বাংলাদেশের ক্যাসিনো ও অপরাধ জগৎ

মামুনুর রশীদ

ধরপাকড় এবং অবশেষে কিছু বিশিষ্টজনের বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা। তার মধ্যে কিছু মানুষ হয়তো ইতিমধ্যেই বিদেশে রয়ে গেছেন অথবা তোড়জোড় শুরু হওয়ায় দ্রুত টিকিট কেটে পার হয়ে গেছেন। এসব রাঘববোয়ালকে গ্রেফতার করার পরও জনমনে নানা সংশয়, নানা অবিশ্বাস। সেই যে মোগল, ব্রিটিশ, পাকিস্তান আমল থেকে শাসকদের ওপর অবিশ্বাস- এই প্রবণতা স্বাধীন বাংলাদেশেও যাচ্ছে না। সংশয়, অবিশ্বাস এসব যেন আমাদের রক্তের মধ্যেই রয়ে গেছে। আর এক শ্রেণির নাগরিক তো ঠোঁট উল্টে বলেই ফেলবেন, ‘কত দেখলাম’! এর কারণও আছে। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। এত কিছু গোপনে গোপনে ঘটল অথচ পুলিশ, গোয়েন্দা বাহিনী কেউ কিছুই জানল না! জনগণও জানল না ঢাকা শহরে ক্যাসিনো আছে। ক্যাসিনোর জন্য বাংলাদেশের সচ্ছল মানুষেরা নেপাল যায়, থাইল্যান্ড যায়, সিঙ্গাপুর যায়, মালয়েশিয়া যায়।

জানা যায়, এক রাতে বাংলাদেশের জুয়াড়িরা কোটি কোটি টাকার জুয়া খেলে এবং সেখানকার ক্যাসিনোতে বাংলাদেশের জুয়াড়িদের ভিআইপি স্ট্যাটাস। এত কিছু এ দেশেই আছে জানলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হতো। ক্যাসিনো খোদ আমেরিকার লাসভেগাস, আটলান্টিক সিটিতেও আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পও ক্যাসিনোর মালিক। সব ক্যাসিনোই অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত, এ কথা বলা যাবে না। তবে ফিলিপাইনের যে ক্যাসিনো বাংলাদেশ ব্যাংকের এত কোটি টাকা হজম করতে পারে, তাও তো দেখেছি। কিন্তু বাংলাদেশের ক্যাসিনো একেবারেই অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে প্রথম থেকেই। প্রথমত, ক্যাসিনোর বৈধ লাইসেন্স নেই, বারের অনুমোদন নেই, নেই জুয়া ও নাইট ক্লাবের অনুমোদন। কিন্তু এগুলো দিব্যি চলছে বিভিন্ন ধরনের ক্লাবের ছদ্মাবরণে। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে, কিছু স্পোর্টিং ক্লাব এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এই ক্লাবগুলোতে হাউজি খেলা হতো, তাস পর্যন্ত খেলা হতো। কিন্তু তার সঙ্গে মাদক ও নারীরা যে জড়িয়ে পড়েছে, তা জানা ছিল না। আর এসব ক্লাবের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। এই নেতৃত্বের চেহারাটাও অন্যরকম। কেউ কেউ অন্য দলের সঙ্গে একদা যুক্ত থাকলেও এখন সবাই সরকারি দল। ঢাকাইয়া কিছু রাজনৈতিক নেতৃত্ব একসময় বলত, ‘পাট্টি তো একটাই। সরকার পাট্টি। সরকার পাট্টিই করি আমরা, আমাগো দোষ কি কন?’ ঢাকার আদি বাসিন্দাদের এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বহুদিনের। কিন্তু এখন তা অনেক বড় আকার ধারণ করেছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশাল অঙ্কের টাকা।

