বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনিক দূরদর্শিতা

মুসা সাদিক

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রশাসনিক দূরদর্শিতা ছিল অসাধারণ। ‘৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মহান বিজয় অর্জনের পরেও বাংলাদেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর চরণ স্পর্শ না করা পর্যন্ত ইউরোপ-আমেরিকাসহ আরব বিশ্বের দেশগুলো প্রচারণা চালাচ্ছিল যে, বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতের সেনাবাহিনী কখনও কেউ প্রত্যাহার করতে সমর্থ হবে না। এমনকি এশিয়ার দেশগুলোতেও অনুরূপ বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন তার মন্ত্রিসভা ও এমপিদের এ বিষয়ে কোনো আশ্বাসও দিতে পারেননি। আমার মামা, প্রবাসী সরকারের চিফ সেক্রেটারি রুহুল কুদ্দুস সাহেবকে ১৬ ডিসেম্বরের পরপরই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে মিত্রবাহিনীকে তিনি ভারতে ফেরত পাঠাবেন। এটা বঙ্গবন্ধুই করবেন।

অন্যদিকে ইউরোপের পত্রপত্রিকা ও টিভি-রেডিওতে প্রতিনিয়ত আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছিল যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় থেকে বিজয়ী মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা জার্মানি, ইতালি, জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘাঁটি করে আজও তাদের ভূমি দখল করে অবস্থান করছে। সেখানে শক্তিহীন, ক্ষুদ্র বাংলাদেশ কীভাবে ভারতীয় বিজয়ী বাহিনীকে ফেরত পাঠাতে সমর্থ হবে?

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ক্যারিশমা অবলোকন করতে বিশ্ববাসীকে তখনও অপেক্ষা করতে হয়েছে। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে লন্ডনে বিমানবন্দরে পৌঁছে তিনি লন্ডনস্থ ভারতীয় দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জি, যিনি ১৯৬০-এর দশকে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসে পলিটিক্যাল কাউন্সিলর পদে কর্মরত ছিলেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। ভারতীয় দূতাবাসের এই শশাঙ্ক শেখর, ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও বঙ্গবন্ধু- এই ত্রয়ীর মধ্যে গোপন বৈঠকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার আরম্ভিক আলোচনা হয়। সেই সূত্রে তিনি বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রারম্ভে বলে দেন যে, শশাঙ্ক যেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর পক্ষ থেকে দিল্লিতে আগাম বার্তা দিয়ে দেন- তিনি দিল্লিতে পৌঁছলে ইন্দিরা গান্ধী যেন ৩ মাসের মধ্যে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের মার্চ মাসের মধ্যে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সব সৈন্যকে বাংলাদেশের মাটি থেকে প্রত্যাহার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবে সম্মতি দেন। বঙ্গবন্ধু দিল্লি পৌঁছার বহু আগেই শ্রী শশাঙ্ক বঙ্গবন্ধুর বার্তা দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীকে সাইফার মেসেজের মাধ্যমে পৌঁছে দেন।

