স্বপ্ন, বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ

এম হাফিজ উদ্দিন খান

গত কয়েকদিন ধরেই পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে এবারের বাজেট নিয়ে নানারকম বিশ্নেষণ, প্রত্যাশা, চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবায়নের অতীত চিত্র নিয়ে বিশ্নেষণ চোখে পড়ছে। আমাদের সমাজে রসিকতা করে অনেকেই বলে থাকেন- বাজেটে মেলে না সংসারের হিসাব। এই কথার সঙ্গে বাস্তবতার অমিল নেই। আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র উজ্জ্বল হচ্ছে সত্য; কিন্তু এও সত্য যে, আমাদের অর্থনীতি ঘিরে শঙ্কার দানাও পুষ্ট হচ্ছে। যেমন ব্যাংক খাতে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা উদ্বেগের। খেলাপি ঋণের চিত্র ক্রমেই স্ম্ফীত হচ্ছে এবং আমাদের অর্থনীতির জন্য বিষয়টি অশনিসংকেত। আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে পুনরায় অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি মিললেও আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। অনিয়ম-দুর্নীতির রাশ টেনে ধরা যাচ্ছে না সরকারের নানারকম অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি কিংবা তাদের ভাষায় কঠোর অবস্থানের পরও। এই বাস্তবতা আমাদের স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ও সম্ভাবনার পথে কাঁটা ছড়িয়ে দিচ্ছে। এসব বিষয় আমলে রেখেই সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করতে হবে। ২০১৯-২০ সালের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্নেষণ করতে হলেও সেই প্রেক্ষাপটেই করতে হবে।

১৩ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী ২০১৯-২০ সালের বাজেট বক্তৃতা শুরু করলেও তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় প্রধানমন্ত্রী স্পিকারের অনুমতিসাপেক্ষে অর্থমন্ত্রীর পক্ষে বাজেট বক্তৃতা পাঠ করেন। অর্থমন্ত্রী অসুস্থ অবস্থায় সরাসরি হাসপাতাল থেকে বাজেট উপস্থাপন করতে জাতীয় সংসদে এসেছিলেন। উপস্থাপিত বাজেট নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। সম্ভবত দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট উপস্থাপন করা হলো। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১১তম বাজেট এটি। ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের’- প্রতিপাদ্য নিয়ে জাতীয় সংসদে জীবনের প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলে আসছিলেন, গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে স্মার্ট বাজেট উপস্থাপন করবেন। আর তাতে থাকবে নতুন নতুন চমক। স্মার্ট বাজেট, চমক, নতুনত্ব ইত্যাদি নিয়ে আলোচনার মতো তেমন কিছু পাইনি। সংক্ষিপ্ত পরিসরে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার অবকাশ না থাকলেও মোটাদাগে কিছু কথা বলা যায়।

এবারকার বাজেটের আকার অনেক বড়। সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে এই বাজেট ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ ও সংশোধিত বাজেটের চেয়ে তা ১৮ দশমিক ২২ শতাংশ বড়। প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে জাতীয় সংসদে যেহেতু দীর্ঘ আলোচনা হবে, সেহেতু সংশোধনের অবকাশ রয়েছে। দীর্ঘ আলোচনা শেষে আগামী ৩০ জুন বাজেট পাস হবে। উল্লেখ্য, গত বছর সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছিলেন।

প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। বর্তমান অর্থমন্ত্রী গত সরকারের মেয়াদে তিনি পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে বাজেট প্রণয়নে পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। এবার প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির অঙ্কটাও কম বড় নয়। আমাদের মতো দেশে বাজেটে এত ঘাটতি সুখকর বার্তা নয়। আমাদের আয়ের সামর্থ্য যে সীমিত এ আর নতুন করে বলার কিছু নেই। আরও বড় কথা হলো, আমাদের রাজস্ব আহরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। এও সত্য যে, অনেক প্রতিশ্রুতিই থেকে যায় বাজেট বইয়ে লিপিবদ্ধ। অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন চিত্র কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে দূরেই থেকে যায়। তাছাড়া রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনের বিষয়টিও অনস্বীকার্য। রাজনীতিতে বাহবা পাওয়া কিংবা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে লাভের হিসাব কষে নয় বরং অর্থনৈতিক উন্নয়নের নীতিমালা অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন করা উচিত হলেও এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয় না- এও আমাদের অভিজ্ঞতায় রয়েছে। এ দেশে প্রস্তাবিত বাজেটে যে অঙ্ক ধরা হয়, সংশোধিত বাজেটে তা কমানো হয়। অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বাজেটে যে পরিকল্পনা করা হয়, সংশোধিত বাজেটে তাও কাটছাঁট করা হয়। অর্থনীতির জন্য এমনটি ভালো নয়। দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি থেকে যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই কথার কথা হয়ে। আর এ জন্যই আমাদের অনেক কিছুই কাঙ্ক্ষিত রূপ পায় না।

