ছাত্রদলের সভাপতি খোকন, সাধারণ সম্পাদক শ্যামল

কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষভোটে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন সভাপতি হয়েছেন ফজলুর রহমান খোকন এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ইকবাল হোসেন শ্যামল। ফজলুর রহমান খোকন পেয়েছেন ১৮৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণের ভোট ১৭৮। খোকন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। তিনি সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক ছাত্র। ছাত্রদলের গত কমিটিতে গণশিক্ষা বিষয়ক সহসম্পাদক ছিলেন তিনি।

সাধারণ সম্পাদক পদে ইকবাল হোসেন শ্যামল পেয়েছেন ১৩৯ ভোট। তার নিকতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাকিরুল ইসলাম পেয়েছেন ৭৪ ভট। শ্যামল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বাসায় বুধবার রাত ৮টা ৪০ মিনিটে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। রাত একটায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়। রাতভর ভোট গণনা শেষে আজ বৃহস্পতিবার ভোরে এই ফলাফল ঘোষণা দেওয়া হয়।

১৯৯২ সালের পর এটি ছাত্রদলের নেতৃত্ব দীর্ঘদিন পর ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে। ২৭ বছর আগে সর্বশেষ ১৯৯২ সালে ভোটে রুহুল কবির রিজভী সভাপতি ও নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিল।

গতকাল প্রথম ভোটার হিসেবে ১ নং বুথে ভোট দেন বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মাহফুজুল আলম মিঠু। তিনি জানান, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভোট হচ্ছে। যেটা আমরা আশা করছিলাম। ভোটগ্রহণের আগে স্কাইপের সহযোগিতায় বড় প্রজেক্টরের মাধ্যমে কাউন্সিলর ও ভোটগ্রহণ কর্মকার্তাদের উদ্দেশ্যে নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গোপন কক্ষে ব্যালটের মাধ্যমে কাউন্সিলরা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়া শুরু করেন। লন্ডন থেকে স্কাইপে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভোটগ্রহণ তত্ত্বাবধান করেন তারেক রহমান। পাঁচটি বুথে এই ভোটগ্রহণ নেওয়া হয়।

ছাত্রদলের এই কাউন্সিল নিয়ে নানা ঘটনা ঘটেছে। ঈদুল ফিতরের আগে ৩ জুন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করে ৪৫ দিনের মধ্যে কাউন্সিলরদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন কমিটি করার ঘোষণা দেওয়া হয়। সেখানে প্রার্থী হতে শর্ত দেওয়া হয় ছাত্রদলের প্রাথমিক সদস্য হতে হবে, দেশের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র এবং কেবল ২০০০ সাল থেকে পরবর্তী সময়ে যেকোনো বছরে এসএসসি/সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এসব শর্ত নিয়ে ছাত্রদলের বিলুপ্ত কমিটির একটি অংশ ক্ষুব্ধ হন।

এর মধ্যেই ১০ জুন ছাত্রদলের কাউন্সিল করতে সাবেক নেতাদের সমন্বয়ে নির্বাচন পরিচালনা, বাছাই ও আপিল-এ ৩ কমিটি গঠন করা হয়। বিলুপ্ত কমিটির ক্ষুব্ধ নেতারা ১১ জুন অসুস্থ অবস্থায় রুহুল কবির রিজভীকে ভেতরে রেখে নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে বিক্ষোভ করে। টানা কয়েক দিন দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে। এর মধ্যে একদিন রুহুল কবির রিজভীকে কে বা কারা দলীয় কার্যালয়ের সামনে লাঞ্ছিত করে। এই ঘটনায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতাদের মধ্যে ১২ জনকে বহিষ্কার করা হয়। গত ১০ আগস্ট পুনঃতফসিল ঘোষণা করেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটি।

গত ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকার চতুর্থ জজ আদালত সাবেক কমিটির সহ ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আমান উল্লাহর দায়ের করা মামলায় স্থগিতাদেশ দিলে ১৪ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত কাউন্সিলের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। একই সঙ্গে আদালত বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ১০ জনকে কারণ দশানোর নোটিশ দেয়।