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ বাংলাদেশে পৌঁছেই বঙ্গবন্ধু লক্ষ্য করেন, পাকিস্তান বাহিনী পরাজয় নিশ্চিত জেনে এ দেশে পোড়ামাটি নীতি বাস্তবায়ন করে। ফলে বাংলাদেশকে তারা ছাইভস্মের দেশ করে রেখে যায়। ব্যাংকের নোট সব পুড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদদের হত্যা করে যায়। বাংলাদেশ হয়ে পড়ে একটি পঙ্গু দেশ ও পঙ্গু জাতি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সবকিছু গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। সেই অজানা ভবিষ্যৎ ও দুর্যোগঘন অন্ধকারে বাঙালি জাতির সম্মুখে ছিল মহান আল্লাহর থেকে শুধু একটি আশার আলো ‘শেখ মুজিব’; বাঙালি জাতির মুক্তিদূত। এ জাতির অমর প্রাণ, সূর্যের নামে নাম, শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর নামের পরশে বাঙালি জাতি প্রাণ ফিরে পেল। ছাইভস্মের মধ্য থেকে সবুজ বাংলাদেশ জেগে উঠল।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে যত কিছুই গোপন করা হোক না কেন, সারাদেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর কানে সব খবর পৌঁছে যেত। তিনি গোপন সূত্রে একদিন খবর পেলেন, তাঁর শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলীর একান্ত সচিব আমিনুল হক ইপিসিএস দুই মাসের শিক্ষা সফরে আমেরিকা গেছেন অন্য একজনের স্ত্রীকে অবৈধভাবে নিজের স্ত্রী হিসেবে সঙ্গী করে। কাইয়ুম সাহেবের স্ত্রী মিসেস কাইয়ুমকে কোনো পুলিশি তদন্ত ব্যতীত মিসেস আমিনুল হক নামে পাসপোর্ট দেওয়ার জন্য পাসপোর্ট ফরমে জোর সুপারিশ করেন পূর্তমন্ত্রী সোহরাব হোসেন। বঙ্গবন্ধু একদিন সচিবালয়ে এসে সকাল ১১টায় এটা জানামাত্র আমার মামা মুখ্য সচিব রুহুল কুদ্দুস এবং তাঁর ভগ্নিপতি অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ হোসেনকে ডাকেন। তাঁরা দু’জন তাঁর কক্ষে এসে দেখেন, তিনি যন্ত্রণায় ছটফট করছেন ও কাতরাচ্ছেন। মুখে শুধু বলছেন, ‘৩০ লক্ষ শহীদ হলো, কিন্তু বাংলাদেশের ইজ্জত-সম্মান বিদেশের মাটিতে আজ ভেসে গেল।’ বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে তাঁরা এই নগ্ন, অশালীন বিষয়টা জানলেন। বঙ্গবন্ধুর মতো তাঁরাও দুঃখে ভেঙে পড়লেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, মন্ত্রীরা সচিবালয়ে যাঁরা আছেন, তাদের সবাইকে ৫ মিনিটের মধ্যে কেবিনেটের কনফারেন্স হলে আসতে বলো।

২১-২২ জন মন্ত্রী তখন সচিবালয়ে ছিলেন। তাঁরা সবাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। বঙ্গবন্ধু কেবিনেটের সম্মেলন কক্ষে গেলেন কিন্তু কারও দিকে তাকালেন না। নিচের দিকে তাকিয়ে বললেন, কোনো মাইনুটস (সভার বিবরণী) লেখা হবে না। তাঁর ডানদিকে ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে উপবিষ্ট দেখে তাঁর নাম ধরে বললেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী কোথায়?’ মনসুর আলী বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু, উনি আমার ডান পাশে বসে আছেন।’ বঙ্গবন্ধু ঘৃণায় তাঁর নিজের মুখটা বাম দিকে ঘুরিয়ে ফেললেন, যাতে ইউসুফ আলীর মুখ তাঁকে দেখতে না হয়। তিনি গর্জন করে বললেন, ‘তাকে তুমি এক্ষুণি বন্দি কর।’ ইউসুফ আলী কাঁপতে কাঁপতে এবং কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু, আমার অপরাধ সম্পর্কে আমি কিছুই জানতে পারিনি।’

বঙ্গবন্ধু ঘৃণাভরে বাম দিকে তাকিয়ে (যাতে ইউসুফ আলীর চেহারা তাঁর চোখে না পড়ে) বললেন, ‘তুই শিক্ষামন্ত্রী, না কুশিক্ষামন্ত্রী? (তিনি তিনবার তাকে এ প্রশ্নে বিদ্ধ করলেন)। ৩০ লক্ষ শহীদের দেশ বাংলাদেশের মান-সম্মান তোরা দেশ-বিদেশে ডুবিয়ে দিলি!’ এ কথা বলে বিমর্ষ চিত্তে বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে গেলেন। দরজার কাছ থেকে আবার বলে গেলেন, সোহরাব হোসেন যেন সচিবালয়ে আর না আসে।

