আমার দু’শো টাকার শিক্ষক যতীষ স্যার

জুনায়েদুর রহমান :: ২০০৮ সালে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়েছি কানাইঘাটের দূর্গাপুর হাই স্কুলে। বীজগণিত সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না, গ্রামারে Article এর A, An, The পর্যন্ত জ্ঞান ছিল। প্রাইভেট পড়ার জন্য তখন স্যার খুঁজছিলাম, পরিবার আমার পড়াশোনার ব্যাপারে উদাসীন। স্কুলে হাতে বই নিয়ে গিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেই সবাই মনে করতো অনেক কিছু শিখে গেছি। তখন মনে পড়ে আমার ব্যাগও বোধহয় ছিল না। যখন স্কুল থাকতো না, সারাদিন খেলে সন্ধ্যে বেলা ঘরে ফিরলেই চলতো। এরকম একটা পরিবেশ ছিল আমার চারপাশে। তখন সবচেয়ে সস্তায় প্রাইভেট পড়াতেন যতীষ স্যার। পুরো নাম যতীষ চন্দ্র দে। নিজেই খুঁজে নিলাম তাকে।

আমি আমার স্কুল জীবনে একবারই ফেইল করেছিলাম, সেটা ক্লাস সিক্সের প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ইংরেজি ২য় পত্রে। ওই যে বলেছিলাম গ্রামারে জ্ঞান ছিল A, An, The. এটুকু জ্ঞান দিয়ে ইংরেজি ২য় পত্রে পেয়েছিলাম ২৬। আর গণিতে পেয়েছিলাম ৮৬, গণিতে কেনো ৯৯ পেলাম না তার জন্য স্যারের বকা খেতে হয়েছিল। তখনই স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়া শুরু করলাম। স্যার এতটা গুছালো কখনো ছিলেন না তাই তাঁর কাছে ভালো ছাত্র কিংবা বিত্তবানরা পড়তে আসতো না, আসতো আমার মতো উদাসীনরা। কারণ স্যারের কাছে পড়লে ফাঁকি দেওয়া যায়, বেতন না দিলেও চলে। আমি যখন স্যারের কাছে পড়তে শুরু করি তখন স্যারের মধ্যে একজন প্রকৃত শিক্ষকের ছায়া অনুভব করি। কারণ একজন শিক্ষকের কাছে তার ছাত্র শুধু পাঠ্য বইয়ের পড়া শিখতে আসে না, আসে মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্তি টুকু অর্জন করতে। স্যারের পড়ানোর ধরাবাঁধা নিয়ম আমি পাইনি তবে পেয়েছি কোনো বিষয় শিক্ষার্থীর ভেতর গেঁথে দেবার আশ্চর্য ক্ষমতা। সে ক্ষমতার বলেই আমি গণিত শিখেছি, শিখেছি গ্রামারের জটিল নিয়ম গুলো সহজভাবে, সবচেয়ে বেশী যা শিখেছিলাম সেটা হলো, ‘আমি পারবো’।

যতীষ স্যার ছিলেন একজন সহজ সরল, সাদা মনের এক মাটির মানুষ। তিনি আমাদের কাছের ছিলেন, ছিলেন হাজারো শিক্ষার্থীর আত্নার আত্নীয়। আমার স্কুল জীবনে স্যারকে আমরা যতো জ্বালাতন করেছি আর কোনো শিক্ষককে এতটা জ্বালাতন করার স্পর্ধা দেখাতে পারিনি। প্রাইভেটে স্যারের কাছে গণিত, ইংরেজি কিংবা যখন যা সমস্যা সবই পড়তাম অথচ তাকে বেতন দিতাম নামে মাত্র দু’শো টাকা। এর মধ্যে স্যারের কাছে অধিকাংশই পড়তো গরীব এবং ফাঁকিবাজ শিক্ষার্থীরা। যাদের কেউই কখনো স্যারের বেতন ঠিকঠাক পরিশোধ করতো না, স্যারও বেতনের জন্য কখনো চাপ দিয়েছিলেন বলে মনে পড়ে না।

সব মিলিয়ে স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়েছি হাতেগুণে কয়েক মাস, স্কুলে পড়েছি তিন বছর। বলতে দ্বিধা নাই এই টুকু সময়েই তিনি আমার সেরা শিক্ষকদের একজন। স্কুলের গন্ডি যখন পেরিয়ে গেলাম তখন হতেই স্যারকে উপলব্ধি করতে শুরু করি। স্যারকে অনেকদিন চা সিগারেট খাইয়েছি, স্যার দেখা হলেই একটা কথা জিজ্ঞেস করতেন- ‘কিতারে ব্যাটা বালা নি?’ বুকের মধ্যে হাহাকার তৈরি হয় যখন মনে হয়, আর তো কেউ এত মায়া নিয়ে কখনো জিজ্ঞেস করবেন না কেমন আছি।

