যুদ্ধের পথ ছাড়তেই হবে

হুমায়ুন কবির 

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, বিশ্বের সর্বত্র অস্বস্তি ও শঙ্কা তৈরি করেছে। এর সূচনা ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরের ভারতীয় অংশে সামরিক কনভয়ে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা। এতে প্রায় অর্ধশত ভারতীয় প্যারামিলিটারির মৃত্যু হয়। এ হামলার ঘটনার পরপরই ভারতের ঊর্ধ্বতন মহল থেকে বলা হচ্ছিল যে, তারা পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করবে। অর্থনৈতিক সম্পর্কও নূ্যনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা হবে। এ লক্ষ্য থেকে কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হয়। যেমন- পাকিস্তানকে সর্বাধিক আনুকূল্যপ্রাপ্ত দেশের মর্যাদার অবসান ঘটানো। পাকিস্তান থেকেও বলা হচ্ছিল, পুলওয়ামায় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় পাকিস্তান জড়িত, এর প্রমাণ দিতে পারলে তারা সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

গত দু’দিনের ঘটনা আমাদের চরমভাবে উদ্বিগ্ন না করে পারে না। সমরবিশারদরা বলছিলেন যে, সামরিক উত্তেজনা-সংঘাত বেশিদূর গড়াবে না। কিন্তু ভারতীয় বিমানবাহিনী পাকিস্তানের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে বালাকোটে বোমা হামলা চালিয়েছে। তারা অবশ্য বলছে, এটা সামরিক অভিযান নয়। বরং আত্মরক্ষার্থেই জইশ-ই-মোহাম্মদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। কারণ জঙ্গিদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে পাকিস্তান। ভারতে জইশ-ই-মোহাম্মদ আরও হামলা চালাতে পারে, এমন ছক কষা হচ্ছে, যা রুখতেই এ পদক্ষেপ। সন্ত্রাসের সঙ্গে কোনো রকম আপস করবে না ভারত।

অন্যদিকে, পাকিস্তান বুধবার ভারতীয় কাশ্মীরে বোমাবর্ষণের পর বলেছে, ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে তাই অসামরিক এলাকাকে লক্ষ্য করা হয়নি। আত্মরক্ষার্থে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করাই এ অভিযানের উদ্দেশ্য। কোনো রকম সংঘাত বাড়াতে না চাইলেও প্রয়োজন পড়লে আমরা পুরোপুরি তৈরি।

পাল্টাপাল্টি বিমান হামলার পর উভয়পক্ষ প্রতিরক্ষামূলক আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ভারত নিজেদের কয়েকটি বিমানবন্দর বন্ধ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রুটের বিমান নিরাপদ বিমানবন্দরে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। বেসরকারি বিমান সংস্থাও একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করেছে। পাকিস্তানের লাহোর, মুলতান, ফয়সালাবাদ, শিয়ালকোট ও ইসলামাবাদ বিমানবন্দরেও বিমান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দুই দেশই সীমান্তে বসবাসকারী নাগরিকদের নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। অনেকে সীমান্ত এলাকা থেকে ভয়েও সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ সামরিক প্রস্তুতি জোরদার হচ্ছে। দুই দেশের জনগণও শঙ্কায়। পাকিস্তান ভারতের বিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে। বলছে, পাইলট তাদের হাতে আটক। বড় ধরনের সংঘাত কি অত্যাসন্ন? এ প্রশ্ন কিন্তু উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। দুই দেশের নানা পর্যায়ের নেতারা যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ করছেন। জনগণের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে উগ্র জাত্যভিমানী মনোভাব। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনেও তার প্রতিফলন স্পষ্ট।

দুই দেশের সরকারের সঙ্গেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বৈঠক করছে। মিলছে সমর্থন। জাতীয়তাবাদ ফের চাঙ্গা। কেউ কারও চেয়ে পিছিয়ে থাকতে চায় না। দুই দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত শেয়ারবাজারে আমরা দেখছি এ সামরিক উত্তেজনার নেতিবাচক প্রক্রিয়া- শেয়ারের দাম পড়ছে।

কাশ্মীরে বড় অংশ ভারতে, ছোট অংশ পাকিস্তানে। পাকিস্তানের অংশ আজাদ কাশ্মীর নামে পরিচিত। ভারতীয় অংশের রয়েছে সংবিধানে বিশেষ সুবিধা, যা আর্টিকেল ৩৭০ নামে পরিচিত। এর সুবাদে রাজ্য বিশেষ ধরনের স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে। কিন্তু বিজেপি ভারতের কেন্দ্রের শাসনভার হাতে পাওয়ার পর তাদের কাশ্মীর নীতিতে আমরা বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। এ রাজ্যে সহিংসতা রয়েছে অনেক বছর ধরে। কিন্তু অতীতে রাজনৈতিক সমাধান এবং আলাপ-আলোচনা যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, তার বিপরীতে এখন দেখা যাচ্ছে বল প্রয়োগের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা। এর ফলে কাশ্মীরের তরুণ প্রজন্ম আরও বেশি করে হিংসার পথ বেছে নিচ্ছে, উগ্রপন্থার আশ্রয় নিচ্ছে- এমন অভিমত রয়েছে। পুলিশ-সেনাবাহিনীর ওপর হামলা বাড়ছে। গুপ্তস্থান থেকে নয়, বরং প্রকাশ্যেই সামরিক বাহিনীর ওপর পাথর ছুড়ে মারছে মারমুখী জনতা- এ দৃশ্য স্বাভাবিক। এমনকি তাতে নারীরাও ব্যাপকভাবে অংশ নিচ্ছে। কারফিউ জারি করতে হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়। জুমার নামাজের দিনে বিশেষভাবে বিরাজ করে উদ্বেগ। ভারত বলছে, এসবই পাকিস্তানের চক্রান্ত। সে দেশে উগ্র ধর্মান্ধ যেসব গোষ্ঠী রয়েছে, তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে কাশ্মীরে এসে হামলা চালায়। এ কারণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।

