামূলক গ্রন্থ ও প্রবন্ধ থেকে জানা গেছে, হালের অসংখ্য জনপ্রিয় গান রয়েছে, যেগুলো নাগরী লিপিতে লেখা হয়েছিল। যেমন- সৈয়দ শাহনূরের (১৭৩০-১৮৫৫) ‘অরিন জংগলার মাঝে বানাইলাম ঘর/ভাই নাই, বান্ধব নাই, কে লইব খবর’ কিংবা শিতালং শাহের (১৮০০-১৮৮৯) ‘অজ্ঞান মন, খুয়াইলায় মহাজনের ধন’ ইত্যাদি।

তিনি বলেন, সিলেটি নাগরী লিপিতে রচিত সাহিত্য বিষয়-বৈচিত্র্যে অনন্য। এই লিপিতে রচিত পুঁথির সঠিক সংখ্যা এখনো অজানা। পৃথিবীতে প্রায় কয়েক হাজার ভাষা রয়েছে। এর মধ্যে অনেক জনগোষ্ঠী আছে, যাদের ভাষা আছে কিন্তু বর্ণমালা বা লিপি নেই। তবে বর্ণমালা বা লিপি আছে, আর ভাষা হারিয়ে গেছে এক্ষেত্রে সিলেটি নাগরী লিপিই একমাত্র দৃষ্টান্ত। এই বিষয়ে সরকারের উচিৎ এই সিলেট অঞ্চলের বিদ্যাপীঠগুলোতে নাগরী লিপি সংক্রান্ত কোর্স পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভূক্ত করা। এই নাগরী লিপির চর্চা না থাকলে নাগরী ভাষার মতো লিপিও একসময় হারিয়ে যাবে।

শেয়ার করুন