মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগরূক থাকুক

আ ব ম ফারুক

আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯ উদ্বোধন হয়েছে গত ২৯ মে। মোট ১০টি দেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার এই প্রতিযোগিতায় খেলার জন্য নির্বাচিত হয়েছে, বাংলাদেশ যার মধ্যে অন্যতম। যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বক্রিকেটের এই সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতায় প্রতিটি দল প্রতিটি দলের সঙ্গে খেলবে। এই হিসাবে মোট ৪৫টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। গত ৩০ মে থেকে এ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, যা চলবে ৬ জুলাই পর্যন্ত। এর পর ৯ ও ১১ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে দুটি সেমি ফাইনাল। সবশেষে ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল। এটি হবে লন্ডনের ইতিহাসপ্রসিদ্ধ লর্ডসের মাঠে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি খেলা হয়ে গেছে। খেলা চলার সময়টাও আমাদের দেশের ক্রিকেটপাগল মানুষের জন্য মোটামুটি সুবিধাজনক। কারণ সারা রাত জেগে খেলা দেখতে হচ্ছে না। বাংলাদেশ বা অন্যান্য প্রিয় দল যখন ভালো খেলে, কোনো উইকেট পায় কিংবা চার-ছক্কা মারে, তখন উচ্ছ্বাস আর হাততালির কোনো কমতি হয় না। ক্রিকেটপাগল মানুষের এ এক স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। বাংলাদেশ যখন কোনো খেলায় জেতে, তখন খুশিতে অনেকে রাস্তায়ও নেমে যায়, শব্দবর্ধক কিছু না থাকলে হাতের কাছে পাওয়া হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাসন বাজাতে বাজাতে। আমাদের এই আন্তরিক খুশির প্রকাশ অমর হোক।

কিন্তু এই উচ্ছ্বাস-হাততালি-উল্লাসের মাঝেও কখনও কখনও বুকের মধ্যে একটা কষ্ট মোচড় দিয়ে ওঠে, যখন দেখি কারও কারও প্রিয় দলের তালিকায় পাকিস্তানের নাম থাকে। কিংবা পাকিস্তানিরা কোনো একটা চার-ছয় রান করলে বা একটা ক্যাচ ধরলে বা কোনো উইকেট পেলে কেউ কেউ সোল্লাসে চিৎকার করে বা হাততালি দেয়। কিছুদিন আগে পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রাক্তন ক্রিকেট খেলোয়াড় ইমরান খান সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অনেক সমর্থক রয়েছে। কথাটা শুনে আনন্দিত হওয়ার বদলে কষ্ট পেয়েছি। কষ্টের কারণ হলো, আমার মনে পড়েছে ১৯৭১ সালে এই পাকিস্তানিরা আমাদের সঙ্গে কী নির্মম আচরণটাই না করেছে! এখনও ভুলতে পারি না কী ভয়ঙ্কর জীবনই না আমরা পার করেছি সে সময়! সারা দেশে কোথাও কোনো নিরাপত্তা ছিল না। যে কোনো সময় পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী কিংবা তাদের দোসররা যে কাউকে নিয়ে মেরে ফেলতে পারে; ঘরে আগুন দিতে পারে, সম্পদ লুট করতে পারে; মা-বোনদের চরম নির্যাতন করতে পারে- এই শঙ্কা সর্বক্ষণ তাড়া করত। তারা ঘোষণা করেছিল- বাঙালি নারী আর বাঙালিদের বাড়িঘর-ধনসম্পদ সবই নাকি ‘গনিমতের মাল’। অতএব এগুলো ধর্ষণ-লুট-ধ্বংস করা নাকি ‘জায়েজ’। জার্মান বাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের ওপর যেভাবে নির্যাতন ও গণহত্যা চালিয়েছিল; বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিদের চালানো নির্যাতন ও গণহত্যা তার চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনেক বেশি ছিল।

একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসররা এখন পাকিস্তানের শুভাকাঙ্ক্ষী। তারা বলে, ‘খেলা তো খেলাই। এখানে রাজনীতি আনার কী প্রয়োজন?’ কিন্তু এই কথাটাই তো একটা রাজনৈতিক অপকৌশল। আমার আদর্শ আমার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রীয় সব পর্যায়ের কর্মকাণ্ড, চালচলন, বন্ধুত্ব, পছন্দ-অপছন্দ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে। এই আদর্শ আসে আমার শিক্ষা, ইতিহাস, সচেতনতা, বিশ্বাস ও স্বপ্ন থেকে। পাকিস্তানের এই শুভাকাঙ্ক্ষীদের আরেকটি কৌশল হলো, ‘পুরনো জিনিস ভুলে গিয়ে এখন সামনে তাকানো উচিত’- এ রকম কথা প্রচার করা। কিন্তু পুরনো কথা ভুলব কী করে? কমপক্ষে ৩০ লাখ মানুষের আত্মাহুতি, কমপক্ষে পাঁচ লাখ মা-বোনের সল্ফ্ভ্রমহানি, অগ্নিসংযোগে তখনকার হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস, তারও বেশি পরিমাণের লুটতরাজ, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাহীনতা, আমাদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও অপমান সবকিছুর বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এই স্বাধীনতার ইতিহাস ভুলি কী করে? এ ছাড়াও আমাদের কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতাও তো বেদনা-তিক্ততা; অপমানে ভরা।

