মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক হাইকোর্টের রায় যুক্তিসঙ্গত

আহমদ রফিক

বেশ কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করছি, বাংলাদেশে নাগরিকদের ন্যায়বিচার ও নীতিনিষ্ঠ অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে শেষ আশ্রয় বা শেষ নির্ভর হয়ে দাঁড়িয়েছেন দেশের উচ্চ আদালত তথা হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট। শাসনযন্ত্র যখন কোনো ভুল বা বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্ত নিয়ে তা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয় তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিচার-বিবেচনা না করে, তখনও ন্যায়নীতির একমাত্র ভরসা ওই উচ্চ আদালত।

গত কয়েক বছরে আরও লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশের উচ্চ আদালত স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে নানামাত্রিক সামাজিক অন্যায় বা লোভ-লালসাতাড়িত জবরদখলের ক্ষেত্রে ন্যায়ানুগ নির্দেশনা দিচ্ছেন। যেমন শীতলক্ষ্যায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ অনুরূপ ঘটনা দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশে ধনী-অতিধনী, প্রতাপশালী বা প্রভাবশালী কারও কারও অন্যায়-অবৈধ আচরণের বিরুদ্ধে তাই ভরসা উচ্চ আদালত।

অনেক সময় দেখা গেছে, আদালতের ন্যায়সঙ্গত নির্দেশনা কার্যকর হয় না বা হলেও পরে তা যথাপূর্বম তথা পরম অবস্থায় এসে ঠেকে। উদাহরণস্বরূপ, আবারও ওই শীতলক্ষ্যার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরাদিতে দেখা গেছে, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ক’দিন পরই অবস্থা আগের সেই। প্রশাসন আর ফিরে তাকাচ্ছে না বা তাকানোর সময় পাচ্ছে না।

বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকবার লিখেছি, অন্য কাউকেও লিখতে দেখেছি। সেসব কথার সারমর্ম হচ্ছে, বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বহু ক্ষেত্রে অসহায়ের সহায় বা পরিত্রাতার ভূমিকায়। গতকাল (বুধবার) হঠাৎ করেই তেমন একটি সংবাদ প্রকাশ পেয়েছে অধিকাংশ পত্রপত্রিকায় প্রথম পাতায় প্রথম শিরোনামে। বিষয়টি মুক্তিযোদ্ধাদের নূ্যনতম বয়স নিয়ে সরকারি বা বিশেষ সংস্থার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রায়।

শিরোনামগুলো প্রায় একই ধরনের, যেমন ‘মুক্তিযোদ্ধার নূ্যনতম বয়স নির্ধারণ অবৈধ’। অন্য একটিতে বলা হয়েছে :’মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি বয়সের ফ্রেমে নয়’। এ বিষয়ে আরেকটি শিরোনাম, ‘মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির নূ্যনতম বয়সের গেজেট বাতিল’। একই রকম শিরোনাম : ‘মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির পরিপত্র বাতিল’। শেষোক্ত শিরোনামে যুক্ত হয়েছে হাইকোর্টের বক্তব্য :’মুক্তিযোদ্ধাদের বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না’।

দুই

মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে ১৯৭১ সালে। দীর্ঘদিন পর হঠাৎ করে মুক্তিযোদ্ধার বয়স বিষয়ক সংজ্ঞা নির্ধারণের কী প্রয়োজন পড়ে গেল, তা বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। তবে এমনটি সম্ভব যে, সরকার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অনুপ্রবেশ বন্ধ করার জন্য এমন একটি পদক্ষেপ নিয়ে থাকতে পারে। আমরা জানি, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিষয়টি সম্প্রতি নয়, ১৯৭২ থেকেই নানাভাবে সামাজিক জাল-জুয়াচুরির মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, যাদের ব্যঙ্গ করে বিশেষ ব্রিগেড নামে চিহ্নিত করা হয়।

আমরা কেউ চাই না মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নকল যোদ্ধার অনুপ্রবেশ ঘটুক। এটা শুধু সরকারের জন্য বা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের জন্যই নয়, সবার জন্য, জাতির জন্য লজ্জাজনক ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি আলোচিত হলেও এ বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

সময়ের এক ফোঁড় হিসেবে সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন এবং প্রণীত তালিকা যাচাই-বাছাই খুব কঠিন ছিল না। এমনকি যথাযথ পদ্ধতি অবলম্বনে, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশে কঠোর শ্রমে, দীর্ঘ সময় নিয়ে হলেও এখনও তা সম্ভব। বাংলাদেশের শাসনযন্ত্রে যখন মুক্তিযাদ্ধা বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয়ও রয়েছে, তখন তাদের দায়িত্বে কাজটি সঠিকভাবে করা যেতেই পারে।

কিন্তু তার বদলে মুক্তিযোদ্ধার নূ্যনতম বয়স নির্ধারণ করে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা তৈরি পদ্ধতিগত দিক থেকে সঠিক বলে আমাদের মনে হয় না। কে বলতে পারে- সরকার বা সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত বয়সসীমার বহির্ভূত কোনো মুক্তিযোদ্ধা ছিল না বা নেই বা থাকতে পারে না। এমন কথা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন বলে মনে হয় না। বাস্তব ঘটনা সত্যি ভিন্ন।

আমরা কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না, কী ভেবে কোন যুক্তিতে মুক্তিযোদ্ধার নূ্যনতম বয়স ১৩ বা সাড়ে ১২ বছর নির্ধারণ করা হলো? এ বয়স-সংজ্ঞা নির্ধারণের আগে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিরা কি মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই করে দেখে নিয়েছেন যে, ১২-১৩ বছর বয়সের কম বয়সী কোনো মুক্তিযোদ্ধা নেই বা ছিল না!

