‘আমার মারে তুলো, আমি মার মাথা পাচ্ছিনা‘

সিলেটের সকাল রিপোর্ট :: মৌলভীবাজারে কুলাউড়ায় ঢাকাগামী আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন সেই ট্রেনের যাত্রী কামরুল ইসলাম মামুন। তিনি সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। দুর্ঘটনার ভয়াবহ বর্ণনা দিয়ে সোমবার সকাল ৯টা ৪৮ মিনিটের সময় তিনি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসে দিয়েছেন।

মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখা এ তরুণ স্মরণকালে ভয়াবহ এ রেল দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন। তিনি নিজ চোখে দেখেছেন মস্তক বিহীন এক মায়ের মাথা খোঁজতে মেয়ের আর্তনাদ। তিনি শুনেছেন আরও শত আহতের চিৎকার। যার সবকিছু তিনি বর্ণনা করেছেন তার এ স্ট্যাটাসে। তার দেয়া স্ট্যাটাসের নিচে নানাজন নানান মন্তব্যও করেছেন।

নাঈম এসপি নামে একজন বলেছেন, ‘সত্যি খুব বেদনাদায়ক ঘটনা।’ আখতিয়ার আহমদ বলেছেন, ‘বেঁচে ফেরাটা মহান রবের পক্ষ হতে পাওয়া গিফট.. এবার তার হয়ে বেঁচে থাকুন। সুস্থতা কামনা করছি, হে অপরিচিত ❤।’ শাকিল মাহমুদ লিখেছেন, ‘আমার বড় ভাই ছিল এ ট্রেনে আল্লাহ হেফাজত করছে।’ 

মোহাম্মদ আল-আমীন নামে এক তার দেয়া স্ট্যাটাসে নিহতের সংখ্যার সমালোচনা করে বলেছেন, ‘সব ওকে বাট অতিরঞ্জিত করবেন না।বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো ১০০ মাইল বেগেও ট্রেন চলেনি।আর নিহতের সংখ্যা নিয়ে তথ্যটা বিভ্রান্তিকর।’ বৃষ্টি রয় লিখেছেন, ‘ভগবান সবার মঙ্গল করুক।’

একটা ট্রেন দূর্ঘটনার আর্তনাত এবং আমার নতুন জীবন।সিলেট থেকে ঢাকা যাওয়ার বাসপথে ব্রিজ ভাঙ্গা সেই সাথে অতিরিক্ত জ্যাম…

Posted by Kamrul Islam Mamun on Sunday, June 23, 2019

 ‘একটা ট্রেন দুর্ঘটনার আর্তনাদ এবং আমার নতুন জীবন’ শিরোনামে প্রকাশ করা তার স্ট্যাটাসটি সিলেটের সকাল পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-

সিলেট থেকে ঢাকা যাওয়ার বাসপথে ব্রিজ ভাঙ্গা সেই সাথে অতিরিক্ত জ্যাম থাকায় বাধ্য হয়ে ২৫০ টাকার টিকিট ৫০০ টাকা দিয়ে নিয়ে ট্রেন পথে রওয়া দিলাম।রাত ১০টায় সিলেট থেকে ‘উপবন এক্সপ্রেস’ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা হলো। তখন আমার টিকিটের গায়ে এক্সট্রা-৫’লেখা দেখে আমার পাশের একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম এই লেখার মানে নি? এক্সট্রা বগি এড করা হয়েছে কিনা?? এই ভদ্রলোক বললো,অতিরিক্ত লাভের আশায় ৫-৬টা বগি এক্সট্রা লাগানো হয়েছে।বাসপথে জ্যাম থাকায় ট্রেনে ভিড় প্রচুর। এখন একটু অবাক হলাম! ২৫০ টাকার টিকিট ৫০০ করে বিক্রি করছে তাও আবার অতিরিক্ত মানুষ নেওয়ার জন্য ৫-৬টা বগি এক্সট্রা লাগাইসে বিষয়টা বেশি হয়ে গেলোনা?? প্রসাশন তাদের কোন খুঁজ-খবর নেয়না?

যাক! ট্রেন চলছে।আমার পাশের সিটে একজন সিলেটের বড় ভাই ছিলো।আমি ছিলাম জানালার পাশে।আমার বাম পাশের জানালার পাশে একজন ভদ্র মহিলা এবং উনার মেয়ে,উনার পাশে একজন বয়স্ক লোক এবং অনেকগুলো মানুষ দাঁড়ানো,আমার ঠিক পিছনেও অনেকগুলো মানুষ দুই বগির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।আমি এক্সট্রা-৫ বগির ৬০ নাম্বার অর্থাৎ সর্বশেষ সিটে। বরমচর,কুলাউড়া এসে একটা কার্লবাট পড়ে ওইখানে আসতেই এক্সট্রা-৪ থেকে অর্থ্যাৎ আমার সামনের বগি,আমার বগি এবং পিছনের বগি ট্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।ট্রেনের নিচে।ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট হওয়া আগুন দেখে আমরা প্রচন্ড ভয় পেয়ে যায়,বুঝতে পারছিলাম না কি হচ্ছে!!কি করবো!! সব সেকেন্ড তিন-চারেকের মাঝে হয়ে গেলো। এই সময় ট্রেনের ওভার গতি ছিলো। ১৪০-১৫০কিমি পা. (আনুমানিক) এর মতো হবে। আমাদের বগিটা এপাশ-ওপাশ হয়ে বড় একটা ধাক্কা খেলে। ঠিক তখনই আমি বুঝলাম,পরিস্থিতি স্বাভাবিক না একদম। ভয়াবহ কিছু হতে যাচ্ছে। আল্লাহ সহায় ছিলো। আমি যে পাশে ছিলাম এই পাশটা মাটিতে লেগে যাবে লেগে যাবে মনে হচ্ছি। যদি আমার পাশটা মাটিতে লাগতো তাহলে আমি সবার নিচে পড়ে যেতাম,তখন হয়তো খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারতো। তখন একটা বড় ধাক্কা খেয়ে আমার বামপাশটা উল্টে যায়।

