বইমেলার বহুপক্ষীয় মিথোজীবিতা

ড. কানন পুরকায়স্থ

১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের অগ্রণী প্রকাশনা সংস্থা মুক্তধারা বেসরকারিভাবে বাংলা একাডেমি চত্বরে বইমেলা শুরু করে। পরবর্তীকালে অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থা এতে যোগদান করে। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে বইমেলা আয়োজনের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। সেই থেকে অত্যন্ত জাঁকজমকভাবেই এই বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। অমর একুশের চেতনায় উদ্দীপ্ত এই বইমেলার রয়েছে এক আলাদা রাজ-অর্থনৈতিক ইতিহাস। পৃথিবীর অন্যান্য বৃহৎ বইমেলা, যেমন—ফ্রাংকফুর্ট বা লন্ডন বইমেলায় বই বিক্রি হয় না, এখানে বই বিক্রি একটি অন্যতম বিষয়। এই বইমেলায় বইয়ের পাঠক, বইয়ের লেখক, বইয়ের প্রকাশক ও বই বিক্রেতার মধ্যে গড়ে ওঠে এক মিথোজীবী সম্পর্ক।

লেখক, প্রকাশক, বই বিক্রেতা ও পাঠকের মধ্যে একটি সাধারণ বিভাজক হচ্ছে বই। পর্তুগালের লেখক হোসে জর্জ লেটরিয়া

(Jose Jorge Letria) তাঁর বই ‘If I were a Book’-এ উল্লেখ করেন, ‘আমি যদি বই হতাম, তাহলে অনেক গভীর গোপন বিষয় পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিতাম;

আমি যদি বই হতাম, তাহলে আমি জ্ঞান দিয়ে সহিংসতাকে প্রতিহত করতাম;

আমি যদি বই হতাম, তাহলে আমি শব্দের শহরে এক গগনচুম্বী ইমারত হতাম;

আমি যদি বই হতাম, তাহলে আমি অজ্ঞতাকে দূর করতাম;

আমি যদি বই হতাম, তাহলে আমি শুনতে ভালো বাসতাম কেউ একজন বলছে এই বই আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে।’

বই একজন যোদ্ধাকে অনুপ্রাণিত করে। উদাহরণস্বরূপ আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কথা ধরা যাক। আলেকজান্ডার সমরাভিযানের সময় তিনটি জিনিস সঙ্গে রাখতেন। একটি হচ্ছে ছুরি, অপরটি হচ্ছে বাক্স এবং মহাকবি হোমারের ‘ইলিয়ড’। আলেকজান্ডার যেখানেই সমরাভিযানে যেতেন তাঁর বালিশের নিচে এই তিনটি জিনিস রাখতেন। ছুরি রাখার কারণ ছিল আত্মরক্ষা করা এবং ‘ইলিয়ড’ গ্রন্থ তাঁকে অনুপ্রাণিত করত।

গল্প মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ ঘটায়। বইয়ের দোকান এই গল্পের জোগান দেয়। এই গল্প কল্পনা-আশ্রিত হতে পারে আবার অকল্পিত হতে পারে। গল্পের সরবরাহকারী বইয়ের দোকান যেমন শহরে, বন্দরে, মরুভূমিতে, রেইন ফরেস্টে রয়েছে আবার এই দোকান নানা ইলেকট্রনিক যন্ত্রেও রয়েছে। এই বইয়ের দোকান যেন একটি ক্ষুদ্র পৃথিবী। এই পৃথিবীতে একটি জাতির সঙ্গে আরেকটি জাতির যোগাযোগের মাধ্যম কোনো বিমানপথ নয়, বইয়ের তাকের (Shelf) মাধ্যমে। এই তাকে রক্ষিত বইয়ের মাধ্যমে একটি জাতি আরেকটি জাতির সঙ্গে অথবা একটি দেশ আরেকটি দেশের সঙ্গে অথবা একজন লেখক আরেকজন লেখকের সঙ্গে মিলিত হতে পারেন।

একটি বইয়ের দোকান কিভাবে লেখক তৈরিতে ভূমিকা রাখে? ধরা যাক, প্যারিসের বইয়ের দোকান শেকসপিয়ার অ্যান্ড কম্পানির কথা। ১৯১৭ সালে সিলভিয়া বিচ আমেরিকা থেকে এসে প্যারিসে এই দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২১ সালে দোকানটি ১২ নম্বর রঁ দ্য ল্যা অডিয়নে স্থানান্তরিত হয়। সিলভিয়া তাঁর বইয়ের দোকানকে শুধু বই বিক্রি নয়, লেখকদের আড্ডা দেওয়ার জায়গায় পরিণত করেন। জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ গ্রন্থটি যখন আমেরিকার প্রকাশকদের কাছে অশ্লীলতার দোষে প্রকাশযোগ্য নয় বলে প্রত্যাখ্যাত হয়, শেকসপিয়ার অ্যান্ড কম্পানি তখন এই বই প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এভাবেই বইয়ের দোকান, লেখক ও প্রকাশকের মধ্যে এক মিথোজীবী সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। ২০১৬ সালে শেকসপিয়ার অ্যান্ড কম্পানি পরিদর্শনকালে জানতে পারি, জেমস জয়েস সিলভিয়াকে বইটি প্রকাশের জন্য কিছু টাকাও প্রদান করেছিলেন। কিন্তু আজ একই বই বিখ্যাত বইয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

