সড়কে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর দায় কে নেবে

আহমদ রফিক

সড়কে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু—যেগুলোকে আমি দুর্ঘটনা বলতে নারাজ (অবশ্য দু-একটি সঠিক অর্থে দুর্ঘটনা), এসব আজকের নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলছে। প্রতিবাদ, মানববন্ধন, একবার শিক্ষার্থীদের রাজপথ অবরোধ আন্দোলন অনেক কিছুই ঘটেছে রাজপথে, সড়কে, মহাসড়কে মানুষের প্রিয়জনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকাতে। কিন্তু এসবে কোনো সুফল মেলেনি। আর এ বিষয় নিয়ে লেখালেখি তো অন্তহীন বলা চলে।

কিন্তু কিছুতেই মালিক-চালকচক্র তথা সিন্ডিকেট ভাঙা যাচ্ছে না। সমাজের দু-চারজন খ্যাতিমান ব্যক্তি বা তাঁদের একান্ত প্রিয়জনও মহাসড়কে বেপরোয়া যানবাহন চালনার শিকার। প্রসঙ্গত মনে করা যায় ইলিয়াস কাঞ্চনের কথা। আমাদের অজান্তে ইতিহাসের পাতায় লেখা হচ্ছে করুণ মর্মস্পর্শী ঘটনার আলেখ্য। তবু সিন্ডিকেটের হৃদয় গলে না, প্রশাসনের হৃদয় স্পর্শ করে না জীবনের ট্র্যাজিক পরিণতি।

আমি নিজেও বহুবার লিখেছি, বিশেষ করে ঈদ যাত্রার দু-একটি মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি উল্লেখ করে। ঢাকা থেকে যাত্রা করে, গ্রামের বাড়িতে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে ঈদ উৎসব উপভোগ করবে বলে যে মানুষটি ঘরে পৌঁছানোর পরিবর্তে অন্তিম যাত্রার শিকার, যার অপেক্ষায় সেই বাড়িতে ঈদ উৎসব চোখের জলে ভেসে গেল, কে এর দায় বহন করবে, কে এর জবাব দেবে? কেউ দেয় না। দেওয়ার দায় কারো নেই। এই হলো আমাদের অমানবিক বাংলাদেশি সমাজ।

‘স্বৈরাচার’ বলে যার কুখ্যাতি, সেই রাষ্ট্রপ্রধানের একবার চেষ্টা ছিল, সড়ক নিরাপদ করতে বেপরোয়া চালনার বিরুদ্ধে চরম শাস্তির ব্যবস্থা করে আইন পাস করতে। কিন্তু তাঁর চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। পূর্বোক্ত সিন্ডিকেট দেখা গেল স্বৈরাচারীর চেয়েও শক্তিমান। হাত গুটিয়ে নিতে হলো তাঁকে। এ ঘটনা অবশ্য অনেক আগেকার। এরপর তরুণদের একাধিক চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। এ রহস্যের চাবিকাঠি কোথায় লুকানো।

দুই.

কে বা কারা এই ভয়ংকর ঘাতকের হাত থেকে আমাদের বাঁচাতে পারবে, পবিত্রতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে? বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে আমাদের সামনে দুটি ‘অপশন’ বা ‘উপায়’ রয়েছে বলে মনে করা যায়। সে পথ হাতড়ানোর আগে আরো কিছু মর্মান্তিক বা সড়ক মৃত্যুর ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরা যাক ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করানোর উদ্দেশ্যে।

এমনিতেই সাধারণ যাত্রায় নিয়মিত সড়কে প্রাণ ঝরছে। সংবাদপত্রগুলো যথানিয়মে সেসব ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন তুলে ধরছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব খবর গায়ে মাখছে না। কিন্তু ঈদ উৎসবের ব্যাপারটাই ভিন্ন। যেসব মানুষ রাজধানীতে পরিবারবিহীন জীবনযাত্রায় কর্মরত, তাদের ঈদ তো বাড়িতে, পরিবারের সঙ্গে—গ্রামে বা দূর-প্রান্তিক ছোটখাটো শহরে।