১৯৭১ সালের মার্চে নারায়ণগঞ্জ শহরে আমার মা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। নামি চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়েছিলেন তাকে বেড রেস্টে থাকতে হবে; নড়াচড়া বারণ, খাবারদাবারও সুনির্দিষ্ট। বাবাও ছিলেন গ্যাস্ট্রিক আলসারে আক্রান্ত। এ অবস্থাতেও ২৫ মার্চের কালরাত থেকে গণহত্যা আর অগ্নিসংযোগ শুরুর পর ২৮ মার্চ তারিখে জীবন বাঁচাতে মা-বাবা আর সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ দুটি বোনকে নিয়ে প্রতিবেশী-আত্মীয়দের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের নিজ বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয় অজানা উদ্দেশে। দেওভোগ, মাসদাইর, কাশীপুর দিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটেছিলাম। আমার অসুস্থ মা হাঁটতে পারছিলেন না বলে একটু পরপর থামতে হচ্ছিল। সবাই প্রাণ বাঁচাতে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। ফলে মাকে চেয়ার বা দোলায় বসিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো সাহায্যকারীও কেউ ছিল না। পেছনে আগ্নেয়াস্ত্রের তাড়া। আমার অসুস্থ মাকে গ্রামবাসী অনেকেই পানি, মুড়ি-চিড়া খাওয়াচ্ছিলেন আর তাদের বাড়ি থেকে যেতে বলছিলেন। নইলে হয়তো পথিমধ্যেই কোনো অঘটন ঘটে যাবে। কিন্তু তাদের চারপাশে আতঙ্কিত লাখো মানুষের ঢল। আমাদের দলের সবাইকে তারা জায়গা দিতে পারবেন না। শেষ পর্যন্ত ফতুল্লার দক্ষিণে বক্তাবলী ইউনিয়নের দক্ষিণের গ্রাম কানাইনগরে আব্বার পরিচিত এক ভদ্রলোকের বাড়িতে গিয়ে থামি। কিন্তু আমরা আসার আগেই সেই বাড়ি লোকে লোকারণ্য। চারদিকে শুধু ভীত-সন্ত্রন্ত মানুষ গিজগিজ করছে। সেই ভদ্রলোক আব্বার কাছে দুঃখ-লজ্জা প্রকাশ করলেন। কিন্তু আম্মার অবস্থা দেখে তার বাড়ির লাগোয়া নবপ্রতিষ্ঠিত কানাইনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। আমাদের দলের সবাই সেই স্কুলের মেঝেতে হোগলা ও চাদর বিছিয়ে ঘুমিয়েছি। অন্যদের চাইতে আমাদের ভাগ্য ভালো যে, সেই ভদ্রলোক তার বাড়ি থেকে কয়েকটি হাঁড়ি-পাতিল আমাদের দিয়েছিলেন। আমাদের দলের নারীরা সেগুলোতে রান্না করতেন। আমার বোনেরা দলের অন্য কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে আশপাশের জমি থেকে প্রতিদিনই কিছু কিছু সবজি তুলে আনত। নিজ দেশে বাড়িঘর ছেড়ে শুধু ভবিতব্য আর সাধারণ মানুষের দয়ার ওপর নির্ভর করে আমরা বেঁচে ছিলাম। বাংলাদেশের অন্যান্য গ্রামের মতোই কানাইনগর গ্রামের মানুষ যে কত অসহায় মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল, তার ইয়ত্তা নেই! তাদের এই মহানুভবতায় আমাদের পরিবারসহ হাজার মানুষের প্রাণ বেঁচেছিল। এর ‘খেসারতও’ পরে তারা দিয়েছে রক্ত দিয়ে আর ঘরবাড়ি

পুড়িয়ে রাজাকাররা পথ চিনিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের এই গ্রামে নিয়ে আসে। নিজ দেশে প্রাণ বাঁচানোর জন্য এ রকম অসহায় উদ্বাস্তু হওয়ার মতো কী অপরাধ আমরা করেছিলাম? আমাদের অপরাধ ছিল, আমরা পছন্দমতো ভোট দিয়েছিলাম।

