কোচিং বাণিজ্য বন্ধ, কিন্তু কোচিং?

মাছুম বিল্লাহ

কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগে মতিঝিল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—সে জন্য গত বছর (২০১৮) কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দুদকের এক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ওই নোটিশ দেওয়া হয়। পরে নোটিশ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা-২০১২ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক রিট করেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। ওই রিটের শুনানি নিয়ে গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে নোটিশের কার্যকারিতা চার মাসের জন্য স্থগিতের পাশাপাশি রুলও জারি করা হয়। এরপর ওই আদেশের বিরুদ্ধে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। এরই ধারাবাহিকতায় চূড়ান্ত শুনানি শেষে ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ হাইকোর্ট রায় প্রদান করেন। হাইকোর্টের রায়ের ফলে সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২ কার্যকর হওয়ার কথা। এতে শিক্ষকদের শিক্ষার্থী পড়িয়ে অর্থ আয়ের পথ সীমিত হবে। এ ছাড়া সরকারের এই নীতিমালা সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্যই প্রযোজ্য হবে।

২০১২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা নীতিমালায় বলা হয়, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। এটি একটি চমৎকার নিয়ম। কারণ একজন শিক্ষক যখন অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পড়াবেন, সেটিই প্রকৃত পড়ানো। বর্তমানে যেটি প্রচলিত আছে তা হচ্ছে অনেক শিক্ষক তাঁদের কাছে শিক্ষার্থীদের পড়তে বাধ্য করছেন। এমনকি প্রয়োজন না হলেও শিক্ষার্থীদের পড়তে হবে। আমি রাজউক কলেজে থাকাকালীন কিছু অভিভাবক আমাকে বলতেন, ‘স্যার, রাজউকে ছেলে বা মেয়ে ভর্তি করেছি এই কারণে যে এখানে নাকি পড়াশোনা খুব ভালো হয় এবং প্রাইভেট পড়তে হয় না। কিন্তু ভর্তি করানোর পরে তো সাগরে পড়ে গেছি। এত প্রাইভেটের টাকা আমরা চাকরিজীবীরা কোথা থেকে দেব?’ এটি সব শিক্ষকের ক্ষেত্রে নয়, এমনকি সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও নয়। আর রাজউকের তৎকালীন অধ্যক্ষ কর্নেল নুরননবীও চাইতেন না যে তাঁর কলেজের শিক্ষার্থীরা অযথা শিক্ষকদের কাছে বারো মাস প্রাইভেট পড়ুক। তার পরও বিষয়টি থেকে গেছে।

যাহোক, বিষয়টি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর একধরনের কলঙ্ক লেপন করেছে। কিছু অভিভাবক এমনও আছেন যে বিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছেই বাচ্চাদের পাঠিয়ে থাকেন। কারণ তাঁরা ভালো নম্বর দেন, পাস করিয়ে দেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেন আর তাদের কাছে না পড়লে উল্টো ঘটনা ঘটে। অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে পড়লে এসব ব্যাপার না ঘটার কথা। তাই নীতিমালার বিষয়টি কার্যকর করতে পারলে শিক্ষাক্ষেত্রে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসত, কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি যেটা জাতীয়ভাবে এক ব্যর্থতার প্রতীক। নীতিমালায় আরো বলা হয়, অভিভাবকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে মহানগরী এলাকার প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসে ৩০০ টাকা, জেলা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসে ২০০ টাকা এবং উপজেলা ও অন্যান্য এলাকার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১৫০ টাকা নেওয়া যাবে। অতিরিক্ত এই উপার্জন থেকে ১০ শতাংশ বিদ্যালয়ের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সহায়তাকারী কর্মচারীদের ব্যয় বরাদ্দ রাখা হবে। বাকি টাকা শিক্ষকরা পাবেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ এই অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ কোচিং বাণিজ্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে। কোচিং বাণিজ্য বন্ধে তদারকি করতে মেট্রোপলিটন ও বিভাগীয় এলাকার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে সভাপতি করে ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করা হবে। এ ছাড়া জেলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে এবং উপজেলার ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে আট সদস্যের কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানপ্রধান ইচ্ছা করলে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের এই অতিরিক্ত কোচিংয়ের টাকা কমাতে বা মওকুফ করতে পারবেন। এ ছাড়া নীতিমালা অনুযায়ী অতিরিক্ত ক্লাসের ক্ষেত্রে একটি বিষয়ে মাসে কমপক্ষে ১২টি ক্লাস নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতি ক্লাসে সর্বোচ্চ ৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারবে। নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিকেও কোচিং বাণিজ্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে মনিটরিং কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নীতিমালা না মানলে শিক্ষকের এমপিও স্থগিত, বাতিল, বেতন-ভাতা স্থগিত, বেতনের ধাপ অবনমিতকরণ সাময়িক বা চূড়ান্ত বরখাস্ত অথবা নন এমপিও শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বেতন-ভাতা স্থগিত, বেতনের ধাপ অবনমিতকরণ, সাময়িক বা চূড়ান্ত বরখাস্তের বিধান রয়েছে। আর নীতিমালা ভঙ্গকারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা না নিলে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়াসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অধিভুক্তি বাতিলের কথা বলা হয়েছে। আমরা রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে যেতে পারলে এগুলো কার্যকর করা যেত, কিন্তু আমরা কি তা পারব?