যেহেতু আমি বিপরীত দিকের জানালায় তাই আমি সবার উপরে এসে পড়লাম। একপাশে আগুন জ্বলছিলো। আমি সাথে সাথে লাফ দিয়ে ট্রেনের একটা অংশে ধরলাম কিন্তু আবার পড়ে গেলাম।ভাগ্য ভালো ছিলো আমার একজনের মাথায় পড়ি।তখন হৈই-হোল্লোর শুরু হয়ে গেলো।আমি একজনের মাথায় পা থেকে আবার লাফ দিলাম এবং জানালাটা ধরতে সক্ষম হয়। জানালা দিয়ে বের হয়ে দেখি আমার পিছনের বগিটা পানিতে পড়ে আছে।আমি যেটাতে ছিলাম এইটা আর আমার সামনের বগিটা উল্টে আছে। মাটিতে নেমে আসলাম।আমার হাত-পা কাঁপছিলো,মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছিলো না। ব্যাগটা ট্রেনেই ছিলো, আমি কোন রকম নিজের জীবন নিয়ে বের হয়ে আসি। ব্যাগে কিছু দরকারি কাগজ আর অনেকগুলা টাকা ছিলো তাই ভাবলাম ব্যাগটা আনা যায়কিনা। আর সবচেয়ে বাজে সময়টা তখনই। আমি ট্রেনের পাশে এসে দেখি আমার পিছনে যে ছেলেগুলা ছিলো তার মাঝে একজন দুই বগির নিচে পড়ে আছে,দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ লোকটার হাত কেটে পড়ে গেছে,বাম পাশের মহিলার মাথা শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেছে। উনার মেয়ে বডিটা নিয়ে চিৎকার করছে, আমার মার মাথা পাচ্ছিনা,কেউ আমার মারে তুলো; মেয়েটা তার মায়ের মাথা খুঁজছে, সামনের একজনও বগির নিচে পড়ে গেছে। আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলাম। আজ যদি আমার পাশটা নিচে পড়তো তাহলে হয়তো ওই মহিলার জায়গায় আমার বডিটা থাকতো। আল্লাহ সহায় ছিলো। আমি একটা খালি জায়গায় গেলাম।

তারপর ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, গ্রামের লোকজন সবাই আসলো। একের পর একজন বের করছিলো। কারও হাত নাই,পা নাই, কেউ মৃত,আবার কেউবা মারাত্মক আহত। কয়েকটা লাশ বস্তায় করে বের করতে দেখলাম। এই লাশগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। ২০ মিনিটের ভিতরে ২১ টা লাশ (এলাকার কয়জন বললো) বের করলো। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কি করবো!! কি করা উচিত আমার। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এই পাঁচটা মিনিট আমার জীবনের সবচেয়ে বাজে সময়। তিন বগিতে ৩০০ জনের উপরে ছিলো। তার মাঝে হাতে গুণা কয়জন সুস্থ অবস্থায় বের হয়ে আসছে। আল্লাহ সহায়,তার মাঝে আমি একজন।

হয়তো অতিরিক্ত বগি লাগানোর কারণেই এই দূর্ঘটনার জন্ম। তাদের কয়টা টাকার জন্যই হয়তো আজ এতগুলা প্রাণ গেলো, এতোগুলো মানুষ আহত হলো। আর ট্রেনের ওভার লোড তার একটা কারণ হয়তে পারে। আল্লাহর রহমতে আমি সুস্থ অবস্থায় রাত ৩:৩০ এর দিকে সিলেট আসছি। আল্লাহ সবাইকে রক্ষা করুন।

আমার কানে যেনো এখন আর্তনাদের চিৎকারগুলো শুনছি,আমার চোখের সামনে দৃশ্যগুলো ভেসে উঠছে।যেনো এখনও আমি মেয়েটার চিৎকার শুনতে পাই, আমার মারে তুলো,আমি মার মাথা পাচ্ছিনা।

রোববার রাত পৌনে ১২টার দিকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার বনশাইল নামক স্থানে বড়ছড়া সেতু ভেঙে সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেসের একটি বগি খাদে পড়ে যায়। এ ছাড়া দুটি বগি পাশের জমিতে এবং তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এতে চারজন নিহত ও প্রায় দেড় শতাধিক আহত হয়েছে।  তবে মৃতের সংখ্যা নিয়ে কামরুল ইসলাম মামুন তার ফেসবুকের তৃতীয় স্ট্যাটাসে প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিলেটের সকাল-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সকাল কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

শেয়ার করুন