ইসলামভীতি মোকাবেলা করতে হবে

এইচ এ হ্যলিয়ের

বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই। নিউজিল্যান্ডে মুসলমানদের ওপর যে হামলা হয়েছে, তা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বা হামলাকারীর মানসিক সমস্যা ছিল বলে আড়াল করা যাবে না। আমি যতটা বুঝি, এই হুমকি ধারণার চেয়ে অনেক গুরুতর এবং একে মোকাবেলা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। যে ধরনের ইসলামভীতি এই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে তাকে শুধু কোনো এক বিচ্ছিন্ন মৌলবাদী ব্যক্তির কাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই ভীতি পশ্চিমের সর্বত্র ছড়ানো—আমাদের অবশ্যই এর মোকাবেলা করতে হবে এবং এক্ষুনি।

ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলাকারী ব্যক্তিকে উন্মাদ হিসেবে প্রমাণ করার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এভাবে চিন্তা করতে পারলে বোধ হয় বিষয়টি সহজ হয়। ওই ব্যক্তি শুক্রবারের নামাজে সমবেত মুলসমানদের ওপর নির্বিচারে গুলি ছোড়ার ভিডিও সরাসরি ফেসবুকে প্রচার করেছেন। টুইটারে ৭৩ পৃষ্ঠার যে ইশতেহার তিনি প্রকাশ করেছেন তা থেকে ঘটনা প্রসঙ্গে তাঁর উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে যায়। ঘটনার পর অবশ্য তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দেওয়া হয়।

যদি আমরা ওই ইশতেহারকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে তা ভুল হবে। তাঁর ইশতেহারের মূল বিষয় ছিল—মুসলমানরা আক্রমণকারী। তারা ইউরোপ ও পশ্চিমে শ্বেতাঙ্গদের সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচয় মুছে দিতে চায়। সন্দেহাতীতভাবে ডানপন্থী অন্যদের সঙ্গেও সংযোগ ছিল হামলাকারী ব্যক্তির। সন্ত্রাসের এ পথে তিনিই প্রথম ব্যক্তি নন। নরওয়েতে ২০১১ সালে একই ধরনের হামলা চালিয়েছিলেন অ্যান্ডার্স ব্রেইভিক নামে এক ব্যক্তি। পশ্চিমা সমাজের দীর্ঘদিনের সংকট এটি। রাজনৈতিক নেতারাও বিষয়টি জানেন।

লন্ডনে ২০০৫ সালের ৭ জুলাই বোমা হামলার পর মৌলবাদের বিষয়ে পর্যালোচনার জন্য একটি সরকারি কমিটির আহ্বায়ক করা হয় আমাকে। এই কমিটির কাজ ছিল, কী কারণে মানুষ চরমপন্থার দিকে ঝোঁকে তা খুঁজে বের করা। আমরা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর ধারণা ও আদর্শের ভূমিকা খতিয়ে দেখি। আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে এগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমরা চরমপন্থী বক্তৃতা ও মতবাদের গুরুত্বকে এড়িয়ে যেতে পারি না। তবে এর সঙ্গে আরো কিছু বিষয় জড়িত ছিল এবং আছে—রাজনৈতিক মতভিন্নতা, সমাজ থেকে বাদ পড়ে যাওয়া এবং আরো বহু কিছু। আমাদের অভিমত ছিল, মানুষ কী কারণে চরমপন্থায় জড়িয়ে পড়ে এবং সহিংসতায় উদ্বুদ্ধ হয় তা এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।

একই সঙ্গে এ কথাও বলি, লাগামহীন মুসলিমবিদ্বেষী ধর্মান্ধতার বিষয়গুলোকে স্বীকার করতে না পারাটাও ভুল হবে। আমাদের সমাজে এগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। নিউজিল্যান্ডের ওই ঘটনাও এরই একটি অংশ। হামলাকারীর ইশতেহারে বলা হয়েছে, পশ্চিমারা মুসলমানদের আক্রমণের শিকার। এই মনোভাব শুধু মসজিদের মধ্যে বন্দুক হাতে ঢুকে পড়া চরম ডানপন্থী ওই ব্যক্তির মস্তিষ্কেই নয়, মূলধারার বহু মানুষের মধ্যেও রয়েছে। এ কথা বুঝতে হবে, মানতে হবে।

যতবার কোনো চরম ডানপন্থী এমন ধারণা বাতাসে ছড়িয়ে দেয় যে মুসলমানরা সভ্যতার জন্য হুমকিস্বরূপ, ততবারই এমন চেষ্টা দেখা যায়। হুমকির বিষয়টিকে যতটা গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হচ্ছে তা ততটা গুরুতর বা চরম নয়। অর্থাৎ আমাদের সমাজে ঘটনার গুরুত্বকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। মুসলিমবিদ্বেষী ধর্মান্ধতার হুমকি বা ইসলামভীতিকে আমরা প্রতিবারই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের সরকারি দল কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যেও এ ধরনের প্রবণতা রয়েছে। এভাবে আমাদের মুসলিম সম্প্রদায়গুলোর বিরুদ্ধে সমাজে তৈরি হতে থাকা ঘৃণাকেই আরো উসকে দেওয়া হয়।

ঘটনা ঘটেছে শুক্রবার। সপ্তাহের এই দিনটিতে মুসলমানরা একসঙ্গে নামাজ আদায় করে। ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার খবর দেখার ও শোনার পর পশ্চিমে বসবাসকারী বহু মুসলমান আতঙ্কিত হয়ে উঠবেন—এজাতীয় ঘটনা তাঁদের সঙ্গে ঘটতে পারে! নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠবেন তাঁরা। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, তাঁদের আশ্বস্ত করা যে তাঁরা একা নন। বৃহত্তর সমাজ তাঁদের সঙ্গেই রয়েছে। তাঁদের বোঝাতে হবে, আমরা মনে করি না যে মুসলিম সম্প্রদায়কে পশ্চিমে নিয়ে গিয়ে বসানো হয়েছে; বরং আমরা মনে করি পশ্চিমেরই মুসলিম সম্প্রদায় তাঁরা। তাঁরা আমাদেরই অংশ আর আমরা তাঁদের। আমরা যদি অন্য কিছু করি, যা ঘটেছে তাকে স্বীকার না করে চরমপন্থী সহিংস মতাদর্শকে বাড়তে দিই, তাহলে এজাতীয় ঘটনা আবারও ঘটবে—এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

লেখক : রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট ও আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট ফেলো

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (অনলাইন,ইউকে)

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

শেয়ার করুন