বাজেটে চাই যৌক্তিক বরাদ্দ

মামুনুর রশীদ

পৃথিবীর অনেক দেশে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নেই। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান এবং আরও কিছু দেশে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় রয়েছে। এসব দেশে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতায় পড়ে শিল্পকলা, সাহিত্য, নৃত্য, গীত, পাঠাগার, জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয়টি এখানে অনুপস্থিত তা হলো শিক্ষা। যদিও শিক্ষার জন্য ভিন্ন মন্ত্রণালয় আছে। সেই মন্ত্রণালয় প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার তদারকি করে থাকে। প্রায়শই শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের গুরুতর সমন্বয় প্রয়োজন হয়; কিন্তু তা কখনোই হয়ে ওঠে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিধি ব্যাপক। সেই অর্থে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় অনেক সংকুচিত। সে কারণে কোনো মন্ত্রী-আমলা এই মন্ত্রণালয়ে আসতে চায় না। কেউ কেউ মনে করেন, এটি একটি শাস্তিমূলক পোস্টিং। যেসব দেশে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নেই, সেসব দেশে সংস্কৃতি থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন। কারণ তারা ভাবেন, সংস্কৃতিও শিক্ষার অংশ। কাজেই শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকাটা অনেক সুবিধাজনক। কিন্তু সেসব দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় উল্লিখিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। তাই এ দেশে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় খুব স্থূল অর্থে কিছু কাজ করে থাকে। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে অ্যাডওয়ার্ড টেইলর সংস্কৃতির একটি সংজ্ঞা দিয়েছিলেন। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী মানুষের শিক্ষা, আচার-আচরণ এবং জ্ঞানের একটি সমন্বিত প্যাটার্নকে বলা যায় সংস্কৃতি।

গোলাম মুরশিদ বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘ভাষা-সাহিত্য ধারণা, ধর্ম ও বিশ্বাস, রীতিনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ, উৎসব-পার্বণ, শিল্পকর্ম ও প্রতিদিনের কাজে লাগে এমন হাতিয়ার ইত্যাদি সবকিছু নিয়েই সংস্কৃতি। সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষ যেসব শিক্ষা সামর্থ্য এবং অভ্যাস আয়ত্ত করে, তাও সংস্কৃতির অংশ। নিঃশ্বাসের বায়ু যেমন চারদিক থেকে আমাদের ঘিরে রাখে, তাকে অনুভব বোধ করি; কিন্তু তাকে দেখতে পাই না, সংস্কৃতিও তেমনি’- এই ধারণা থেকে বলা যায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ধর্ম মন্ত্রণালয় আসলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন হওয়া উচিত। কোনো কোনো দেশে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সরকারপ্রধানের হাতে থাকে। কারণ সংস্কৃতির গুরুত্ব তারা অনুভব করেন। আমাদের দেশে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আছে, যার কর্মপরিধি বেশ সংকুচিত। একটা সংকীর্ণ বলয়ে তারা কাজ করে থাকেন, যা খুবই অবহেলিত। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে তিনটি একাডেমি। শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি ও বাংলা একাডেমি। যাদের মূল কাজ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক শিল্পকলা একাডেমির। জেলা ছাড়াও এখন উপজেলায় তা বিস্তৃত হচ্ছে। অনুষ্ঠান আয়োজন ও কিছু প্রশিক্ষণ দেওয়া ছাড়া জেলা শিল্পকলা একাডেমির অন্য কোনো কাজ নেই। এই একাডেমির প্রধান হচ্ছেন জেলা প্রশাসক। তার নানা ব্যস্ততার মধ্যে এই কাজটি খুবই গৌণ। একবার আমি এক জেলা শহরে রবীন্দ্রজয়ন্তীর সময় উপস্থিত ছিলাম। শিল্পকলা একাডেমি এই উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। ৬টার সময় অনুষ্ঠান হওয়ার কথা; কিন্তু জেলা প্রশাসক এলেন ঘণ্টাখানেক পরে এবং ২০-২৫ জনের সামনে দুটি কবিতা আবৃত্তি, দুটি গান ও একটি নৃত্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শেষ হলো। জেলা প্রশাসকের বক্তব্য অত্যন্ত পল্লবগ্রাহী। মাত্র ৪৫ মিনিটেই অনুষ্ঠানটি শেষ হয়ে গেল। জেলা শিল্পকলা একাডেমির ফান্ডের বরাদ্দটিও তখন শেষ হয়েছে।

