গোয়াইনঘাটে বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্ত, নিখোঁজ ১

গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি :: গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার নিম্মাঞ্চল প্লাবিত হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে ৫০টি গ্রামের লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বসত বাড়ি ও রাস্তাঘাটসহ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যার পানির এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে পানি প্রবেশের কারণে উপজেলার প্রায় ৮০% শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়াও বন্যা কবলিত এলাকার কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পূর্ব নির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে বলে উপজেলা শিক্ষা অফিসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এদিকে বুধবার থেকে বন্যার পানি দফায় দফায় বৃদ্ধি পেয়ে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। ভারতের মেঘালয়ে ভারি বর্ষণ ও বৃষ্টিপাতের কারণে বাংলাদেশ অভ্যন্তরে পিয়াইন ও সারী অববাহিকায় পানি বৃদ্ধির হওয়ায় উপজেলার সবকটি হাওর তলিয়ে গেছে। পিয়াইন ও সারী নদী দিয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে উপজেলার পূর্ব জাফলং, আলীরগাঁও, রস্তমপুর, ডৌবাড়ী, লেঙ্গুড়া, তোয়াকুল ও নন্দীরগাঁও ইউনিয়নের প্রায় ৯৫ ভাগ গ্রামের রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর পানিতে প্ল¬াবিত হয়ে উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বাড়ী ঘর প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি গোচারণ ভূমি পানি বন্ধী হওয়ায় গো-খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

বন্যা গোয়াইনঘাটের আলীরগাঁও ইউনিয়নের  নিম্নাঞ্চলবাসীর জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে। ইউনিয়নের কাকুনাখাই, খলঅ, বুধিগাঁও, নাইন্দা, তীতকুল্লি, খাষ, সোনাপুর, সাতাইন, কমপুর, লাতু নয়ামাটি, পুকাশ, হাতিরপাড়াসহ নিম্নাঞ্চলে পানি বন্দি হয়ে মানুষজন বিপদগ্রস্থ হয়েছেন। এছাড়াও ডৌবাড়ী হাকুর বাজার কাপনা নদীর উপর নির্মিত হাকুর বাজার ব্রীজের সাইড ভেঙে যানবাহন ও মানুষের চলাচল বন্ধ রয়েছে। সারী-গোয়াইন ও সালুটিকর-গোয়াইনঘাট রাস্তা তলিয়ে গিয়ে উপজেলা সদরের সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় নতুন করে আরো প্রায় ৩ শত হেক্টর জমির ফসল ও বীজতলা নিমজ্জিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়া অব্যাহত থাকলে এর পরিমাণ আরো বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কৃষি অফিসের তথ্য মতে এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে পানিতে নিমজ্জিত জমির ফসল ও বীজতলার পরিমাণ ১ হাজার হেক্টর।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে কিছু জমির ফসল ও বীজতলা ডুবে গেছে। বিশেষ করে বোনা আমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে এর পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে জানান তিনি। রস্তুমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহাব উদ্দিন জানান, আমার এলাকার প্রায় ১০০টি পুকুরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। বিশেষ করে আমার ইউনিয়নে অবস্থিত বিছনাকান্দি কোয়ারী বন্ধ থাকায় হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। এলাকার জনসাধারণ চরম দুর্ভোগে রয়েছে।

এদিকে বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দেশের বৃহত্তম বিছনাকান্দি ও জাফলং পাথর কোয়ারী দুটি বন্ধ থাকায় লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আফিয়া বেগম জানান, আমি ইতোমধ্যে আলীরগাঁও, পশ্চিমজাফলং ও লেঙ্গুড়া ইউনিয়নের বেশ ক’টি বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি এবং সাথে সাথে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। মানুষ চরম দূর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। রাস্তা-ঘাট পনিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। এতে গ্রামের মানুষ পার্শ¦বর্তী হাট-বাজারে যাতায়ত করতে পারছে না। এদিকে পাহাড়ি ঢলে জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে নদীতে ডুবে এক যুবক নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ যুবকের নাম হোসেন মিয়া (২৮)। তিনি উপজেলার নয়াগাঙের পাড় গ্রামের গণি মিয়ার ছেলে। গত বুধবার রাতে জাফলংয়ের নয়াবস্তি গ্রাম সংলগ্ন পিয়াইন নদীতে এ ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাতে হোসেন ও তার কয়েক সহযোগি মিলে তার শশুর বাড়ির এলাকা ছৈলাখেল অষ্টম খন্ড থেকে একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা নিয়ে পাহাড়ি ঢলের সাথে পিয়াইন নদী দিয়ে আসা জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করতে যায়। কাঠ সংগ্রহের এক পর্যায়ে তার ব্যবহৃত ছাতার সাথে নদীর ওপর দিয়ে বিদ্যুত সঞ্চালনের লাইনে শক লেগে হোসেন মিয়া নৌকা থেকে ছিটকে পানিতে পড়ে যায়। নদীতে প্রবল স্্েরাত থাকায় মুহুর্তের মধ্যেই সে পানিতে তলিয়ে যায়। এতে করে তার সাথে থাকা লোকজন হোসেন মিয়াকে উদ্ধার করতে ব্যার্থ হয়। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ রয়েছেন।

গোয়াইনঘাট থানার ওসি (তদন্ত) হিল্লোল রায় জানান, বিষয়টি আমরা শুনেছি। দিনভর বৃষ্টি আর নদীতে প্রবল স্রোত থাকার কারণে এখনও তার কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে তার সন্ধানে থানা পুলিশসহ এলাকার লোকজনও সচেষ্ট রয়েছে।

শেয়ার করুন