এর পর গত মঙ্গলবার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছাত্রদলের কাউন্সিলরদের অনুষ্ঠিত সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, ছাত্রদলের গঠন ও পুনর্গঠনসহ ছাত্রদলকে সুষ্ঠভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে ছাত্রদলের অভিভাবক বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ছাত্রদলের গঠনতন্ত্রের সংশোধন, কাউন্সিল আহ্বান, কাউন্সিল মূলতবী করা, ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্ধারণে নির্বাচন পরিচালনা করাসহ যে কোনো সাংগঠনিক-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব প্রদান করে। এর পরই ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন তারেক রহমান।

গতকাল জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীম আমাদের সময়কে বলেন,‘আদালতের নির্দেশনা মেনে যাদের বিরুদ্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে ছাত্রদলের কাউন্সিল প্রক্রিয়া থেকে তাদের বাইরে রাখা হয়েছে।

কাউন্সিলরদের সূত্রে জানা যায়,ছাত্রদলের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা বিএনপির তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন। পোলিং এজেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদির ভূইয়া জুয়েল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব এবং ছাত্রদলের সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান।

ছাত্রদলের সভাপতি পদে ৯ জন এবং সাধারণ সম্পাদক ১৯ জন। ৫৩৪ জন কাউন্সিলরদের ভোটে ছাত্রদলের নতুন নেতা নির্বাচিত হন। তবে কাউন্সিলে অংশ নিতে আশা বেশ কয়েক কাউন্সিলরসহ গত দুই দিনে ৪০ জনের অধিক ছাত্রদল নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ছাত্রদলের কাউন্সিলকে বাধাগ্রস্ত করতে সরকার নানা ধরণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যাচ্ছে।

এরই অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার ও তার আগের দিন মঙ্গলবার-এই দুই দিনে কমপক্ষে ৪০ জনের অধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে অধিকাংশই কাউন্সিলর। আসলে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না বলেই সরকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাধাগ্রস্ত করছে। এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন রিজভী আহমেদ।

এবারের সভাপতি পদের প্রার্থীরা: কাজী রওনুকুল ইসলাম শ্রাবন, ফজলুর রহমান খোকন, হাফিজুর রহমান, মামুন বিল্লাহ (মামুন খান),সাজিদ হাসান বাবু, মাহমুদুল হাসান বাপ্পি, রিয়াদ মো. তানভীর রেজা রুবেল, এরশাদ খান, মাহমুদুল আলম সরদার।

সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থীরা : শাহনেওয়াজ, জুয়েল হাওলাদার,আমিনুর রহমান আমিন, জাকিরুল ইসলাম জাকির, তানজিল হাসান, কারিমুল হাই নাঈম, মাজেদুল ইসলাম রুমন, ডালিয়া রহমান, শেখ আবু তাহের,সাদিকুর রহমান, কেএম সাখাওয়াত হোসাইন, সিরাজুল ইসলাম, ইকবাল হোসেন শ্যামল, মুন্সি আনিসুর রহমান, মিজানুর রহমান শীরফ, শেখ মো. মসিউর রহমান রনি,মোস্তাফিজুর রহমান, সোহেল রানা ও কাজী মাজহারুল ইসলাম।

আগের দিন গত মঙ্গলবার তারেক রহমানের নির্দেশে সারাদেশের কাউন্সিলর ও প্রার্থীদের নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হতে বলা হয়। সেঅনুযায়ি, গতকাল বিকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সমবেত হয় প্রার্থী ও কাউন্সিলররা। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীদের সঙ্গে আসা কয়েক হাজার কর্মী-সমর্থকরা নয়াপল্টনের অফিসের সামনে দুপুর থেকে অবস্থান নিতে শুরু করে বিকালে অফিসের সামনে সমাবেশে পরিণত হয়।

এর মধ্যে সন্ধ্যায় খবর আসে তারেক রহমান সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, মির্জা আব্বাসের বাসায় কাউন্সিল হবে, সেখানে সবাইকে যাওয়ার জন্য বলা হয়। এই নির্দেশ পাওয়ার পর কাউন্সিলর ও প্রার্থীরা মির্জা আব্বাসের শাজাহানপুরের বাসায় কাউন্সিলর ও প্রার্থীরা ছুটে যান। পরিচয়পত্র দেখে দেখে কাউন্সিলরদের বাসার ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।

শেয়ার করুন