“পরিবারের সদস্যরা তাড়িয়ে দিয়েছিল, আজ তারাই গর্ব করে”

বৃহন্নলা সুমির সাফল্যগাঁথার গল্প

সিলেটের সকাল রিপোর্ট :: ইচ্ছাশক্তি আর মনোবল থেকেই আজ স্বাবলম্বি হয়েছেন তারা। তারা বলছেন, বৃহন্নলারাও মানুষ। তারাও সমাজের মূলস্রোতের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে চান। এজন্য প্রয়োজন মানুষের মনমানসিকতার পরিবর্তন এবং সহযোগিতার।

হিজড়াদের সাফল্যগাঁথা এবং তাদেরকে নতুন দুটি রিক্সা ভ্যান প্রদান উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জেলা ক্রীড়া সংস্থার কনফারেন্স হলে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।

মতবিনিয়মে উপস্থিত হয়ে নিজেদের বদলে যাওয়ার গল্প শুনালেন বৃহন্নলারা। এদেরই একজনের নাম সুমি। তার বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজারে। তৃতীয় লিঙ্গের হওয়ার কারণে হতে হয়েছিল বাড়িছাড়া। পরিবারের সদস্যরাই জোর করেই তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। তারা বলতো, তার কারণে পরিবারের মানসম্মান ডুবছে; বিয়ে হবে না অন্য মেয়েদের। এ কারণে জন্মভিটায় দরজা বন্ধ হয়ে গেছিল তার। এই সুমিই এখন পরিবারের মধ্যমণি। তাকে নিয়ে তার পরিবার গর্বও করে।

একটি ফুটকার্ট (খাবার ভ্যান) তার জীবনের গতি বদলে দিয়েছে। দিনে তার দোকানে বিক্রি হয় ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা। সাধারণ মানুষকে হয়রানি কিংবা জিম্মি করে নয়; বরং তাদের ভালোবাসায়ই তিনি এ টাকা রোজগার করছেন। তার ফুডকার্টে কাজ দিয়েছেন আরও ছয়জনকে। পরিবারও তাকে টেনে নিয়েছে আপন করে।

সুমি বললেন, ‘গত বছরের নভেম্বরে তাকে বিশেষায়িত ভ্যানগাড়ীটি প্রদান করা হয়। আর এটি প্রদান করেন পুলিশ সুপার হিসাবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার(অর্থ ও হিসাব) জাবেদুর রহমান। তিনি বিয়ানীবাজার উপজেলার কলেজ রোডে ভ্যানগাড়ি নিয়ে বসেন। এরপর থেকেই তার বদলে যাওয়ার দিন শুরু হয়।’

তিনি জানালেন, ‘প্রথম দিকে বাজারের কমিটি তাকে বসতে নিষেধ করেছিল। এছাড়া স্থানীয় বখাটেরা নানাভাবে কটুক্তিও করত। পাশাপাশি চাঁদাও দাবি করত। বাধার সম্মুখিনও হতে হয়েছিল। পরে জাবেদ স্যারের কারণে বিয়ানীবাজার থানা পুলিশের সহযোগিতা পান তিনি। কিছুদিন যাওয়ার পর তিনিই সবার মধ্যমণি হয়ে যান। তার দোকানের খাবারের স্বাদ নিতে এখন লম্বা লাইন পড়ে। প্রতিদিন তিনি ১৪-১৫ হাজার টাকার খাবার বিক্রি করেন।’

তার দোকানে চানা (ছোলা), পিঁয়াজু, খিচুড়ি, আখনি, ভাঁপা পিঠা, চিতই পিঠা বিক্রি হয়। আর স্পেশাল আইটেম হিসেবে ৭৫ প্রকারের ভর্তা বিক্রি করেন তিনি। ক্রেতাদের চাপ সামাল দিতে তার আরও দুই ভাইসহ মোট ছয়জনকে কাজে রেখেছেন তিনি।

সুমি বললেন, বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার পর তিনি ভারতেও গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই ভর্তা তৈরির রেসিপি রপ্ত করেন। আর এই ফুটকার্টটি পাওয়ার পর তিনি সেই রপ্ত করা জ্ঞানের প্রয়োগ করেছেন।

তিনি বললেন, ‘জাবেদ স্যার না হলে আমরা আলোরপথ দেখতাম না। তিনিই আমাদের মতো হিজড়াদের খারাপ পথ থেকে তুলে এনে ভালো পথ দেখিয়েছেন। এখন আমরা নিজেরাই স্বাবলম্বী। আমি খুব খুশি, আমার পরিবারও আমাকে আপন করে নিয়েছে; তারা এখন আমাকে নিয়ে গর্বও করে। আমিও স্যারের মতো অবহেলিত মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।’

সুমির মতো আরও একজন বৃহন্নলার নাম আকাশ। তিনিও পেয়েছেন ফুটকার্ড। তিনি বললেন, ‘আগে মানুষদের বিভিন্ন ভাবে বিরক্ত করে তোলা (চাঁদা) আদায় করতাম। কেউ না দিলে মারধরও করেছি। চলাফেরাও ছিলাম উগ্র। তবে এখন অপরাধ ছেড়ে ভালো পথে ফিরেছি। জাবেদ স্যারের দেয়া গাড়ি নিয়ে নগরীর মদীনা মার্কেটে বসেছি। সেখানে  চটপটি ফুচকা বিক্রি করে প্রতিদিন তিন-চার হাজার টাকা আয় করেন।’