তাদের তো ঈদে বাড়ি যেতেই হবে। কেউ যদি বলেন—কী দরকার মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি যাওয়ার, সেটা হবে অমানবিক কথা। তাঁরা কি দেখছেন না, প্রতিবছর ঈদ যাত্রায় সব মানুষ বাড়িতে যেতে পারছে না, কিছুসংখ্যকের জন্য সে যাত্রা হচ্ছে সড়কে অন্তিম যাত্রা—দেখছেন, তবু তাঁরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই বাড়িমুখো।

এটা তার নাগরিক অধিকার। অধিকার এই অর্থে, শাসনযন্ত্র বাধ্য সড়কে-মহাসড়কে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রিত করে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিরাপদ সড়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে। কিন্তু সে দায়িত্ব তারা পালন করতে পারছে না। যেমন করছে না যানবাহন তথা বাস-ট্রাকের মালিকরা এবং ড্রাইভার তথা যানবাহনের চালককুল।

পরিবহনব্যবস্থাটা এমনই, মালিক-চালক চুক্তিভিত্তিক কর্মের অন্যায় ব্যবস্থা এমনই যে তাতে মালিক ও চালকের স্বার্থ রক্ষাই বড় বিষয়। বেপরোয়া যানবাহন চালনার ফলে অতিদ্রুত অকুস্থলে পৌঁছানোর তাড়নায় বা প্রতিযোগিতায় রাস্তায় কয়জনের প্রাণ গেল সে হিসাব তাদের ধর্তব্যের মধ্যে নয়।

তা আরো এ কারণে যে চালকের যত বেশি ট্রিপ, তত বেশি অর্থ পকেটে, অর্থ মালিকের লাভের থলিতে। কাজেই এমন লোভনীয় চুক্তি কি ছাড়া যায়? তাতে যায় যাক প্রাণ (কখনো নিজেরও), দ্রুততম গতিতে, বেপরোয়াভাবে বাস-ট্রাক চালাতেই হবে এবং চালানো হচ্ছে। এই মহাসড়ক স্বৈরাচার কিছুতেই বন্ধ হওয়ার নয়। মৃত্যু মালিক বা চালকের বোধোদয় ঘটাবে না, ঘটাচ্ছে না। অর্থের নেশা বড় ভয়ংকর নেশা।

এ নেশা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মাতাল বেগে আকর্ষণ করে। এ ব্যবস্থা এবং অবস্থাই চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক শুভশক্তি জাগ্রত হচ্ছে না। হতে পারে, এ ক্ষেত্রে শাসকচক্রের স্বার্থ মালিক-চালক সিন্ডিকেটের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত অথবা ওই সিন্ডিকেট ভাঙার শক্তি ও সাহস কোনোটাই শাসনদণ্ডের নেই। এখানে সে নখদন্তহীন বাঘ বা সিংহ।

তিন.

তাই মহাসড়কে নিয়মিত প্রাণ ঝরছে। ঝরছে অধিকহারে ঈদ যাত্রায়। কারণ এ সময়টাতে লোভের-লাভের জোয়ারিটান অনেক প্রবল। তাই কারো কারো জন্য ঈদ যাত্রা হয়ে ওঠে মরণযাত্রা, এ ভবিষ্যৎ তার জানা থকে না। এ বছরের সাম্প্রতিক ঈদেও (ঈদুল আজহা) এমন মর্মান্তিক চিত্র তৈরি হয়েছে, যার শব্দচিত্র পরিবেশিত হয়েছে সংবাদপত্রে।

একটি সংবাদ শিরোনাম মোটা হরফে : ‘ভয়ংকর ঈদ যাত্রা’। ছোট হরফে তাৎপর্যপূর্ণ পরিসংখ্যান ‘সড়ক দুর্ঘটনা’। ‘১০ দিনে মোট মৃত্যু ২২৪/ঈদের আগের ৫ দিনে ৮১/পরের ৫ দিনে ১৪৩’। এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : ‘সড়ক-মহাসড়ক নিরাপদ রাখতে সরকারের যেসব সিদ্ধান্ত ছিল, তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবারের ঈদ যাত্রা ছিল ভয়ংকর।’ এ পর্যায়ে আমাদের চিন্তা এ ক্ষেত্রে মৃত্যুর দায়গুলো কার? কে জবাবদিহি করবে এই অবাঞ্ছিত, অন্যায় মৃত্যুর?