ভারতে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। সামনে জাতীয় নির্বাচন। নরেন্দ্র মোদির দল উত্তর ভারতের তিনটি রাজ্যের নির্বাচনে কংগ্রেসের কাছে পরাজিত হয়েছে। ফ্রান্স থেকে জঙ্গি বিমান কেনায় দুর্নীতি হয়েছে, এ অভিযোগ তুলে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীকে কোণঠাসা করতে চেষ্টা করছেন। বিরোধী দলগুলোর বড় অংশ নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনার বিষয়টি সামনে এনে নরেন্দ্র মোদির সরকার রাজনৈতিক সুবিধা পেতে চাইছে, এমন অভিমত রয়েছে এবং তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। হিন্দুত্ববাদী মতবাদও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। কাশ্মীরের যেসব ছাত্রছাত্রী ভারতের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে, তারা আক্রান্ত হচ্ছে।

পাকিস্তানের মাটিতে মিরাজ-২০০০ বিমান ব্যবহার করে বোমা হামলা চালানোর পর নরেন্দ্র মোদি রাজস্থানে এক নির্বাচনী সমাবেশে বলেছেন, দেশ নিরাপদ থাকবে। কারণ নেতৃত্ব রয়েছে যোগ্য হাতে। বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ বলেছেন, কংগ্রেস নয় বরং বিজেপির হাতেই ভারত নিরাপদ।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সংঘাতের ঘটনায় দক্ষিণ এশিয়ার সর্বত্রই শঙ্কা। উভয় দেশের হাতেই পারমাণবিক বোমা রয়েছে। দুই দেশের শাসক দলের মধ্যেও উগ্র চিন্তার লোক সক্রিয়, এমনটিও অনেকে বলছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পারমাণবিক বোমা সংক্রান্ত প্যানেলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নরেন্দ্র মোদি আলোচনা করেছেন তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে। পাকিস্তান ও ভারত সার্কভুক্ত দেশ। কিন্তু প্রায় চার দশকেও আঞ্চলিক সহযোগিতার লক্ষ্য সামনে রেখে গঠিত এ সংস্থা কার্যকর হতে পারেনি প্রধানত এ দুটি দেশের বিরোধের কারণে। এমনকি নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠানও করা যায় না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুই দেশের উপস্থিতিতে সার্ক কিংবা আঞ্চলিক অন্য ফোরামের কার্যক্রম পরিচালনাও সম্ভবত অসম্ভব হয়ে উঠবে। এমনকি খেলাধুলাতেও পরস্পরের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় উন্নয়ন, পারস্পরিক সহযোগিতা, শান্তি- এসব যেন কেবল মুখের কথায় পরিণত হতে না পারে। সামরিক উত্তেজনার পারদ যত ওপরে উঠবে, আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা তত কঠিন হয়ে পড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও বিরূপ প্রভাব পড়বে।

আমরা জানি, দক্ষিণ এশিয়া ভৌগোলিকভাবে পরস্পর জড়িত। এক স্থানে সংঘাত দেখা দিলে, উত্তেজনা বিরাজ করলে তার প্রভাব পড়ে সর্বত্র। এসবের নিষ্পত্তির কাজে সহায়তার জন্য আঞ্চলিক কোনো ফোরাম বস্তুত অনুপস্থিত।

আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, শুভবুদ্ধির জয় হবে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য ভারত ও পাকিস্তানসহ এ অঞ্চলের দেশগুলো এগিয়ে আসবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকেও ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশা করি।

দুই দেশে উগ্র জাত্যভিমান যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে অনেকেই উদ্বিগ্ন। সংঘাত, যুদ্ধকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা প্রবল। কেউ যেন কারও কাছ থেকে পিছিয়ে পড়তে চায় না। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য এ ইস্যুকে ব্যবহারের চেষ্টা পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলতে পারে- এমন শঙ্কা প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। উভয় দেশ বলছে, হামলা হলে পাল্টা হামলা হবে। কেউবা বলছে, একটা হামলার বদলা নেওয়া হবে দুটি হামলা দিয়ে। আমাদের শঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এটা রুখতে পারে রাজনৈতিক শক্তি। নাগরিক সমাজের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অশান্তি-অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ূক, এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যুদ্ধ-সংঘাতের পথ ছাড়তেই হবে। এটা আত্মঘাতী হবে, তাই অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

উৎস: সমকাল

শেয়ার করুন