বঙ্গবন্ধু তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে হুকুম দিলেন, সেই জঘন্য অপরাধীকে দুই-তিন দিনের মধ্যে বাংলাদেশে যেন ফেরত আনা হয়। শেষ পর্যন্ত দুই সপ্তাহ পরে অবৈধ স্ত্রীসহ আমিনুল হককে ফেরত আনা হলে ঢাকা বিমানবন্দরে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

অধ্যাপক ইউসুফ আলীর এই ব্যর্থতা ও কলঙ্কের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে সময়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুজাফ্‌ফর আহমদ চৌধুরীকে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে শপথ দেন। ইউসুফ আলী যথারীতি দিনাজপুরে পরিত্যক্ত জমিদারবাড়িতে বন্দি থাকেন। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইউসুফ আলীর বিষয়ে সাক্ষাৎ করেন। এ সাক্ষাৎকালে সৈয়দ নজরুল ইসলামের পিএস সৈয়দ নেজমুর রহমান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমাদের বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু প্রথমেই তাদের বলে দেন, ইউসুফের কোনো কথা বলতে আসোনি তো তোমরা?’ সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাঁকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু, ইউসুফ আলী এই অপরাধ করেনি। করেছে তার পিএস।’ বঙ্গবন্ধু তাদের দিকে বড় বড় চোখ বের করে বললেন, ‘তোমরা কী কথা বলো? এ ম্যান ইজ নোন বাই দ্য কম্পানি হি কিপস। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সম্মান ক্ষুণ্ণ করেছে; তার কোনো ক্ষমা নেই।’

তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুকে ইউসুফ আলীর একটি ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু, ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার সনদ সে পাঠ করেছে। তার নামে যদি আমরা কলঙ্ক লেপন করে দিয়ে যাই, তাহলে আমরা যেদিন কেউ বেঁচে থাকব না, সেদিন স্বাধীনতাবিরোধী কোনো পক্ষ বা ব্যক্তি আমাদের স্বাধীনতার সনদকেই চরিত্রহীন লোকের পাঠ করা বলে তার ওপর কলঙ্ক লেপন করবে। এটা যাতে ভবিষ্যতে কেউ কোনোদিন না করতে পারে- তার গ্যারান্টি আমাদের রেখে যেতে হবে।’ তাজউদ্দীন আহমদের যুক্তি তিনি মেনে নিলেন এবং ইউসুফ আলীকে শ্রমমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিলেন।

আমাদের মুজিবনগর সরকারের একজন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সংস্থাপন সচিব ছিলেন। তাঁর কর্মদক্ষতা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের ক্ষিপ্রতা সবাইকে মুগ্ধ করত। মুজিবনগর সরকারের ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর প্রতিভার প্রেক্ষাপটে তিনি অনেক স্বাধীনচেতা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। সরকারি কার্যক্রমে ভেনিস শহরে গিয়ে তিনি এক বিদেশি রমণীর প্রতি অসংযত আচরণ করে ফেলেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে এ রিপোর্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাকে চাকরিচ্যুত করে দেন। রাষ্ট্রকে বা রাষ্ট্রক্ষমতাকে কোনো মন্ত্রী বা সচিবদের ব্যক্তিগত ভোগ-লালসার শিকার হতে বঙ্গবন্ধু দেননি।

বিশ্বমানব জাতির এক মহামানবসম বঙ্গবন্ধু তাঁর ক্ষমা ও ভালোবাসার পুণ্যালোকে বাঙালি জাতিকে ও বিশ্বমানব জাতিকে আলোকিত করে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর পুণ্যময়, জ্যোতিময় ধ্যানে উদ্ভাসিত হবে মানবজাতি।

স্বাধীন বাংলা বেতারের ওয়ার করেসপন্ডেন্ট এবং সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার
infomusabd@gmail.com

উৎস: সমকাল

শেয়ার করুন