স্বাস্থ্য সুরক্ষা, চিকিৎসা ব্যয় ও দারিদ্র্য

এএমএম শওকত আলী

চলতি মাসে অর্থাৎ এপ্রিল মাসে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সেবা ও চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে কিছু তথ্য মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়েছে। গত ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্যসেবা দিবসটি পালিত হয়েছে। এ বছরের বিশ্ব স্বাস্থ্যসেবা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল- ‘সমতা ও সংহতিনির্ভর সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা’। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার কথা আমরা বহুদিন ধরেই শুনছি। কীভাবে এ লক্ষ্য অর্জন করা যাবে, সে বিষয়টিও বহুল আলোচিত। কিন্তু লক্ষ্যটি যে এখনও অর্জন করা যায়নি, তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। এখন প্রতিপাদ্য বিষয়ের সঙ্গে যোগ হয়েছে সমতা ও সংহতিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা। সত্তর দশকের মধ্যভাগে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে থানাভিত্তিক থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। আশির দশকে প্রতি গ্রামীণ থানার পরিবর্তিত নামকরণ করা হয় উপজেলা। সত্তর দশকের মধ্যভাগে সরকারি ব্যয়ে ইউনিয়নকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপিত হয়। অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত ভৌত অবকাঠামোর কোনো অভাব নেই। এ সত্ত্বেও জনমনে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় ও গুণগত মান নিয়ে সংশয় সম্পূর্ণ দূরীভূত হয়নি। নব্বই দশকের মধ্যভাগে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সরকারি ব্যয়ে নিশ্চিত করার জন্য ইউনিয়নে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়।

সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য যেসব পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। প্রশ্ন হচ্ছে, থানা বা উপজেলা এবং ইউনিয়নে যেসব কেন্দ্র চালু ছিল, সেগুলো সুসংহত না করেই নতুন নামে কমিউনিটি ক্লিনিক কেন? এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন, ১৯৯৬-২০০১ সময়ে যে সরকার কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করে সরকারিভাবে তা কার্যকর করার চেষ্টা করেছিল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে, তা স্থায়ী হয়নি। তবে ভিন্ন রাজনৈতিক দল ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর কমিউনিটি ক্লিনিক বিলুপ্ত না করে এগুলোকে কার্যকর করার জন্য এনজিওদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছিল। ২০০১ সালের পর থেকেই সরকার ও দাতাগোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে নগর স্বাস্থ্যসেবা সুসংহত করার লক্ষ্যে নগরভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে চালু করা হয়। ২০০৯ সালে প্রণীত হয় নগর স্বাস্থ্যসেবা কৌশল। এ কৌশলপত্রেও সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে নগর স্বাস্থ্যসেবা কৌশল কতটুকু বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। ২০১০ সালে প্রণীত নগর স্বাস্থ্য কৌশলে একটি নতুন বিষয়ের প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। তা হলো, চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটানোর কারণে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে পতিত হচ্ছে। ওই সময়ে চিকিৎসার সিংহভাগ ব্যয়ভার রোগী নিজের খরচে মেটানোর কারণেই এ সংক্রান্ত ব্যয়ভার ও দারিদ্র্যের কারণের যে সম্পর্ক, সে বিষয়ে গত ৭ এপ্রিল একটি দৈনিকে খবর প্রকাশ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালে প্রণীত নগর স্বাস্থ্যসেবা কৌশল প্রতিবেদনেও একই মত ব্যক্ত করা হয়েছিল। আজ দশ বছর পর গবেষণাভিত্তিক ফল একই কথা বলেছে। তবে ২০১০ সালের মতামতের উৎসও ছিল দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের সম্পর্ক নিয়ে। বাংলাদেশের গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘এখানে চিকিৎসার ৬৭ শতাংশ খরচ টানে রোগী।’ এর ফলে বছরে চার শতাংশ ব্যক্তি নিঃস্ব হচ্ছে। ২০১০ সালে প্রকাশিত বইটির শিরোনাম- ‘একটি রোগ দূরে :মানুষ কেন গরীব হয় এবং এ অবস্থান থেকে কিভাবে মুক্ত হয়’, ÔOne illness away why people become poor and how they escape poverty.Õ ‘ অনিরুদ্ধ কৃষ্ণা নামে একজন গবেষকের নেতৃত্বে আলোচ্য গবেষণা পরিচালিত হয় ভারত, কেনিয়া, উগান্ডা ও পেরুতে। সময় ব্যয় করা হয় প্রায় দশ বছর। এসব দেশের পরিবারভিত্তিক বাস্তব অভিজ্ঞতা এ গবেষণাকে সমৃদ্ধ করেছে। গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে গবেষক প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছেন যে, উন্নত ও অনুন্নত দেশে বহু সংখ্যক জনমানুষ চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে দারিদ্র্যের বৃত্তে পতিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ দিয়ে গবেষক মতপ্রকাশ করেছেন, উচ্চ আয়সম্পন্ন এ দেশেও চিকিৎসা ব্যয় ও দারিদ্র্যে পতিত হওয়া হ্রাস পায়নি। চীনের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, উচ্চহারের প্রবৃদ্ধি এ দেশেও নব্য ধনিক শ্রেণির জন্ম দিয়েছে বটে; তবে একই সঙ্গে নতুন দরিদ্র শ্রেণিও জন্ম নিয়েছে। ভারত সম্পর্কেও গবেষক একই মত পোষণ করেন।