এত ধরনের মদ, এত ধরনের জুয়ার মেশিন এ দেশে আছে? এগুলো আমদানির জন্য কোনো লাইসেন্স লাগেনি? কোন প্রবেশপথে এগুলোর আনাগোনা? এত বান্ডিল বান্ডিল নোট একসঙ্গে দেখার সৌভাগ্য আমার মতো অনেকেরই নেই। টাকা উড়ছে, উড়ছে এসব জায়গায়। যারা এসব টাকা ধরতে পারছে, তারাই হয়ে পড়ছে বিশাল বিশাল সম্পত্তি ও ক্ষমতার মালিক। বই-পুস্তকে না বললেও স্বপ্ন-দৃশ্য ছাড়া কোথাও এত টাকার কথা লেখা হয় না। তবে গোয়েন্দা উপন্যাসে হীরা, মণিমুক্তা ও বিপুল টাকার কথা উল্লেখ করা হয়। কী নিশ্চিন্তে বান্ডিল বান্ডিল টাকা গুণে হস্তান্তর করছেন, এ দৃশ্য এ জনমে প্রথম দেখতে পেলাম আমরা। এখন ভাবা যাক ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার কথা। ব্যাংক থেকে টাকা উঠানো আর জমা দেওয়ার কিছু নিয়ম-কানুন আছে। একটা অঙ্কের টাকার ওপরে টাকা তুলতেও সাধারণ মানুষের নানা ঝক্কি-ঝামেলা, জমা দেওয়ার ব্যাপারেও তাই। এখন তো অ্যাকাউন্টের মালিক ছাড়া কেউ বিয়ারার চেক ওঠাতে গেলেই জাতীয় পরিচয়পত্র, ফোন নম্বর এসব লাগে, সে যত কম অঙ্কের টাকাই হোক না কেন। অথচ শত শত কোটি টাকার এফডিআর করা হলো; কিন্তু তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো না। অবশ্য সরকার প্রতি বছরই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে থাকে। সেই সুযোগ এসব ক্ষমতাবান নিয়েছেন কি-না, জানি না। সারাদেশেই এখন কোটি টাকার গাড়ির দাপট। ১৫০০ সিসি বা তার নিচের গাড়িগুলো এখন করুণার পাত্র। সরকারি আমলা, মন্ত্রী, এসপি, সাবেক এমপি, জেলা প্রশাসন কর্মকর্তা, উপজেলা কর্মকর্তা সবার এখন দামি গাড়ি। ব্যবসায়ীদের তো কথাই নেই। একেকজনের চারটি-পাঁচটি করে গাড়ি। গাড়ি একটা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে পড়েছে। যতটা প্রয়োজনীয় তার চেয়ে বেশি লোক দেখানো। মধ্যবিত্তদের সংস্কৃতি নিয়ে লেখার সময় ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছিলেন, মধ্যবিত্ত ঘড়ি কেনে সময় দেখার জন্য নয়, অন্যের নেই বলে। তাই গাড়ি অনেক দিন ধরেই এই কাজটি করে আসছে। এসব গাড়ির তেল-গ্যাসের জোগান দিতে গিয়ে সরকারকে যে কোটি কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, তা ভাবার কোনো অবকাশ নেই। দেশে গণপরিবহনের ব্যবস্থা না থাকায় একজন নিম্নমধ্যবিত্তকেও গাড়ি কিনতে হচ্ছে। গাড়ি কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। কারণ ব্যাংক টাকা নিয়ে প্রস্তুত।