গত বছরের রমজান পরে একদিন ওসমানী মেডিকেল গিয়েছি তখন দূর হতে স্যারকে দেখেছিলাম কলেজ রোডে পরিচিত ভঙ্গিতে পায়চারী করছেন। তাৎক্ষণিক ব্যস্ততায় স্যারের সাথে কথা বলা সেদিন হয়নি, আমি ভেবেছিলাম স্যারের মেয়ে নার্সিং এ পড়ে তাই হয়তো তিনি ওর সাথে দেখা করতে এসেছেন। কে জানতো স্যার মরণব্যাধী ক্যান্সারে আক্রান্ত! এর কিছুদিন পরই স্যারের অসুস্থতার খবরটি ছড়িয়ে পড়ল, আমরা জানলাম আর্থিক অসচ্ছলতায় স্যারের চিকিৎসা সঠিকভাবে হচ্ছে না।

এর পরের ঘটনা সবার জানা, স্যারের হাজারো শিক্ষার্থী যেভাবে স্যারের পাশে দাঁড়িয়েছে সেটা বিরল। আমরা স্যারের চিকিৎসার জন্য গঠন করলাম ‘যতীষ স্যারের পাশে আমরা’ গ্রুপ। এর আহবায়ক ছিলেন শ্রদ্ধেয় ফয়জুর রহমান শামীম ভাইসাব, আমাকে প্রথমে দেওয়া হয়েছিল প্রচারের দায়িত্বে। এই শামীম ভাইসাব আজকে স্যার সম্পর্কে বলছিলেন, ‘১৯৮৬ সালে স্যার ৫০ টাকায় প্রাইভেট পড়াতেন। তখন কখনোও আমি স্যারকে বেতন দেইনি, বিনা বেতনের ছাত্র ছিলাম আমি।’ স্যার তাঁর ৩০ বছরের অধিক দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এভাবে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে বিনে পয়সায় পড়িয়েছেন।

স্যারের চিকিৎসায় সহযোগিতা করার জন্য গঠিত গ্রুপে পরবর্তীতে প্রাথমিক প্রচার এবং আর্থিক কালেকশন শেষ হলে আমি ছিলাম চিকিৎসার সব খোঁজ খবর নেবার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য। স্যারের জন্য যেটুকু করার কথা ছিল তার কিছুই করতে পারিনি। একদিন স্যারকে মেডিনোভায় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গিয়েছি, ডাক্তার দেখানো শেষ হলে স্যার বললেন- ‘ওরে তুই আমার জন্য অনেক কষ্ট করছিস কিছু খা।’ তখন স্যারের কথা রক্ষা করতে তাঁর ছেলেকে নিয়ে কিছু নাস্তা করলাম, স্যার তেমন খেতে পারেননি। তিনি না খেয়ে আমাকে বললেন তুই জোয়ান মানুষ, এগুলোও খেয়ে নেয়। স্যার আমার জন্য এত মমতা পুষে রেখেছেন চিন্তা করে চোখে পানি চলে এলো।

স্যারের ভালোবাসার আমরা ঋণ এক বিন্দুও শোধ করতে পারিনি। তবে স্যারের প্রতি তাঁর শিক্ষার্থীদের যে দায়বদ্ধতা দেখেছি তাতে আমি অভিভূত। তাঁর ফাঁকিবাজ শিক্ষার্থী, বেতন না দেওয়া শিক্ষার্থী, তাকে জ্বালাতন করা শিক্ষার্থীরা তার চিকিৎসার জন্য গ্রুপের মাধ্যমে দিয়েছে ৩৪২৯৪০ টাকা। এর বাইরেও স্যারকে অনেকে ব্যক্তি উদ্যোগে এবং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়েছে। যার অধিকাংশ স্যারের চিকিৎসায় ব্যয় হয়নি, এর আগেই আজ তিনি শোকের সাগরে ভাসিয়ে আমাদের চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

যতীষ স্যারের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। যতীষ স্যাররা শত বছরে একবার জন্মান। যতীষ স্যাররা হন হাজার শিক্ষকের মধ্যে একজন। যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুন স্যার।

উল্লেখ্য, সোমবার (০৮ এপ্রিল) দুপুর ২টার দিকে জৈন্তাপুরের চারিকাটা ইউনিয়নের সরুখেল গ্রামের নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন যতীশ চন্দ্র দে।

[ছবি: ওসমানী মেডিকেল কলেজের রেডিওথেরাপি বিভাগের বারান্দা]

শেয়ার করুন