বন্যাদুর্গতদের জন্য চাই দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা

ড. মাহবুবা নাসরীন

বাংলাদেশের দুর্যোগগুলোর মধ্যে বন্যা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি সংঘটিত দুর্যোগ। নদীবাহিত এই ব-দ্বীপে প্রতি বছরই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল প্লাবিত হয়। শতকরা ২০ থেকে ৬৮ ভাগ এলাকাজুড়ে আঘাত হানে বন্যা। এই বন্যাগুলোর উৎসও ভিন্ন। সমুদ্র, নদী, বৃষ্টিপাত আলাদাভাবে অথবা সব একত্র হয়ে বর্ষাকালীন বন্যা ভয়াবহ রূপ নিয়ে আসে। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের প্রধান তিনটি নদীর উৎস প্রতিবেশী দেশগুলোতে, কিন্তু তারা মিলিত হয় দেশের অভ্যন্তরে এসে।

এবারের বন্যার (জুলাই, ২০১৯-এর পর প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া) উৎস হচ্ছে উচ্চ অববাহিকায় অবস্থিত প্রতিবেশী দেশগুলোতে ‘অতিরিক্ত’ বৃষ্টিপাতের কারণে। চীন, ভারত ও নেপালের অতিরিক্ত পানি নেমে যাচ্ছে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে। উত্তরাঞ্চলে পাঁচটি জেলা অতিক্রম করে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদীর পানি ৩৯টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বাঁধ ভেঙে গাইবান্ধা শহর প্লাবিত হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র প্রতিনিয়ত পানির উচ্চতা ও কমবেশি হওয়ার তথ্য হালনাগাদ করছে এবং গণমাধ্যমে তা প্রকাশ হচ্ছে। বন্যাবিধ্বস্ত এলাকার অবকাঠামো, ঘরবাড়ি, পশুসম্পদ ও মানবসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। জানা যাচ্ছে উত্তর-মধ্যাঞ্চলের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। উজানের ঢল আরও আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বন্যাজনিত মৃত্যুর খবরও পাওয়া যাচ্ছে। আউশ ধান, বীজতলা, সবজি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাতে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, বন্যা উপদ্রুত প্রান্তিক জনগণের নিজের সঞ্চয় বা সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দিয়ে এই দীর্ঘস্থায়ী বন্যা মোকাবেলা সম্ভব হবে না।

এবারের বন্যা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালের বন্যাকে, যা ৭০-১০০ বছরের রেকর্ড ভেঙেছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৮, ২০০৪, ২০০৭ ও ২০১৭ সালের বন্যার ব্যাপকতা থাকলেও সেগুলো এবারের বন্যার মতো বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আঘাত হানেনি।

বাংলাদেশের বন্যা তথা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে এবং সেমতো কেন্দ্র থেকে আঞ্চলিক পর্যায়ে পূর্ব থেকেই ত্রাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সাড়া মিলেছে। তবে এবার প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। বাংলাদেশের মানুষের মানবিক সাড়া বরাবরই সরকারি কার্যক্রমের পাশাপাশি দুর্যোগাক্রান্ত জনগণকে সহায়তা প্রদান করেছে। এবারের বন্যায় যদিও আপামরের বেশি তৎপরতা দেখা যায়নি। আপাতত আশ্রয় ও মৌলিক চাহিদা পূরণ করার জন্যও আমাদের এই সাড়া প্রদান প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের ও বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীরা ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা শুরু করেছে ইতিমধ্যে। গত দু’দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনে ঢুকতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাধাপ্রাপ্ত হতে হয়েছে সাত কলেজ অধিভুিক্তজনিত আন্দোলনের কারণে। আমাদের আবেদন থাকবে, এই সময়ে বিগত বছরগুলোর মতো সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা, তরুণ, যুবসমাজ বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়াবে। বন্যার সময়ে দুর্যোগাক্রান্ত এলাকাগুলোর চাহিদা অনুযায়ী আশ্রয়স্থল নির্মাণাধীন। তবে বলা যায়, চার শতাধিক বন্যা আশ্রয় প্রকল্পের সব কার্যক্রম বাস্তবায়ন হলে বিপন্ন মানুষগুলো রক্ষা করতে পারবে জীবন ও সম্পদ। এলাকার যুব স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে বর্তমানে উঁচু স্থান, রাস্তা বা বাঁধের ওপর বসবাসকারী ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ ও তাদের সম্পদ সুরক্ষা করাটা জরুরি। গবেষণায় দেখেছি, নারী ও কিশোরীদের হয়রানি হওয়ার মতো নানা ঘটনা বিপর্যস্ত করে দেয় কতগুলো পরিবারকে। শিশুসহ এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই সময়েই প্রয়োজন।

বন্যার ইতিহাস বলে দেয় যে, বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য যত্রতত্র অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে পঞ্চাশের দশক থেকে। পরিকল্পনাহীন সেই কাঠামোগত কৌশল বন্যার স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করেছে। বাধাপ্রাপ্ত হয়ে তা প্লাবিত করছে আশপাশকে, ভেঙে যাচ্ছে নদীর পাড়। নদীর পলি অপসারণ করা হলেও তার যথাযথ দেখভাল করা হয়নি। অসংখ্য নদী পলি পড়ে এখনও ভরাট হয়ে আছে। শহরাঞ্চলে পানি ঢুকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ পানি বের হতে দিচ্ছে না- হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।

নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নে নদী রক্ষা কমিশনকে এই বিষয়গুলোর দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। বন্যাবিধ্বস্ত জনপদে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এখন থেকেই নিতে হবে। নতুবা দেশের অর্থনীতি মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। যারা ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন তাদের এখন দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে বিনিয়োগে বেশি মনোযোগী হয়ে সুস্পষ্ট উদ্যোগ নিতে হবে। বন্যাক্রান্ত মানুষকে সহায়তা করা শুধু ত্রাণ তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ক্ষতি কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে এই সহায়তা দীর্ঘমেয়াদি হতে হবে। বাংলার দুর্যোগ সহনশীল জনগণ নিজেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তবে তাদের উদ্যোগগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

বন্যায় স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, অবকাঠামো, আয়মূলক কাজ, গবাদি পশুসহ যেসব খাত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোকে গুরুত্ব অনুযায়ী তালিকা করে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকারের পাশাপাশি পুরো দেশবাসীর সহায়তা প্রয়োজন।

পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সমকাল

শেয়ার করুন