প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের আকার চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ৫৮ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। রাজস্ব আহরণ আমাদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট দক্ষতা ও কর্মপরিকল্পনা দরকার। নতুন বছরে মূল্যস্ম্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমরা যে হযবরল অবস্থা দেখে আসছি, তাতে এ ক্ষেত্রে শঙ্কা তাড়া করেই। স্বেচ্ছাচারী, অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজারে ইতিমধ্যে কম তুঘলকি কাণ্ড চালায়নি। মূল্যস্ম্ফীতির উৎকটতাও এ জন্য আমাদের এ পর্যন্ত কম ভোগান্তি দেয়নি। সাধারণ মানুষের কাছে মূল্যস্ম্ফীতির বিষয়টি কখনও কখনও জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে চরম বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।

বৈদেশিক সহায়তা বাবদ ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা পাওয়ার প্রত্যাশা করেছে সরকার। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতায় এও আছে, বৈদেশিক ঋণ কিংবা সহায়তারও অপব্যবহার হয়েছে, অপচয় হয়েছে এবং প্রশ্ন করার মতো নানারকম ঘটনা ঘটেছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে এ ক্ষেত্রেও নানা রকম অঘটনের পথ খোলাই থেকে যাবে। সহায়তা কিংবা ঋণের অর্থের যদি যথাযথ ব্যবহার না হয়, তাহলে উন্নয়ন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষতির চিত্র স্ম্ফীত হবে-এটাই স্বাভাবিক।

আমাদের দেশে সামর্থ্যবান মানুষের একটা বড় অংশ করের আওতায় নেই। করের আওতা বাড়ানোর ব্যাপারে নানা মহল থেকে কথা উঠেছিল। আমাদের দেশে অন্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কর জিডিপি হারও অনেক কম। জাতীয় আয়ের যে প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে, এর সঙ্গে এই চিত্র সঙ্গতিহীন। একই সঙ্গে আর্থিক খাতে যে পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাও এ ক্ষেত্রে আরও বড় বাধার কারণ হবে। আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যাপারে বাজেটে যা বলা হয়েছে, তাতে সন্তুষ্ট হওয়ার তেমন কিছু নেই। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দকৃত ব্যয় কতটা যথাযথভাবে হয় বা হচ্ছে, এ নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। উন্নয়ন প্রকল্পের বারবার সংশোধনের ফলে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এডিপি বাস্তবায়নের যে হার এই অর্থবছর শেষে দেখানো হয়েছে, তাও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ যেন জোড়াতালি দিয়ে তৈরি।

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের বিষয়টি। এসব খাতে বরাদ্দ বেড়েছে বটে; কিন্তু মোট জিডিপির অনুপাতে কমেছে। এ অবস্থায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রচেষ্টা কতটা সফল হতে পারে? আমাদের জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান। এই জনসংখ্যাকে যদি দক্ষ জনসম্পদ কিংবা মানবসম্পদে রূপান্তর করা না যায়, তাহলে আমাদের সামাজিক চিত্র উজ্জ্বল করার চিন্তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। তাই বাজেট পাস হওয়ার আগে এই বিষয়টি সম্পর্কে গুরুত্ব সহকারে ভেবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার মনে করি।

রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে করের ক্ষেত্র বিস্তৃতকরণ। কিন্তু বর্তমান বাজেটে সে রকম কিছু কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দেখা গেল না। বাজেট প্রণয়নের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া। শুধু করমুক্ত আয়সীমা বাড়ালেই তো চলবে না, করের আওতাও বাড়াতে হবে। রাজস্ব আহরণে জোর দিতে হবে। তা না হলে এই যে সাধারণ মানুষের স্বস্তির বিষয়টি, তা নিশ্চিত করতে বাধা থেকেই যাবে। জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক প্রতিষ্ঠানেই দুর্নীতি বাড়ছে। অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে লোকসান হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যয় পরিচালনার জন্য সরকারকে বাড়তি বোঝা টানতে হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে যেসব ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ হবে, সেসব আমলে নিয়ে সংশোধনের পথে হেঁটে বাজেট পাস করলেই মঙ্গল। কৃষি, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো সম্পর্কে আরও ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।

আরও একটি বিষয় হলো, ব্যাংক থেকে নেওয়া সরকারের ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। এবারের বাজেটেও ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার যে অঙ্ক দেখলাম, তা অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্রমবর্ধমান এই প্রবণতা ভালো নয়। এ ক্ষেত্রে লাগাম টেনে ধরতে হবে। সরকারের ব্যয় হ্রাসে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বাজেট পেশই শেষ কথা নয়, বাস্তবায়নই হলো বড় কথা। সে ক্ষেত্রে সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সর্বাগ্রে দক্ষতা-স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন

উৎস: সমকাল

শেয়ার করুন