চানাচুর বিক্রেতা থেকে ইয়াবা সম্রাট তবারক!

বিশ্বনাথ (সিলেট) প্রতিনিধি ॥ সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের পাঠাকইন গ্রামের মৃত আলকাছ আলীর ছেলে তবারক আলী। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। এজন্য পড়াশোনা বেশ হয়নি। ছোট থেকেই বখে যান তিনি। শুরু করেন ব্যবসা। কখনও পলিথিন, আবার কখনও চানাচুর বিক্রি করতে তিনি। এরপরই তিনি নাম লেখান আন্তঃবিভাগীয় গাড়ি চোর চক্রের খাতায়। সেখান থেকেই কপাল খুলে তার।

পরে নাম লেখান মাদক বিক্রির খাতায়। স্ত্রী সাবিনা আক্তারসহ পুরোদমে নেমে পড়ে ইয়াবা ব্যবসায়। গড়ে তুলে শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট। মাদক সাম্রাজ্যে পরিচিত হয়ে উঠে ‘ইয়াবা সুমন’ নামে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে অর্থ-বিত্তে বিলিয়নপতিতে পরিণত হয় সে। তার এই অর্থ-বিত্তের উৎস ও মাদক সাম্রাজ্য আড়াল করতে অবতীর্ণ হয় ‘কথিত’ দানবীরের ভূমিকায়। দান-দক্ষিণা পেয়ে অনেকেই ভক্ত হয়ে পড়েন তবারকের।

তবারক আলী ২০১০ সাল থেকে চুরি-ছিনতাইয়ে অভিযুক্ত হতে থাকলেও মূল আলোচনায় আসে ২০১১ সালে। ওই বছরের ২৪ নভেম্বর বিশ্বনাথ থানা পুলিশ একাধিক চুরির মামলায় ২ দিনের রিমান্ডে নিয়ে আসলে পরদিন বিকেল ৩টার দিকে হাতকড়াসহ থানা হাজত থেকে পালিয়ে যায় সে। পালিয়ে যাওয়ার ৭ ঘন্টার মধ্যেই তাকে আবার গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এ ঘটনায় সে সময় থানা পুলিশের দুই সদস্য ক্লোজড হন। এ ঘটনার পর ধীরে ধীরে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায় তবারক। বছর দেড়েক পূর্বে তার বাড়ির সামনে থেকে দু’জন অজ্ঞাতনামা নারীর লাশ উদ্ধার ও গ্রামের মসজিদ নিয়ে দু’ক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে তবারকের মাদক সাম্রাজ্যের কাহিনী সামনে চলে আসে।

২০১০ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেট বিভাগের বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে চুরি-ছিনতাইয়ের অভিযোগে সাতটি মামলা ও দুটি জিডি দায়ের হয়েছে বলে জানা গেছে। ২০১৯ সালে তার বিরুদ্ধে বিশ্বনাথ থানায় দুটি মামলা ও দুটি জিডি দায়ের করা হয়। ওই বছরের ২৬ আগস্ট ৩৬(১) এর ১৯(ক) মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইন-২০১৮ অনুযায়ী থানার এসআই দেবাশীষ শর্ম্মা বাদী হয়ে তবারকসহ ৩ জনকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা (নং ২৪, তাং ২৬.০৮.১৯ইং) দায়ের করেন।

এ ঘটনায় বিশ্বনাথ-লামাকাজী সড়কের আমজদ উল্লাহ কলেজের সামনে থেকে আধা কেজি গাঁজাসহ তার স্ত্রী সাবিনা আক্তারের মালিকানাধীন সিএনজিচালিত অটোরিকশা (সুনামগঞ্জ-থ ১১-২০৬৭) জব্দ করে পুলিশ। পরে একই বছরের ২৪ অক্টোবর তবারককে অভিযুক্ত করে থানা পুলিশ সেই মামলার চার্জশিট আদালতে প্রেরণ করে। এ আগে, ওই বছরেরই ১৬ অক্টোবর সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে তবারক আলী ওরফে ইয়াবা সুমনকে গ্রেপ্তারের দাবিতে রামপাশা ইউনিয়র পরিষদের চেয়ারম্যানসহ এলাকার প্রায় ৩ শতাধিক ব্যক্তি স্বাক্ষরিত স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

এই স্মারকলিপি প্রদানের আগে তবারকের পক্ষে স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বারসহ এলাকার প্রায় শতাধিক ব্যক্তি স্মারকলিপি প্রদান করেন। এলাকাবাসীর দেয়া স্বারকলিপিতে স্বাক্ষর দেয়ায় ১৭ অক্টোবর পাঠাকইন গ্রামের ময়না মিয়ার পুত্র চুনু মিয়ার উপর হামলা করে তার তবারকের পক্ষের লোকজন। এ ঘটনায় চুনু মিয়া বাদী হয়ে তবারকসহ ৭ জনকে অভিযুক্ত করে হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগে মামলা (নং ১১, তাং ১৮.১০.১৯ইং) দায়ের করেন।

এতকিছুর পরও দেদারছে মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছিল তবারক-সাবিনা। কিন্তু, গত ৫ ফেব্রুয়ারী রাত দেড়টার দিকে সিলেট থেকে ঢাকাগামী হানিফ পরিবহনের একটি বাস থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এসআই আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে হবিগঞ্জ ডিবি পুলিশের একটি দল ১ কোটি ৮১ লাখ টাকা মূল্যের ৬১ হাজার পিস ইয়াবাসহ ‘নাহিদা বেগম ও শাহিনা খাতুন’ নামের দুজন নারী মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে। ওই দু’জন ছিলেন তবারক-সাবিনার সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান সদস্য।

আর গ্রেপ্তারের পর ডিবি পুলিশের হাতে জিজ্ঞাসাবাদে নাহিদা-শাহিনা হবিগঞ্জ ডিবি পুলিশকে জানায়, তবারক ও তার স্ত্রী সাবিনার হয়ে তারা কাজ করে আসছে। আর তবারক-সাবিনা তাদেরকে (নাহিদা-সাবিনা) দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা বহন/বিক্রয় করে আসছেন। এ ঘটনায় হবিগঞ্জ ডিবি পুলিশের এসআই আবুল কালাম আজাদ বাদী হয়ে গ্রেপ্তার হওয়া আসামীসহ তবারক ও সাবিনাকে অভিযুক্ত করে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ৬ (তাং ৬.০২.২০ইং)। ওই রাতেই হবিগঞ্জ ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় ইয়াবা সম্রাজ্ঞী সাবিনা। ফের আলোচনা চলে আসে তবারক।

এ বিষয়ে বিশ্বনাথ থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) শামীম মুসা বলেন, ‘শুধু তবারক কেন? মাদক ব্যবসায় সাথে যেই জড়িত থাকবে, তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।’

শেয়ার করুন