দারিদ্র্যের সৃষ্টির (creation of poverty) সমীকরণে চিকিৎসা ব্যয় ও দারিদ্র্যের সম্পর্ক ইতিপূর্বে স্থান পায়নি। এ সম্পর্কে গবেষক বলেছেন, সরকারসহ বিদেশি সাহায্য দাতাগোষ্ঠী, বেসরকারি ও অন্যান্য সংস্থা সবসময় দরিদ্র জনমানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে ব্যস্ত। অথচ নতুনভাবে দারিদ্র্যের বৃত্তে পতিত হওয়ার বিষয়ে কোনো চেষ্টাই করা হয়নি বা হচ্ছে না। সরকারি নীতিতেও এ বিষয়টি স্থান পায়নি। ভবিষ্যতে দারিদ্র্য দূরীকরণের বিষয়ে আলোচ্য অভিমতে বলা হয়েছে যে, এর জন্য জনমানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রতিটি মুহূর্তের অভিজ্ঞতা জানার চেষ্টা করতে হবে। কারণ স্থানভিত্তিক দারিদ্র্য সম্পর্কিত জ্ঞান দারিদ্র্য নির্মূলের সহায়ক শক্তি। এ জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে কার্যকর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

বর্তমান বছরের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে সমতা ও সংহতিনির্ভর সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বলতে কী বোঝায়, তা সম্পূর্ণ পরিস্কার নয়। তবে এর অর্থ যদি এই হয় যে, ধনী ও দরিদ্র উভয় শ্রেণির জন্য সমতা ও সংহতিনির্ভর সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে, তাহলে বলতে হয় যে, বাস্তবচিত্র বাংলাদেশে ভিন্ন রূপ। স্বাস্থ্যসেবার জন্য ধনিক শ্রেণি হয় বিদেশে অথবা ঢাকার নামিদামি বেসরকারি হাসপাতালের সেবা গ্রহণ করে। এটাই হলো বাস্তবতা। এর অর্থ এই নয় যে, স্বাস্থ্যসেবার কোনো গুরুত্ব নেই।

বাংলাদেশে নব্বই দশকের পর এ ক্ষেত্রটি যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। তবে স্থানীয় পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে এ সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর যে চেষ্টা শুরু করা হয়েছিল, তা টেকসই হয়েছে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করা যায়। এ বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

উৎস: সমকাল

শেয়ার করুন