আরো একটি মর্মান্তিক ঘটনার খবর : ‘বেপরোয়া বাসে মুহূর্তেই/শেষ একটি পরিবার’। একেও বলা হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। ‘বেপরোয়া’ভাবে বাস চালিয়ে গোটা পরিবারকে পিষে মারা কি দুর্ঘটনা? না, অন্যায়-অপরাধী তৎপরতা? এটা কি আইনের চোখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়? সাতটি হত্যার শাস্তি কী হতে পারে তা যুক্তিসংগতভাবেই বলতে পারবেন আইনজীবী, আইনজ্ঞ এবং বিচারপতিরা। হয়তো বলতে পারবেন সরকারপক্ষীয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আমরা সাধারণ জ্ঞানে জানি, একটি সুস্পষ্ট হত্যার শাস্তি ঘাতকের মৃত্যুদণ্ডই। এ পর্যন্ত এত হত্যাকাণ্ডের একটিতেও কি তেমন কিছু ঘটেছে? আর এ সাত হত্যার শাস্তি কি আদৌ পাবে পরিবারের একমাত্র জীবিত ছোট ছেলে রিফাত? এ করুণ ঘটনাটির সংবাদ পরিবেশনে অন্যত্র শিরোনাম : ‘পরিবারে রইল শুধু ছোট্ট রিফাত’। আমাদের আরো প্রশ্ন : পরিবারের সবাইকে হারানো এতিম ছোট্ট রিফাতকে কে দেখবে? তার জীবনযাপনের দায় কে নেবে? ওই চালক না মালিক, না সরকার? এ প্রশ্নের জবাবও আমরা চাই ওই তিন পক্ষের কাছ থেকে।

এ রকম বহু ঘটনা এবারের ঈদ যাত্রাকে রক্তাক্ত ও মর্মান্তিক করে তুলেছে। এরই মধ্যে ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের’ জরিপে প্রকাশ, এবারের ‘ঈদ যাত্রায় সড়কে ঝরল ১৯৭ প্রাণ’। এতগুলো পরিবারে ঈদ উৎসব কান্নায় রূপান্তরিত হয়েছে। ওই সংবাদ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, গত ৬ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ১২ দিনে সারা দেশে সড়ক, নৌ ও রেলপথে দুর্ঘটনায় মোট ২২৩ জন নিহত ও ৬৭০ জন আহত হয়।

এতগুলো মৃত্যুর দায় কে নেবে? আমরা জানি না, এ বিষয়ে আইন কী বলে? সংবিধান কি কিছু বলে? কী বলেন আন্তর্জাতিক মহলের অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা? এর আগে আমরা উল্লেখ করেছিলাম পরিত্রাণের বা বিচারের দুই উেসর কথা। আমরা লক্ষ করেছি, কিছু মর্মান্তিক ঘটনায় দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে থাকেন।

এত বছর ধরে এই যে অন্যায়, অপরাধমূলক মৃত্যুগুলো ঘটছে, ঘটে চলেছে, এর প্রতিকার ও প্রতিরোধে এবং সর্বোপরি ন্যায়বিচারে, সুবিচারে যথাযথ ব্যবস্থা, প্রয়োজন আইন প্রণয়নে প্রধানমন্ত্রী কি একই প্রেরণায় এগিয়ে আসতে পারেন না, হাতে তুলে নিতে পারেন না ন্যায় ব্যবস্থাপনার দণ্ড, যে দণ্ড সিন্ডিকেট ভাঙতে সক্ষম?

দ্বিতীয়ত, উচ্চ আদালত। স্বতঃপ্রবৃত্ত তৎপরতায় তাঁদের বহু অসহায়ের, নির্যাতিতের পাশে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে। নদীদখল থেকে ঐতিহ্য রক্ষায় আমরা তাঁদের সদর্থক ভূমিকা এর আগে একাধিক ক্ষেত্রে দেখেছি। ‘নিরাপদ সড়ক’ রক্ষায় অকারণ, শোকাবহ মৃত্যু (যা আসলে হত্যাকাণ্ড) বন্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁরা কি এগিয়ে আসতে পারেন না? বন্ধ করতে পারেন না অসহায় বহু পরিবারের কান্না? দুটি সূত্রেই আমি তাঁদের সদিচ্ছার প্রকাশ দেখার অপেক্ষায় আছি।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

উৎস: কালের কণ্ঠ

শেয়ার করুন