শিল্পকলা একাডেমির বা অন্যান্য একাডেমির দায়িত্ব হচ্ছে শিল্প-সাহিত্যকে উৎসাহিত করা, নিজেদের অনুষ্ঠান করা নয়। যেসব দল এসব কর্মকাণ্ড করে থাকে, তাদের আর্থিক এবং নানা সুবিধা দিয়ে উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, জেলা শিল্পকলা একাডেমিগুলো নিজেরাই এসব অনুষ্ঠান করে একটা তাঁবেদার শ্রেণি তৈরি করছে, যারা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত। কালক্রমে এসব লোক শিল্পের সঙ্গে আর যুক্ত থাকে না। প্রশাসন ও রাজনীতির হালুয়া-রুটির ভাগাভাগিতে চলে যায়। প্রকারান্তরে এরা এক ধরনের কালচারাল টাউট হয়ে যায়। বাংলাদেশ শিল্প-সাহিত্যে এক চমৎকার চারণক্ষেত্র। মানুষের বোধ এবং জীবনাচরণ এক গভীর সাংস্কৃতিক চেতনায় আপ্লুত। জনগণ শিল্প-সাহিত্যের যেমন সমঝদার, তেমনি তীব্র রাজনীতিসচেতন; যে কারণে ‘৪৭-এর দেশ বিভাগ, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া বা সামরিক স্বৈরশাসককে কখনও মেনে নেয়নি। এই মেনে না নেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি সংস্কৃতি। যে কোনো ঘটনাকে বিশ্নেষণ করলে দেখা যাবে, এসব আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল কবি, সাহিত্যিক, চারুশিল্পী, আবৃত্তিকার, গায়ক, নাট্যকর্মী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, চলচ্চিত্রকার, সাংবাদিক এবং ছাত্র-জনতা। কৃষক-শ্রমিকও পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষের ভাবনাকে প্রভাবিত করে যে শিল্প-সাহিত্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রধিকার পাওয়া উচিত ছিল। একবার এক সংস্কৃতি সচিবের সঙ্গে আমরা আলোচনায় বসেছিলাম। এক পর্যায়ে সিএসপি আমলা বলে উঠলেন, যেখানে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রায়োরিটি খাদ্য, সেখানে আপনাদের শিল্প-সাহিত্যের কী মূল্য আছে? ভদ্রলোককে তখন অবশ্য জাপানি নাটক একশ’ বস্তা চাল দেখাতে পারিনি। সগুন রাজত্বের পর যখন জাপানে মেইজি সংস্কার হচ্ছে, তখনকার ঘটনা। জাপানের জনগণ পেশিশক্তিকে ত্যাগ করে বুদ্ধিবৃত্তি চর্চায় ফিরে আসছিল, সে সময় জাপানে এক প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাপক দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। সেই দুর্ভিক্ষের সময় একশ’ বস্তা চাল ওই জায়গায় পাঠানো হয়। এলাকাপ্রধান সগুনদের অস্ত্রের ঝনঝনানি ও মৃত্যুভয়ের মুখে চালটি বিক্রি করে দেয় এবং একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য সে অর্থ ব্যয় করে। এলাকাপ্রধানের যুক্তি ছিল, একশ’ বস্তা চাল ওই এলাকার মানুষের মধ্যে বিলি করলে সবাই পাবে ছয় ছটাক করে, তাতে কোনো পরিবারই একবেলার বেশি খেতে পারবে না। অথচ স্কুলটি হলে মানুষ শিক্ষিত হবে এবং পরবর্তীকালে দুর্ভিক্ষ যাতে না হয়, তার উপায় খুঁজে বের করবে।

