ওসমানী : সৎসাহসী বঙ্গবীর

মোহাম্মদ আব্দুল হক

বাংলাদেশ পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজয় ছিনিয়ে আনার ইতিহাসে আছে অনেক অনেক বীরের বীরত্ব কাহিনী। বঙ্গবীর জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী এমন একটি নাম যাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চা করলে ইতিহাসের খন্ডিত অংশই চর্চিত হবে। বরং বঙ্গবীর জেনারেল এম.এ.জি ওসমানীকে সামনে রেখেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশকে জানতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আমাদের এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা বঙ্গবীর ওসমানী সম্পর্কে নামটি ছাড়া আর কিছু জানেনা। বিশেষ করে সিলেট বিভাগের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বঙ্গবীর সম্পর্কে না জানা মানে সিলেটের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অন্ধকারে থাকার সামিল মনে করি। আমাদের এই বাংলাদেশ এক সময় পাকিস্তানী শোষক শ্রেণির শৃঙ্খলে বাঁধা ছিলো। দীর্ঘ প্রায় পঁচিশ বছর নির্যাতন সয়ে ১৯৭১ সালের কঠিন সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলার বীরেরা দেশকে স্বাধীন করেছিলেন। আমরা ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে এবং প্রায় ২ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম হারিয়ে পেয়েছি গৌরবের স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা মনে হলেই আমাদের সিলেটের গর্ব, বাংলার অহংকার, সাহসী পুরুষ, সৎ এক বীর সৈনিক বঙ্গবীর ওসমানী নামটি সামনের সারিতে চলে আসে।

বঙ্গবীর ওসমানী নামটি উচ্চারণের সাথে সাথে যে চেহারাটি চোখের সামনে ফুটে উঠে সাহসী সেই বীরের পুরো নাম ‘আতাউল গনি ওসমানী’। তিনি বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর জেনারেল পদ লাভ করেছিলেন। তাই দেশ বিদেশে তিনি জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী অথবা বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী নামেই পরিচিত। তাঁর পিতার নাম খান বাহাদুর মফিজুর রহমান। যিনি হজ্ব পালন করতে গিয়ে পবিত্র মক্কা নগরীতে আরাফাতের ময়দানে চিরদিনের মতো দেহত্যাগ করেছেন। ইতিহাসের খাতিরে এখানে আমাদের বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীদের জেনে রাখা দরকার যে, হযরত শাহজালাল (র:) এর সঙ্গে যে তিনশত ষাট জন আউলিয়া আমাদের সিলেট অঞ্চলে রাজা গৌড় গোবিন্দ সিংহের রাজত্বকালে ১৩০৩ সালে সিলেটে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হযরত শাহ নিজাম উদ্দিন ওসমানী। ইয়েমেন থেকে আসা ঐ সাহাবী ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর জেনারেল এম.এ.জি ওসমানীর পূর্বপুরুষ। ইতিহাস বলে ১৩০৩ সালে হজরত শাহজালাল (রহ:) এর নিকট রাজা গোবিন্দ পরাজয় বরণ করলে পরেই তৎকালীন গৌড় রাজ্য মুসলমানদের দখলে আসে।

আমাদের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানীর বাড়ি ছিলো সিলেট জেলাধীন বালাগঞ্জ উপজেলার দয়ামীর গ্রামে। এক সম্ভ্রান্ত ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া ওসমানী নিজেও ছিলেন যেকোনো অবিচার, অন্যায় এবং অসুন্দরের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ। তাঁর বড় গুণ ছিলো তিনি ছিলেন মনে প্রাণে একজন খাঁটি বাঙালি। এই যে এতো বড় মাপের একজন মানুষের কথা বলছি তিনি কিন্তু হঠাৎ করেই জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী হয়ে যাননি। তিনি ১৯৩৯ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীর ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেছিলেন। তারপর ১৯৪০ সালে ইন্ডিয়ান মিলিটারী একাডেমি থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কমিশন প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন সেনাবাহিনীর বিভিন্ন দায়িত্ব সততার এবং নিষ্ঠার সাথে পালন করেছিলেন। তাঁর সুদীর্ঘ সৈনিক জীবনে তিনি যুদ্ধ কৌশল ও শৃঙ্খলার নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে হয়েছিলেন দক্ষ সৈনিক। অনেক পরে ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এখানেই শেষ নয় বরং তাঁর পরিচয় পাওয়া যায় দিনে দিনে।

বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী ছিলেন সমাজ সচেতন এবং রাজনীতি সচেতন একজন মানুষ। চাকরী জীবন শেষে ১৯৭০ সালেই তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। তখনও বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। আমাদের এ অঞ্চল ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির শৃঙ্খলে পরাধীন। জেনারেল ওসমানী ঐ বছরেই অর্থাৎ ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বিশ্বনাথ-এই চার থানা নিয়ে গঠিত তৎকালীন নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয় লাভ করেন। তারপর নানা ঘটনা প্রবাহে পাকিস্তানি শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাস। এখানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে জেনারেল ওসমানীর জীবন ঘনিষ্ট কিছুটা তুলে ধরার জন্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্বাপর ঘটনা সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করছি। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ১৯৭১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই ওসমানীকে মন্ত্রীর সমমর্যাদাসহ বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীসহ মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ নিযুক্ত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এ অঞ্চলকে মোট ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল সুশৃঙ্খলভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্যে। তখন প্রতিটি সেক্টরের কমান্ডারদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে সঠিক দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানী। আমাদের এ জাতির প্রেরণার উৎস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানি কারাগারে বন্দি। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ওসমানী কঠোর পরিশ্রম এবং সাহসিকতার সাথে নিয়মিত বাহিনী গড়েন এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। দেশ স্বাধীন হলে পরে ১৯৭২ সালের ৭ই এপ্রিল তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি বাংলাদেশ সরকারের কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তারপরও বীরের পথচলা থেমে থাকেনি। তিনি ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান এর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনের এই বীর সৈনিক, রাজনীতিক ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। এই বীর মানুষটির নামে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নামকরণ হয়েছে। সিলেট শহরের নাইওরপুল এলাকায় আছে ওসমানী জাদুঘর। প্রত্যেক সচেতন বাঙালি নিজ নিজ সন্তানদের নিয়ে অবসরে ঘুরে আসলে আরো বেশি বেশি জানা হবে বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী সম্পর্কে। এখানে উল্লেখ্য যে, জেনারেল ওসমানীর পিতা যখন সুনামগঞ্জ মহকুমায় (বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলা) কর্মকর্তা তখন ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন আমাদের বঙ্গবীর ওসমানী। মৃত্যুর পর এই মহান মানুষটিকে সমাহিত করা হয় হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজারের পাশে। তিনি বীর, সৎ এবং সাহসী। তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে, বাংলার মানুষের অকুতোভয় সংগ্রামী চেতনায়। তিনি থাকবেন সত্য ইতিহাসে। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন। আমাদের বর্তমান ছাত্র সমাজের নৈতিক ও চারিত্রিক দৃঢ়তা বৃদ্ধির জন্য বঙ্গবীর ওসমানীর জীবনী পাঠ বেশি জরুরি বলে মনে করি।

লেখক : কলামিস্ট।

উৎস: সিলেটের ডাক

শেয়ার করুন