তিনি বলেন, আগে মানুষের অবহেলার পাত্র ছিলাম আমরা। কোন কর্মসংস্থান ছিল না। এখন আমি নিজেই ব্যবসা করি। আমার সাথে আরও দুই জনের কর্মসংস্থান হয়েছে সেখানে। আমরা ভালোই আছি।

আর কদমতলী এলাকায় ফুডকার্ট নিয়ে বসা বৃহন্নলা কালীবিউটি বললেন, তিনিও ফাস্টফুড বিক্রি করেন। কিছু মানুষ ঘৃণা করলেও সবসময় ক্রেতাদের ভীড় লেগে থাকে তার দোকানে। তিনি ২-৩ হাজার টাকা বিক্রি করতে পারেন প্রতিদিন।

শুধু সুমি, আকাশ কিংবা কালীবিউটিই নয়; সিলেটের ত্রিশেরও অধিক বৃহন্নলাকে মূল ¯্রােতে ফিরিয়ে আনতে ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ নেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্মকর্তা জাবেদুর রহমান। তিনি ২০১৫ সালে এসএমপি’র ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে গিয়ে বৃহন্নলাদের সম্পর্কে কাজ করতে আগ্রহী হন। প্রায় বছর দিন তিনি বাছাইকৃত বৃহন্নলাদের কাউন্সিলিংয়ে রাখেন। পরে গত বছরের নভেম্বর তার বন্ধুদের সহযোগিতায় ৮টি বিশেষায়িত ফুড ভ্যান তুলে দেন ২৪ জন বৃহন্নলার হাতে।

আর এজন্য তার স্বউদ্যোগেই হিজড়া জনকল্যাণ সংস্থা সিলেট নামে একটি সংগঠনেরও জন্ম দেন। যা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধনও পেয়েছে। বিশেষায়িত ফুডভ্যান থেকে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে সংস্থায় জমা রাখা হয়। এজন্য সংস্থার পক্ষ থেকে একজন মাস্টার্স পাস একাউন্টস অফিসারও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আর এ সংস্থার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও বৃহন্নলাদের হাতেই রয়েছে।

সংস্থার তহবিলে জমাকৃত অর্থ থেকে বৃহস্পতিবার আরও চারজন বৃহন্নলাকে দুটি ফুডকার্ট তুলে দেয়া হয়েছে। ভ্যান পেয়ে খুশি বৃহন্নলারা বলছেন, ‘আমাদের নিজেদের টাকায় নিজেরাই গাড়ি কিনতে পেরেছি। এখন ব্যবসার মাধ্যমে হালাল রোজগার করতে পারবো।’

সংস্থার সভাপতি সুক্তা হিজড়া বললেন, ‘জাবেদ স্যারের কারণে আমরা আলোর পথ দেখতে পেয়েছি। এখন আমরা নিজেরাই স্বাবলম্বী। আমাদের কেউ খারাপ বলে না।’ তিনি বলেন, আমরাও মানুষ। কিন্তু আমাদেরকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে, আমাদের মৌলিক অধিকার বঞ্চিত রাখা হয়েছে। জাবেদ স্যার আমাদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে এনেছেন।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার জাবেদুর রহমানের মতে, ‘হিজড়ারাও মানুষ। তারা সমাজে অবহেলিত। তাদের প্রতি প্রায় সকলেরই রয়েছে ‘নাক সিটকানো’ মনোভাব। যার ফলে হিজড়ারা সমাজের মূলধারা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জড়িয়ে পড়ে নানা অপরাধের সঙ্গে। এই বিচ্ছিন্ন হিজড়া সম্প্রদায়কে সমাজের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসতেই তিনি এমন উদ্যোগ নিয়েছেন। এজন্য তিনি সকলের সহযোগিতাও চেয়েছেন।’

জেলা ক্রীড়া সংস্থার কনফারেন্স হলে মতবিনিময়ে পুলিশ সুপার হিসাবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জাবেদুর রহমানের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন এসএমপি’র উপ-কমিশনার (ট্রাফিক) ফয়সল মাহমুদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন-জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মাহি উদ্দিন আহমদ সেলিম, শিল্প উদ্যোক্তা এ কে আতাউল করিম, সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহাব উদ্দিন শিহাব। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে জৈন্তাপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এ কে আজাদ ভূঁইয়া, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর হাবিবুর রহমান এবং সিলেটের সকালের সিনিয়র রিপোর্টার আব্দুল্লাহ আল নোমান উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নে এমন প্রকল্প গ্রহণ করায় পুলিশ কর্মকর্তা জাবেদুর রহমানের প্রশংসা করেন।

অনুষ্ঠানে মাহি উদ্দিন আহমদ সেলিম এবং এ কে আতাউল করিম হিজড়া যুব কল্যাণ সংস্থাকে আরো দুটি করে ফুডকার্ট ভ্যান প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। এর আগেও তারা দুটি করে ভ্যান দিয়েছিলেন।

শেয়ার করুন