মোদি ম্যাজিক ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

ড. তারেক শামসুর রেহমান

ভারতে সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তথা এনডিএ জোটের ‘বিশাল’ বিজয় অনেক প্রশ্ন এখন সামনে নিয়ে এসেছে। এক. ভারতের মানুষ নরেন্দ্র মোদির ওপর আবারও আস্থা রেখেছে। এর পেছনে কাজ করেছে মোদির রাজনীতি। একদিকে যেমনি তিনি ‘হিন্দুত্ব কার্ড’ ব্যবহার করেছেন, অন্যদিকে তেমনি উন্নয়ন আর অর্থনীতিকে একত্রিত করে নতুন এক রাজনীতি উপহার দিয়েছেন, যা মানুষ গ্রহণ করেছে। এই উন্নয়ন আর অর্থনীতিকে বলা হচ্ছে ‘মোদিনোমিকস’ (গড়ফরহড়সরপং)। মোদির গত ৫ বছরের জমানায় অর্থনীতির ক্ষেত্রে যেসব পরিবর্তন এসেছে, তার কিছু পরিসংখ্যান দেওয়া যেতে পারে। ভারতের অর্থনীতির আকার এখন ২ দশমিক ৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এই অর্থনীতি ভারতকে বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত করতে যাচ্ছে। ব্রিটেনকে টপকে যাবে।

পরিসংখ্যান বলছে, মোদির জমানায় ৫৯৭৪৬৪ গ্রামকে বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে। ভারতের সাধারণ মানুষ টয়লেট ব্যবহারে অভ্যস্ত নয়। Swachh Bharat Abhiyaan প্রকল্পের আওতায় ৯ দশমিক ৫৬ কোটি টয়লেট তৈরি করা হয়েছে। মুদ্রাস্ম্ফীতি ২০১৫ সালে যেখানে ছিল ৫.৯ ভাগ, ২০১৮ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩.৪ ভাগে। ১ দশমিক ৯ লাখ কিলোমিটার সড়ক তৈরি করা হয়েছে। Pradhan Mantri Ujjwala Yojanna পরিকল্পনার আওতায় ৫ কোটি লোককে দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে তুলে আনা হয়েছে। ৩৩ কোটি এলইডি বাল্ক্ব সরবরাহ করা হয়েছে, যাতে সাশ্রয় হয়েছে ১৭ হাজার কোটি রুপি। অর্থনীতির এই পরিসংখ্যান আরও দেওয়া যায়। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, মোদি অর্থনীতি ও উন্নয়নকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, কংগ্রেসের নির্বাচনী ইশতেহারে এই দিকটা ছিল উপেক্ষিত। (দেখুন Samju Verma প্রবন্ধ Lok Sabha Exit Polls 2019 : Why India Has Voted for Modinomics, Daily O, 21 May, 2019)। দুই. বিশ্বজুড়েই দক্ষিণপন্থি কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিকাশ ঘটেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ (২০১৭) ও তার রাজনীতি যে কট্টরপন্থি একটি ধারার সূচনা করেছিল, তা ইউরোপকে স্পর্শ করে এখন ভারতের মাটিও স্পর্শ করল। মোদি এই কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে যোগ করেছেন।

ধর্ম আর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মিশ্রণে তিনি নতুন এক রাজনীতির সূচনা করেছিলেন, যা সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেছে। তিন. মোদির ব্যক্তিগত ক্যারিশমার কাছে রাহুল গান্ধীর পারিবারিক ঐতিহ্য ধুলোয় মিশে গেছে। রাহুল গান্ধী কোনো অবস্থাতেই মোদির বিকল্প ছিলেন না। উপরন্তু মোদি ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত (২০১৯) অর্থাৎ নির্বাচনের আগে ১ দশমিক ৫ লাখ কিলোমিটার ভ্রমণ করেছেন ও ১৮২টি নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন। একই সঙ্গে অমিত শাহ ভ্রমণ করেছেন ১.৫৮ লাখ কিলোমিটার আর ভাষণ দিয়েছেন ১৬১টি নির্বাচনী জনসভায়। মোদি-অমিত শাহ জুটির কাছে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা জুটি ছিলেন অনুজ্জ্বল। রাহুল-প্রিয়াঙ্কার বাইরে অন্য কোনো সিনিয়র কংগ্রেস নেতাকেও এভাবে গ্রামে গ্রামে যেতে দেখা যায়নি। চার. আমেথিতে রাহুল গান্ধীর পরাজয় পারিবারিক রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান কি-না, তা এই মুহূর্তে হয়তো বলা যাবে না। কিন্তু এটা রাহুল গান্ধীর জন্য যে একটা ‘শিক্ষা’, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কংগ্রেসের হাল ধরার জন্য একজন বিকল্প নেতার প্রয়োজন কি-না- এই প্রশ্নটি আবার সামনে চলে এলো। পাঁচ. পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যও একটি ‘শিক্ষা’। ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধান সভার পরবর্তী নির্বাচন।

লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল (তৃণমূল ২২, বিজেপি ১৮, কংগ্রেস ২) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যে বড় দুশ্চিন্তায় ফেলে দেবে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। নির্বাচনী প্রচারণায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আচরণ সঙ্গত ছিল না। তিনি যে ভাষায় দিনের পর দিন মোদিকে আক্রমণ করেছেন, যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা শোভন ছিল না। প্রতিউত্তরে মোদির আচরণ ছিল ভদ্রজনোচিত। তিনি কোনো অভদ্র আচরণ করেননি। অশোভন বক্তব্যও দেননি। সাধারণ মানুষ এটা গ্রহণ করেছে বলে আমার ধারণা। এ ক্ষেত্রে বামদের ভোটও এবার বিজেপি পেয়েছে। বামেরা তৃণমূল কংগ্রেসের পরিবর্তে বিজেপিকেই বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এটা একটা ব্যর্থতা। তিনি বিজেপিকে ঠেকাতে বামেদের সঙ্গে কোনো সখ্য গড়ে তুলতে পারেননি। প্রচণ্ড অহঙ্কারী মমতা তৃণমূল কংগ্রেসে দ্বিতীয় কোনো নেতৃত্ব তৈরি করেননি। তৃণমূলের স্ট্র্যাটেজিতেও ভুল আছে। পুরুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তৃণমূল নেতাদের ‘শর্টমানি’ নেওয়া, তফসিলি জাতি-উপজাতি ও মাতুয়াদের ভোট না পাওয়া, দলীয় কোন্দল পরাজয়ের অন্যতম কারণ হলেও লোকসভা ভোটের ফলাফল প্রমাণ করল, বিজেপি এখন আর পশ্চিমবঙ্গে কোনো প্রান্তিক শক্তি নয় বরং শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের চ্যালেঞ্জার হিসেবে বিজেপি প্রবলভাবে উঠে এসেছে। ছয়. লোকসভা নির্বাচন প্রমাণ করল, ভারতে বাম রাজনীতি এক রকম পরিত্যক্ত। শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয় বরং কেরালাতেও বাম রাজনীতির আবেদন তেমন একটা নেই।

অর্থাৎ একসময় যে বামফ্রন্টকে ভারতে বিকল্প শক্তি হিসেবে চিন্তা করা হতো, সেই বাম রাজনীতির সমর্থকরা এখন গেরুয়া শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে যেখানে বিজেপির ভোট বেড়ে ভোটপ্রাপ্তির হার দাঁড়িয়েছে ৪০.২৩ ভাগে, সেখানে বামদের ভোট নেমে এসেছে ৭.৫২ ভাগে। এর আগের লোকসভা ভোটে বামফ্রন্ট পেয়েছিল ২৬ ভাগ ভোট। বিজেপির ভোট তখন ছিল মাত্র ১০.১৬ ভাগ। অনেকেই মনে করছে, বামেদের যে ১৫ ভাগ ভোট ক্ষয় হয়েছে, তার সবটাই ঘরে তুলেছে বিজেপি (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩ মে)। পাঠকদের আরও কিছু তথ্য দিই। ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা নির্বাচনে ১৯৮০ সালে বামফ্রন্ট সর্বোচ্চ ৩১টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল। ২০০৪ সালেও ছিল ২৯ আসন। এরপর কমতে থাকে। ২০১৪ সালে মাত্র ২ আসন। আর ২০১৯ সালে একটি আসনও পেল না বামেরা। উগ্র দক্ষিণপন্থি ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর কাছে বাম রাজনীতির এই পরাজয় নিশ্চয়ই বাম নেতাদের জন্য চিন্তার খোরাক জোগাবে, কেন তারা পরাজিত হলেন! বামদের জন্য দরকার এখন ‘নয়া রাজনীতি’। বিশ্বব্যাপীই সনাতন ট্র্যাডিশনাল মার্কসবাদী রাজনীতি আর নেই। চীন, ভিয়েতনামেও মার্কসবাদ একরকম পরিত্যক্ত। ‘সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি’র নামে যে ‘রাজনীতি’ তারা গ্রহণ করেছে, তা একুশ শতকে মার্কসবাদী চিন্তা-চেতনায় নতুন একটি দিক উন্মোচন করেছে।