মানুষ কেন প্রতারক হয়? কেন মানুষকে ঠকায়, সমাজে কেন দুর্নীতি বাড়ে, কী করে মানুষ নিজেকে সংযত করবে, নৈতিক হবে, এসবের মীমাংসা হবে তার নিজের মধ্য থেকে। এ ক্ষেত্রে সংস্কৃতিই একমাত্র মহৌষধ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন করে এসব সমস্যার সমাধান হয় না। মানুষ সাহিত্য পড়বে, সঙ্গীত শুনবে, ভালো চিত্রকলা দেখবে, মহৎ মানুষকে অনুসরণ করবে, ভালো নাটক ও চলচ্চিত্র দেখে আত্মশুদ্ধির পথ বেছে নেবে। তাই যে কোনো উন্নত দেশে ভালো শিল্পকর্মকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়ে থাকে। জাপান কাবুকি, গুনরাকুর মতো লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ভারত উচ্চাঙ্গসঙ্গীত, চলচ্চিত্র, নাটক, চারুশিল্প, কুটির শিল্প, ভাস্কর্য- এসব ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। যেহেতু রাষ্ট্র জানে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সার্বক্ষণিক কর্মীরা বেকার এবং কোনো চাকরি-বাকরি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব নয়, তাই তাদের Salary Grant দিয়ে থাকে। বাংলাদেশেও এই Salary Grant প্রচলনের জন্য অনেকদিন ধরে আমরা চেষ্টা করে আসছি। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকর হচ্ছে না। সংস্কৃতিবান্ধব সরকারের কাছে এটি খুবই প্রত্যাশিত ছিল। এটা কি ভাবা যায়? খোদ রাজধানীতে গুলশান, বনানী, উত্তরা, ধানমণ্ডি, মিরপুর- এসব এলাকায় একটিও নাট্যমঞ্চ নেই, সিনেমা হল নেই, পাঠাগার নেই। সব জায়গায় আছে প্রচুর পরিমাণে খাবারের দোকান আর মার্কেট। ঢাকা শহর এখন খাবার ও দোকানের শহরে পরিণত হয়েছে।

মানুষ কি শুধু খেয়েই বাঁচে? কাজের বিনিময়ে খাদ্যের মতো অমানবিক স্লোগানে আমরা কি গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে যাব? প্রতিবছরই দেখা যায়, সংস্কৃতি খাতে বাজেট সর্বনিম্ন। সেই সাবেক সচিবের কথামতো প্রায়োরিটির জায়গায় সংস্কৃতি সর্বনিম্নই হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে অবকাঠামোভিত্তিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে, এটা আনন্দের কথা। কিন্তু এই অবকাঠামোকে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, তার জন্য প্রয়োজন সংস্কৃতি। চার লেন রাস্তা হলে লাভ কী? যদি দুটি লেনই থাকে এলাকার প্রভাবশালী লোকদের অধীনে? ট্রাফিক আইন ভেঙে উল্টোদিক দিয়ে গাড়ি আসা যেখানে নিত্যদিনের ঘটনা। বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে কিন্তু এর ব্যবহারটি যদি না জানা থাকে, তাহলে কী লাভ? জঙ্গিবাদ বা মাদকাসক্তির জন্ম কেন হয় এবং কীভাবে তা নিরাময় করা যায়, সে পথ খুঁজে দেবে সংস্কৃতি। এসবের জন্য একটা বিশাল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রয়োজন। তার জন্য অর্থ চাই। সংস্কৃতিকে অতি জরুরি মনে করে বাজেটে চাই যৌক্তিক অর্থ।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

উৎস: সমকাল

শেয়ার করুন