‘পরিবহন ধর্মঘট’ নাকি দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর ছুঁতো?

শুয়াইব হাসান :: সাত দফা দাবিতে সোমবার (২৯ এপ্রিল) সকাল-সন্ধ্যা ‘কর্মবিরতি’ (প্রকৃতপক্ষে- ধর্মঘট) পালনের ঘোষণা দিয়েছেন সিলেট বিভাগের পরিবহন শ্রমিকরা। এ নিয়ে জনমনে অস্বস্তি থাকলেও কিছু করার নেই। কারণ, জনগণের কথায় কারো কিছু যায়-আসে না। পথে-প্রান্তরে, হাটবাজারে, চায়ের দোকানে লোকমুখে নানা কথা শুনেছি। আমার মনেও এ নিয়ে কিছু সুক্ষ্ম প্রশ্ন আছে-

প্রথমত, যানবাহন বন্ধ হলে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস কিভাবে বন্ধ হয় সে বিষয়ে স্বয়ং আন্দোলনকারীদের অভিজ্ঞতা আছে। তাদের নিজেদের রুটি-রুজিতেও প্রভাব ফেলে। নিজেদের কর্মসূচির কারণে হয়তো এটা অনুভব নাও হতে পারে। সাধারণ মানুষকে কতটা বিপদে ফেলবেন সেটা তাদের ভাল জানা। আজ আরেকটা তথ্য পেলাম একজন সিএনজি-অটোরিকশা চালকের কাছ থেকে- ‘যারা গাড়ি নিয়ে বের হলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা গুণতে হবে’! চালকদের বের হতে না দেওয়ার জন্য এমন কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ।

দ্বিতীয়ত, আজ এইচএসসি পরীক্ষা। এ অবস্থায় কর্মবিরতি বা ধর্মঘট কর্মসূচি, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিঘাত বা শাস্তিস্বরূপ নয়তো? নতুবা, কর্মবিরতির জন্য এমন দিন বেছে নেওয়ার কারণ কী?

তৃতীয়ত, গত ২৩ মার্চ শেরপুরে সিলেট কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ঘোরী মো. ওয়াসিমকে বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হয়। এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দেয়া উদার পরিবহনের একটি বাসের চালক ও হেলপারের জন্য মায়াকান্না দেখাতে আজকের ‘কর্মবিরতি’। মামলার ধারা পরিবর্তনের দাবি পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের! অপরাধীকে বাঁচানোর জন্য মানুষকে জিম্মি করার পথ বেঁছে নেয়া কি অন্যায় নয়?

চতুর্থত, রমজান নিকটবর্তী। গণিতের পরিভাষায়- ‘আমরা জানি, পবিত্র রমজান এলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়!’ কিন্তু, গত দু’এক বছরধরে সরকারের প্রশাসন ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর কিছু পদক্ষেপের কারণে মূল্যবৃদ্ধির গতি কিছুটা হৃাস পেয়েছে। অঙ্কের হিসেব এখন কিছুটা পাল্টে গেছে। সরকারের মন্ত্রী-আমলাদের কড়া হুঁশিয়ারির কারণে এখন ব্যবসায়ীরা ছুঁতো খুঁজে বেড়ান। কিছু পেলেই হলো বুঝি! ধর্মঘট, সংকট, গাড়িভাড়া প্রভৃতি কারণ দেখিয়ে মূল্যবৃদ্ধি করবেন-ই।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশী গত ১৮ এপ্রিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিংয়ের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তার দু’দিন আগে থেকে সিলেট চেম্বার নেতৃবৃন্দ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে বাজার মনিটরিংয়ে নেমেছেন। এ অবস্থায় সিলেটের বাজার অবস্থিতিশীল করার সুযোগটা করা যাবে কীভাবে তা নিয়ে নিশ্চয়ই মাথা ব্যাথা অনেকের।

তাই, আজকের ধর্মঘট নিয়ে সকল খোলা প্রশ্নের মাঝে মনে জাগ্রত সুক্ষ্ম প্রশ্নটা আমি রাখতে চাই। যেহেতু, পরিবহন শ্রমিক-মালিক নেতৃবৃন্দ সিলেটের বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। অথবা, ধরে নিলাম- আপনারা ব্যবসা-বাণিজ্যে নেই। তাহলে রমজানের ঠিক একসপ্তাহ আগে কর্মবিরতি তথা ধর্মঘটের ডাক দেওয়ার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী? আর যদি এমন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য না হয়, তবে বিরোধী দলের মতো রাজনৈতিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য আপনাদেরকে বাহবা দিতেই হয়!

আজ সোমবার সকাল-সন্ধ্যা কর্মবিরতি পালন করবেন। আপনাদের ঘোষণা অনুযায়ী, কর্মবিরতি চলাকালে সড়কে কোনো পিকেটিং হবে না এবং অ্যাম্বুল্যান্স ও প্রাইভেট গাড়ি কর্মবিরতির আওতার বাইরে থাকবে। কিন্তু, এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য কিছু বলেননি। যানবাহন সংকট দেখা দেবে নিশ্চয়ই। এ নিয়ে একদিন আগে থেকেই শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

পরিবহন ধর্মঘট শুরু হওয়ার মাত্র ৭ ঘন্টা আগে নগরীর একটি বাজারে মোবাইল রিচার্জ করতে গিয়েছিলাম। দোকানদার ব্যক্তি একজন গাড়ি চালককে প্রশ্ন ছুঁড়ে বললেন, রোগীবাহী গাড়ি ছেড়ে দেবেন, ব্যক্তিগত গাড়ি আটকাবেন না। সবই মানলাম। আমার ভাই কাল (সোমবার) বিয়ে করবে! ব্যক্তিগত গাড়ি নেই, তাহলে কি বিয়ে থেকে আজ বিরত থাকবে?

তবুও, আশায় বসে আছি- ১২ ঘন্টার সংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক হবে সিলেটবাসীর জীবনযাত্রা। অতীতের যেমন চালকের মুখে কালো কালি লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল, গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার অপরাধে। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেনো না হয়। শিক্ষার্থীরা যেনো ভালভাবে পরীক্ষা দিতে পারে। পঞ্চাশ-একশ’ টাকা রুজি করে কোন চালককে যেনো পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা গুণতে না হয়।

লেখক : সংবাদকর্মী

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিলেটের সকাল-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সকাল কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

শেয়ার করুন