ভারতে বামেরা নিশ্চয়ই এই রাজনীতি থেকে শিখবে। লোকসভা নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি কেন, এটা নিশ্চয়ই এখন তারা উপলব্ধি করতে পারবেন। সাত. লোকসভা নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের মধ্যে অনৈক্য বিজেপিকে কিছুটা সুবিধা করে দিয়েছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। শেষ মুহূর্তে এসে অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু কংগ্রেসসহ প্রধান প্রধান বিরোধী দলকে এক পতাকাতলে আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কংগ্রেস, তৃণমূল, বহুজন সমাজবাদী দল, সমাজবাদী দল, আমজনতা পার্টি, এমনকি বামেদের নিয়েও একটা ঐক্যের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভোটের ফলাফলে তাতে কোনো প্রভাব ফেলেনি। এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালেও তাদের সঙ্গে অনৈক্য ছিল প্রবল। উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী ও বহুজন সমাজবাদী পার্টি একটি জোট করলেও কংগ্রেস আলাদাভাবে নির্বাচন করেছে। এর ফল ঘরে তুলেছে বিজেপি। লোকসভায় সবচেয়ে বেশি আসন উত্তরপ্রদেশে, আসন সংখ্যা ৮০। রাজ্য শাসন করছে বিজেপি। এখানে মায়াবতী (বহুজন সমাজ পার্টি) ও অখিলেশ যাদব (সমাজবাদী পার্টি) একজোট হলেও লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে ভালো করেছে বিজেপি। তারা পেয়েছে ৫০ আসন। এখন চন্দ্রবাবু নাইডুর সব উদ্যোগও ভেস্তে গেছে। লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের (অন্ধ্রপ্রদেশ) ২৫টি আসনে তার দল (তেলেগু দেশম) হেরে গেছে। বিজয়ী হয়েছে ওয়াইএসআর কংগ্রেস ২২টি আসন পেয়ে। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন জগমোহন রেড্ডি। বাবা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী (২০০৯) রাজশেখর রেড্ডি (একসময় যিনি কংগ্রেসে ছিলেন) পদাঙ্ক অনুসরণ করেই জগমোহন রেড্ডি বিধান সভার নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে এখন হতে যাচ্ছেন অন্ধ্রপ্রদেশের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। বিধানসভায় তার দল ওয়াইএসআর কংগ্রেস পেয়েছে ১৫০ আসন। চন্দ্রবাবু নাইডু পদত্যাগ করেছেন। ৩০ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন জগমোহন রেড্ডি (জগন)। নয়াদিল্লির এনডিএর মন্ত্রিসভায়ও যোগ দিতে পারে জগনের দল।

২০১৪ সালে যে ‘মোদি ম্যাজিক’ নরেন্দ্র দামোদর এস মোদিকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, সেই ‘মোদি ম্যাজিক’ই তাকে আবারও ক্ষমতায় নিয়ে এলো। তার এই ক্ষমতায় ফিরে আসা ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য কতটুকু মঙ্গলজনক! এ নিয়ে অনেকে মন্তব্য করেছেন। একজন ভারতীয় লেখক ও সাংবাদিক অতীশ তাছির বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনে লিখিত একটি প্রবন্ধে মন্তব্য করেছেন এভাবে- of the great democracies to fall to Populism, India won the first. উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির (পপুলিজম) কাছে গণতন্ত্রের হেরে যাওয়া। একজন নরেন্দ্র মোদি তার উগ্র ধর্মান্ধ রাজনীতি আর সাম্প্রদায়িক কার্ড ব্যবহার করে (রামমন্দির নির্মাণের প্রতিশ্রুতি) ভারতীয় গণতন্ত্রকে কতদূর নিয়ে যেতে পারবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন।

অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক

উৎস: সমকাল

শেয়ার করুন