আর সে জন্যই আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, একাত্তরের বাস্তব তথ্যাদি না জেনে এই বয়সসীমা নির্ধারণ বিচক্ষণতার পরিচায়ক নয়। তত্ত্বগত বিচারে ও পদ্ধতির দিক থেকে এটা সঠিক নয়। স্বভাবতই ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধাদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং উচ্চ আদালতে রিট আবেদন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের রায়, যা ইতিপূর্বে দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম উল্লেখে স্পষ্ট করা হয়েছে।

অর্থাৎ হাইকোর্ট এ পদক্ষেপ অবৈধ বিবেচনা করেছেন। শুধু তাই নয়, তাদের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে : ‘মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বন্ধ রাখা অবৈধ।’ তারা ‘৬০ দিনের মধ্যে বন্ধ ভাতা পরিশোধের নির্দেশ’ দিয়েছেন। আদালত এ বিষয়ে সরকার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে জারি করা পরিপত্র ও গেজেট বাতিল ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইনের ধারাবিশেষও অসাংবিধানিক বলে মন্তব্য করেছেন। অবশ্য সরকার এ নির্দেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবে বলে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

কেন এ যুক্তিহীন জেদ? তারা ভেবে দেখতে পারেন যে, বাস্তব তথ্য তাদের নির্ধারিত নূ্যনতম বয়সসীমার বিপরীত। উদাহরণ হিসেবে আদালত বীরপ্রতীক শহিদুল ইসলাম লালুর কথা উল্লেখ করেছেন (বয়স ১০ বছর)। অনুরূপ বয়সের মুক্তিযোদ্ধা আরও থাকতে পারেন- এমন বক্তব্য উচ্চ আদালতের।

স্বভাবতই একাধিক সময়ে সরকারের বিভিন্ন বয়সসীমায় মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ বাস্তবধর্মী বলে মনে করেননি হাইকোর্ট। আমরাও বলেছি, আবারও বলি, মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক, পুরো তালিকা প্রণয়ন না করে কেউ হলফ করে বলতে পারবেন না যে, ১৩-১২ বছরের কম বয়সী কোনো মুক্তিযোদ্ধা নেই।

তিন

আদালত ঠিকই মন্তব্য করেছেন যে, মুক্তিযোদ্ধাকে কোনো নির্দিষ্ট বয়সের ফ্রেমে বেঁধে দেওয়া যায় না। বিশ্বজুড়ে উপনিবেশ বা পরাধীন দেশে মুক্তিসংগ্রামের পেছনে যে আবেগ ধৃত, সেই টানে অল্প বয়সী কিশোরদেরও দেখা গেছে মুক্তিসংগ্রামে অংশ নিতে; সংগ্রামের ধরনটা এমনই দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে। সবাইকে যে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করতে হবে, তা তো নয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও এমন উদাহরণ রয়েছে।

আমরা আদালতের এমন মন্তব্যও ঐতিহাসিক গুরুত্বে গ্রহণ করতে পারি যে, ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাত-আট বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধাও ছিল।’ ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশ। শিশু-কিশোরদের সাহায্যে গুরুত্বপূর্ণ খবর আদান-প্রদান রণাঙ্গনের একটি সর্বজনগ্রাহ্য সর্বজনীন বিষয়।

সবকিছু মিলিয়ে আমাদের মনে হয়, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়নে কোনো কর্তৃপক্ষের দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধার বয়সসীমা নির্ধারণ অবাস্তব পদক্ষেপ বৈ আর কিছু নয়। দরকার হলো, তালিকা নির্ধারণে সঠিক তথ্যের আদান-প্রদান এবং তথ্যের সত্যতা সম্বন্ধে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া। তাতে করে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অনুপ্রবেশ বন্ধ এবং সঠিক তালিকা প্রণয়ন সম্ভব। আগ বাড়িয়ে বয়সসীমা নির্ধারণ বরং সঠিক তালিকা প্রণয়নের পরিপন্থি বলে আমরা মনে করি।

সেক্ষেত্রে হাইকোর্টের বর্তমান রায়টি আমাদের বিবেচনায় সঠিক বলে মনে হয়। এ রায় চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তাতে সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনমনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে।

ভাষাসংগ্রামী, প্রাবন্ধিক, কবি, রবীন্দ্র গবেষক

উৎস: সমকাল

শেয়ার করুন