ব্যাংকের মুনাফা বাড়ানো দরকার, সরকারেরও ট্যাক্স প্রয়োজন। যাদের নিয়ে আলোচনা তারাও দামি গাড়ি, দেহরক্ষী ও অস্ত্র নিয়ে চলাচল করতে অভ্যস্ত। তাদের ছেলেমেয়েরা এসব গাড়ি নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে, অন্যের ঈর্ষার পাত্র হয়ে যাচ্ছে। স্কুলগুলোও বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে শিক্ষা বিক্রি করছে। রাজনীতি যেদিন থেকে আদর্শচ্যুত হয়ে পড়েছে, সেদিন থেকেই নতুন এক খেলার শুরু। সেই খেলা হচ্ছে দলবদল। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষমতাসীন দলে ঢোকার ধান্দা শুরু। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকা। জানা গেল, এক রাজনৈতিক নেতা খুবই সৎ, তিনি ঘুষ খান না, অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলেননি। তাকে টলানো মুশকিল। এ কথা শোনার পর ওই স্থ্থূল বুদ্ধির সুযোগ-সন্ধানী ছোট নেতা প্রায় প্রকাশ্যেই বলে উঠল, ‘ঘুষ খায় না, কত খায় না, হাজার, লাখ, কোটি?’ ওই হাজার লাখ কোটির কাছেই বিকিয়ে যায় নীতিবান ওই নেতা বা ক্ষমতাবান আমলা। আর টাকা আসে সেখান থেকেই। নব্বইয়ের দশকের পর থেকেই বাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের ফলে টাকার বাজারটা খুলে যায় আর জ্ঞানের বাজারটা সংকুচিত হয়ে পড়ে। যতই জ্ঞানের বাজার সংকুচিত হয়, ততই আদর্শে চির ধরে। তার একটা প্রকাশ্য চেহারা ধরা পড়ে দোকানে। বাংলাদেশের বড় শহর, ছোট শহর ছাড়িয়ে গ্রামবাংলা একটা ছোট-বড় দোকানে পরিণত হয়েছে।

এ দেশে সৎ ও নির্ধারিত অর্থে যারা কষ্ট করে জীবনযাপন করছে, তারা চিহ্নিত হচ্ছে ব্যর্থ আর অপদার্থ মানুষ হিসেবে। বিজয়ের জয়টীকা পরছে ওই অর্থ উপার্জনের কপালে। বাংলাদেশের জন্মের প্রথম দিকে বিষয়গুলো অন্যরকম থাকলেও আশির দশক থেকেই এই অপসংস্কৃতি চালু হলো। সেই থেকে উত্থান এসব ফাঁকফোকরের অর্থনীতি। জুয়ার একটা দানের মতো। কেল্লাফতে করতে পারলেই আর কোনো পরোয়া নেই। আর এই দানটা জোটে যায় রাজনীতির ছত্রছায়ায়। ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ে প্রতিনিয়তই কথা হচ্ছে। টেন্ডারবাজি রুখতে গিয়ে এখন ই-টেন্ডার চালু হয়েছে, যাতে সশরীরে ঠিকাদারদের উপস্থিত হতে না হয়। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। একবার এক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার ভগ্নদশা দেখে ওই অঞ্চলের জনপথ প্রকৌশলীকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, সরকারের অর্থ বরাদ্দ আছে, টেন্ডার হয়েছে। কিন্তু যারা কাজ পেয়েছেন, তাদের দিয়ে কাজ করাতে আমরা অক্ষম। তারা কারা? এ প্রশ্নের উত্তর আমরা সবাই জানি। ঢাকার পুলিশ প্রশাসন এবার কিছু আন্ডারওয়ার্ল্ডকে সামনে এনেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও অনেক জোর দিয়ে কথাগুলো বলেছেন। কিন্তু অনিয়মের সব ব্যবস্থাই একটা সংস্কৃতি হয়ে গেছে। এখান থেকে ফেরার কোনো উপায় আছে কি? যদিও জানি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনেক দুর্নীতিই স্বাভাবিক; কিন্তু জবাবদিহির ব্যবস্থা আছে বলে জনসমক্ষে তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাতে কতটা ফলাফল হয় তা অবশ্যই প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ জনগণ একদিকে বেশিদিন চোখ রাখে না। আর আমাদের দেশের জনগণের বিস্মৃতির সময়টা খুব স্বল্প। তবুও আশায় বুক বেঁধে থাকি। যদি একটা বিহিত হয়। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা যদি অর্থবহ হয়ে ওঠে।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজ বিশ্নেষক

উৎস: সমকাল

শেয়ার করুন