কয়েকদিন পর আমাদের নববিবাহিতা এক মামির বাবা কুমিল্লার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের কয়েকবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান তার মেয়েসহ আমাদের দলকে উদ্ধারে একটি খালি লঞ্চ নিয়ে প্রাণনাশের বিপদ, শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিষেধ ও পথের বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টিতে এসে লঞ্চ ভেড়ান। আমাদের তিনি যেভাবে খুঁজে পান, সে আরেক কাহিনী। যা হোক, রামকৃষ্ণপুর যেতে গিয়ে বাধা পেয়ে আমাদের দলটি নরসিংদীর দিকে যেতে বাধ্য হয়। নরসিংদীর কাছাকাছি আসতেই পাকিস্তানি বাহিনী নরসিংদী শহরে বোমাবর্ষণ শুরু করে। কয়েকটি বোমা নদীতেও এসে পড়ে। আমাদের লঞ্চটি তখন পুনরায় ফিরে যায় এবং উদ্দেশ্যবিহীন চলতে থাকে। অবশেষে এক সময় লঞ্চটি রামকৃষ্ণপুর যেতে সমর্থ হয়। সেখানে কিছুদিন থাকার পর আমাদের পরিবার কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার বড়শালঘর যাত্রা করে। সীমান্তের প্রায় কাছাকাছি গ্রাম। সেখানেও কয়েক দিন পর পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার শুরু হলে আমাদের পরিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার মহেশপুর গ্রামে আশ্রয় নেয়। কিছুদিন পর সেখানেও থাকা নিরাপদ না হওয়ায় পরিবারটি অগত্যা নারায়ণগঞ্জ শহরে ফিরে আসে। নিজ দেশে উদ্বাস্তু জীবনের এই হেনস্তা-বেদনা, পথের কষ্ট, পদে পদে মৃত্যু আর লাঞ্ছনার ভয়, এই অপমান- ভুলে যেতে বললেই সব ভুলে যাব? আমার মতো লাখ লাখ পরিবারের একই রকম বা কষ্টের কাহিনী রয়েছে। তারাও কি সব ভুলে যাবে? এতই সহজ? বারবার বলার পরও পাকিস্তান সরকার তাদের কৃতকর্মের জন্য বাংলাদেশের কাছে একবারও ক্ষমা চায়নি। বারবার চাওয়ার পরও আমাদের পাওনা সম্পদ ফেরত দেয়নি। বরং বলে, তারা নাকি কোনো গণহত্যা, গণধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগ করেনি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নাকি হিন্দুদের কাজ! আমাদের দেশের সব মসজিদ নাকি আমরা ভেঙে মন্দির বানিয়ে ফেলেছি!

১৯৪৭ থেকে দীর্ঘ ২২৪ বছর পাকিস্তানিরা আমাদের সম্পদ ব্যাপকভাবে শোষণ করেছে। সেই টাকা দিয়ে তারা করাচি-লাহোর-রাওয়ালপিন্ডি আর ইসলামাবাদের মরুভূমিকে রাজধানী বানিয়েছে। তাদের শহরগুলোকে উন্নত করেছে, রাস্তাঘাট, শিল্প-কারখানা বানিয়ে আমাদের সর্বদিকে বঞ্চিত করেছে। সরকারি চাকরি আর সামরিক বাহিনীতে আমরা ছিলাম অতি নগণ্য। ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল তাদের দখলে। অথচ আমরাই ছিলাম সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের চাইতে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি ছিল অনেক সমৃদ্ধ। কিন্তু তারা এখানেও আঘাত করেছিল। সত্যিকার অর্থেই তারা আমাদের দাস শ্রেণির চাইতে উন্নত কিছু মনে করত না। ইসলাম ধর্মের মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বদলে তারা আমাদের নিয়ে সর্বক্ষণ হাসি-তামাশা করত। একাত্তরের বর্বরতা, নৃশংসতা আর অপমানকে ভুলতে পারি না বলেই পাকিস্তানকে ঘৃণা করি।

হতে পারে বয়স্করা, যারা হাততালি দেয় তারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে ছিল না। কিন্তু নতুন প্রজন্ম আমাদের সন্তান। আমরা চাইলেও তাদের কাছে একাত্তরের বিভীষিকার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারব না। বই-পত্রিকা-টিভি-রেডিওতে একাত্তরের যতটুকু চিত্র উঠে আসে, প্রকৃত চিত্র ছিল তার চেয়েও ভয়াবহ। প্রকৃত অবস্থাটুকু জানলে আমাদের নতুন প্রজন্ম নিশ্চয় খেলা দেখতে বসে পাকিস্তানের চার-ছক্কা মারা দেখে হাততালি দিত না।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর থেকে দীর্ঘ ২১টি বছর নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস, স্বাধীনতার কঠিন সংগ্রাম সম্পর্কে জানতে দেওয়া হয়নি। পাকিস্তান সম্পর্কে একটা মুসলিম দেশের ধারণাই শুধু তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে অনুরোধ, তারা আমাদের অতীত সম্পর্কে জানুক। আমাদের জাতির প্রতি অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা আর জাতিগত অপমানকে হৃদয় দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করুক।

অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ; সাবেক চেয়ারম্যান, ফার্মাসি বিভাগ সাবেক ডিন, ফার্মাসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
abmfaroque@yahoo.com

উৎস: সমকাল

শেয়ার করুন