কেউ কেউ বলছেন যে শিক্ষা চলে গেছে কোচিং সেন্টারে। শিক্ষকদের সেখান থেকে ক্লাসরুমে ফিরিয়ে আনতে হবে। এটি এখন সমাজেরও কথা। তাই অনেকে বলছেন, এটি সম্ভব করতে হলে শিক্ষকদের কোচিং নিষিদ্ধ করতে হবে। কোচিং বাণিজ্য বলতে বোঝানো হয়েছে স্কুল বা কলেজ চলাকালে শিক্ষকরা অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর মতো কোনো ধরনের কর্মকাণ্ড করতে পারবেন না। তবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের শিক্ষকদের কোচিং নিয়ে দুদক যে তদন্ত করেছে, সেটাকে হাইকোর্ট এখতিয়ারবহির্ভূত বলেছেন। যেহেতু সেটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, তাই সরকারি কর্মচারীদের জন্য নীতিমালা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং করাতে হলে তাঁদের নিজস্ব পরিচালনা বোর্ড থেকে অনুমতি নিয়ে এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুসরণ করতে হবে। এমনকি বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা কোচিং সেন্টারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই শিক্ষকদের। সরকারি-বেসরকারি কোনো শিক্ষক কোচিং সেন্টারের মালিকও হতে পারবেন না।

আমরা কয়েক বছর ধরেই কোচিং ও প্রাইভেট বেপরোয়াভাবে বেড়ে যাওয়ার কথা শুনছি এবং অনেকেই প্রত্যক্ষও করেছি। ২০১৫ সালে গণসাক্ষরতা অভিযানের গবেষণায় বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ৮৬ শতাংশ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কোচিং করতে হয়। অভিযোগ আছে, শিক্ষকদের অনেকেই শিক্ষার্থীদের চাপ দেন। পড়লে বেশি নম্বর দেন, প্রশ্ন বলে দেন। অভিভাবকরা বিষয়টি বুঝেও যেন বুঝতে চান না। এ অবস্থায় ২০১২ সালে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অনেকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে মনোযোগী না হয়ে কোচিংয়ে বেশি সময় দিচ্ছেন।

যেসব শিক্ষক সারা দিন শুধু প্রাইভেটই পড়ান তাঁরা বাইরের কোনো কিছু পড়েন না, বিষয়জ্ঞান সমৃদ্ধ করা এবং বিশ্বের চারদিকে শিক্ষার কী হাল তা তাঁরা জানার কোনো ধরনের আগ্রহ দেখান না। শিক্ষকতার ক্ষেত্রে এটি গ্রহণযোগ্য নয়, তবে শিক্ষকদের অতিরিক্ত উপার্জন করার ব্যবস্থা থাকতে হবে আর সেটি হতে হবে সৃজনশীল উপায়ে। প্রশ্নপত্র তৈরি, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ, ভিজিটিং টিচার হিসেবে কাজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে এবং শিক্ষকদের অর্থনৈতিক প্রণোদনা থাকতে হবে এসব খাতে।

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক

masumbillah65@gmail.com

উৎস: কালের কণ্ঠ

শেয়ার করুন