নাটকীয়তা ছড়িয়ে চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড

মিজান আহমদ চৌধুরী : ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন রোমাঞ্চকর ম্যাচ হয়েছে কি না, তা বোদ্ধারাই বলতে পারবেন। তবে লর্ডস যে নিঃসন্দেহে একটা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে শেষ হাসি হাসল ইংল্যান্ড। সেই সুবাদে প্রথমবারের মতো আইসিসি বিশ্বকাপ ঘরে তুলতে সক্ষম হলো ক্রিকেটের উদ্ভাবক এই জাতি।

লর্ডসে রবিবার টস জিতে শুরুতে ব্যাট করে নিউজিল্যান্ড নির্ধারিত ওভারে ৮ উইকেটে ২৪১ রান করে। জবাবে ৫০ ওভারে সবক’টি উইকেট হারিয়ে ইংল্যান্ডও করে সমান রান।

তাই নিয়ম অনুযায়ী ম্যাচটি করে গড়ায় সুপার ওভারে। সুপার ওভারেও দুই দল সমান ১৫ রান করে সংগ্রহ করে। তাই সুপার ওভারের খেলাও টাই হয়। তবে বাউন্ডারি বেশি থাকায় ইংল্যান্ড জিতে নেয় শিরোপা।

১৯৭৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ১৯৮৭ সালে অস্ট্রেলিয়া আর ১৯৯২ সালে পাকিস্তানের কাছে ফাইনালের ব্যর্থতা ভুলিয়ে দিলো ইংল্যান্ড। মাইক ব্রিয়ারলি, মাইক গ্যাটিং ও গ্রাহাম গুচদের আক্ষেপ ঘুচালেন এউইন মরগান। গত বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে বিদায় নেওয়ার পর থেকে যে উত্থান, তারই পুরস্কার তারা পেলো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে। দলকে শীর্ষ র‌্যাংকিংয়ে নেওয়া অধিনায়কের হাতেই উঠলো বিশ্বকাপ ট্রফি।

লর্ডসে টস জয়ী নিউজিল্যান্ড সিদ্ধান্ত নেয় আগে ব্যাট করার। অথচ ম্যাচ শুরুর আগেই হয়েছে বৃষ্টি। তাতেও সিদ্ধান্ত বদলায়নি কিউই অধিনায়কের। আগে ব্যাট করতে নেমে দিক হারিয়েছিল নিউজিল্যান্ডের ব্যাটাররা।

দুই উদ্বোধনীর জুটি থেকে আসেনি বড় সংগ্রহ। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই ধুকতে থাকা মার্টিন গাপটিলের উপর ফাইনাল ম্যাচেও বিশ্বাস রেখেছিল কিউই ম্যানেজমেন্ট। সেটার মর্যাদা দিতে পারেনি গাপটিল। মাত্র ১৯ রানে ক্রিস ওকসের বলে লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়ে ফেরেন সাজঘরে।

আরেক ওপেনার তখন কেন উইলিয়ামসনকে নিয়ে লড়াই করছেন ইংলিশ বোলারদের সঙ্গে। এই জুটি থেকে আসে ৭৪ রান। গোটা আসরে দলকে টেনে আনা উইলিয়ামসন আজ বড় কিছু দিতে পারেননি দলকে। মাত্র ৩০ রান করে ক্যাচ তুলে বিদায় নেন লিয়াম প্লাঙ্কেটের বলে।

এরমধ্যে হ্যানরি নিকোলস তুলে নেন অর্ধশতক। তবে এগোতে পারেননি বেশিদূর। ৫৫ রানের মাথায় বোল্ড করে বিদায় করেন প্লাঙ্কেট।

নিকোলসের বিদায়ের চাপ সামলে আর ঘুরে দারাতে পারেনি নিউজিল্যান্ড। টম ল্যাথাম ৪৭ রান করলেও বাকি ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৪১ রা তুলতে পারে কিউইরা।

ইংলিশদের হয়ে সমান ৩টি করে উইকেট নেন প্লাঙ্কেট ক্রিস ওকস। একটি করে উইকেট নেন জোফরা আর্চার আর মার্ক উড।

স্বাগতিকদের সামনে লক্ষ্যটা মামুলিই হয়ে গেল বটে। ইংলিশরা যখন এই লক্ষ্য তাড়া করতে নামে তখন ২৪১ রান যেন ৩৪১ রানে ঠেকে!

যে জেসন রয়ের উপর নির্ধিদায় আস্থা রাখা যায়, সেই রয়ও আজ ১৭ রানে ফেরেন ম্যাট হ্যানরির বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে।

চাপের শুরু এখানেই। জো রুট মাত্র ৭ রান করে বিদায় নেন কলিন ডি গ্র্যান্ডওমের বলে ল্যাথামের হাতে ক্যাচ দিয়ে।

জনি বেরিষ্টোও আজ হতাশ করে লর্ডসের কানায় কানায় ভরা গ্যালারির হাজারো মানুষকে। মাত্র ৩৬ রানে ফেরেন লকি ফার্গুসনের বলে বোল্ড হয়ে।

এউইন মরগ্যানের ৯ রানে বিদায় যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো। দলীয় রান তখন ৮৬ রান।

এখান থেকেই ইংলিশদের ঘুরে দাঁড় করান আরেক নিউজিল্যান্ড বংশোদ্ভূত বেন স্টোকস আর জস বাটলার। দুইজনের জুটি থেমে ১১০ রানের জুটি গড়ে দলীয় ১৯৬ রানের মাথায়। জস বাটলার বিদায় নেন ৬০ বলে ৫৯ রান করে ফার্গুসনের বলে ক্যাচ দিয়ে।

এরপর যেন স্টোকস একা হাতে নিজের পৈতৃক ভূমিকে হারানোর জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে পড়েন।

যার হাতে ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা হারিয়েছিল ইংল্যান্ড সেই স্টোকসের কাছেই যে আরও বড় অর্জন অপেক্ষা করছে সেটা কে জানত।

শেষ পর্যন্ত লড়াই করে ৯৮ বলে ৮৪ রানের ইনিংস খেলে নাটকীয়ভাবে ম্যাচ টাই করেন স্টোকস।

সুপার ওভারে ম্যাচ গড়ালে আগে ব্যাট করে ট্রেন্ট বোল্টের ওভারে ১৫ তোলে বেন স্টোকস (৮) আর জেসন রয় (৭)।

১৬ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে জোফরা আর্চারের ওভার মোকাবেলা করতে হয় কিউই দুই ব্যাটসম্যান মার্টিন গাপটিল আর জিমি নিশামকে।

আর্চারের প্রথম ডেলিভারিতেই আসে ওয়াইডে ১রান, প্রথম বলে দুই রান নেন নিশাম। দ্বিতীয় বলে নিশামের লেগ প্রান্ত দিয়ে ছয়। পরের বলে আবারও আসে দুই রান। পঞ্চম বলে আসে ১ রান। শেষ বলে লাগে দুই রান।

এখানেই ঝামেলা পাকায় দুই কিউ ব্যাটসম্যান। শেষ বলে দুই রান নিতে গিয়ে দ্বিতীয়বার প্রান্ত বদলের সময় রান আউট হয়ে যান গাপটিল। এখানেই হেরে যায় নিউজিল্যান্ড।

নিউজিল্যান্ডের হয়ে ৩টি করে উইকেট নেন লকি ফার্গুসন ও জিমি নিশাম। ১টি করে উইকেট নেন ম্যাট হেনরি ও গ্র্যান্ডওম।

 

 

শেয়ার করুন