বই প্রকাশের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এই অনিশ্চয়তা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। ফরাসি দার্শনিক ও আর্ট সমালোচক ডেনিস ডিডেরোঁ (Denis Diderot) তাঁর ‘Letters on the Book Trade’

-এ উল্লেখ করেন, A man recognises his genius only upon putting it to the test. The eaglet trembles like the young dive at the moment it first unfolds its wings and entrasts itself to a breath of air.

ডিডেরোঁ আরো উল্লেখ করেন যে একজন লেখক যখন তাঁর প্রথম লেখা সৃষ্টি করেন তখন তিনি জানেন না তার মূল্য কত। এমনকি বইয়ের বিক্রেতাও জানেন না কী তার মূল্য। সুতরাং যে যা দিয়ে বা নিয়ে খুশি হন, সেভাবেই কাজটির শুরু হয়। তারপর এর সাফল্য, বইয়ের বিক্রেতা অথবা লেখককে অনুপ্রাণিত করে।

বইয়ের সঙ্গে এর প্রকাশক, বিক্রেতা ও লেখকের মধ্যে যে মিথোজীবী সম্পর্কের সৃষ্টি হয়, তাতে পাঠকের ভূমিকা অপরিসীম। বই যদি একটি বস্তু বা সামগ্রী হয়, তাহলে বইয়ের দোকানকে কল্পনা করা যায় এক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের মতো। সেই স্থানে একটি বস্তুকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব পাঠকের। কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে নিজের যাচিত বস্তুকে খুঁজে বের করতে হলে প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম। পাঠককে হতে হয় সে রকম পরিশ্রমী। তাই মিথোজীবী সম্পর্কের মাঝে পাঠকের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য।

একজন বইয়ের দোকানদার প্রতিবাদী হতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর সেনা অফিসার শেকসপিয়ার অ্যান্ড কম্পানিতে জেমস জয়েসের ‘ফিনেগান উইক’ গ্রন্থটি কিনতে আসেন। সিলভিয়া নাৎসি বাহিনীর সেনাটির কাছে বই বিক্রিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। নাৎসি বাহিনীর অফিসার বলেন, ‘আমি আমার সেনাবাহিনী নিয়ে আসব বইটি নিতে।’ সিলভিয়া তাঁর বন্ধুবান্ধব নিয়ে দ্রুত সব বই দোকান থেকে সরিয়ে ফেলেন এবং বইয়ের দোকান বন্ধ করে দেন।

বই চুরি একটি শাশ্বত বিষয়। এটি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। প্যারিস বা লন্ডনে কোনো কোনো বইয়ের দোকানে বই চুরির বিষয়ে সতর্কবাণী প্রকাশ করা হয়। যেমন—প্যারিসের একটি বইয়ের দোকানে যা লেখা আছে তা বাংলায় এই দাঁড়ায়—

আমার বন্ধু এই বইটিকে চুরি কোরো না,

এই বইয়ের দিকে এগিয়ে গেলে দেখবে ফাঁসির দড়ি

তোমার অপেক্ষায় আছে,

এই দড়ি তোমাকে শ্বাস রোধ করে ঝুলিয়ে রাখবে।

আমি তখন তোমার কাছে জানতে চাইব যে বইটি তুমি

চুরি করেছ, সেটি কোথায়?

বইয়ের মেলার চরিত্র একটি স্বতন্ত্র বইয়ের দোকান থেকে ভিন্ন। এখানে পাঠক, লেখক, প্রকাশক, বিক্রেতা ও সরবরাহকারীর মিলনমেলা বসে। কোনো কোনো বইমেলায়, যেমন—লন্ডন বইমেলায় বইয়ের ছাপা, মুদ্রণ, প্রচ্ছদ ইত্যাদি প্রযুক্তিগত দিকের মেলাও বসে। গবেষণায় দেখা যায়, বইয়ের মেলা শিশুদের মনে গভীর ছাপ ফেলে, যা তাদের পরবর্তীকালে বইয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে বা লেখক হতে সহায়তা করে। অনেক বইমেলায় দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সমারোহ ঘটে, যা হয়তো একটি বইয়ের দোকানে গেলে পাওয়া যেত না।

একজন বই বিক্রেতা পাঠক ও প্রকাশকের মাঝে সেতুবন্ধ তৈরি করেন। আমি ফ্রাংকফুর্ট বইমেলায় গিয়ে লেখা মহাকবি গ্যেটের সেই লাইনটি স্মরণ করি, Here is the fair, quick, unpack and decorate your stand, come, authors, all of you, and try your luck. অমর একুশে বইমেলা চিরজীবী হোক।

লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক ও পরিবেশবিজ্ঞানী, যুক্তরাজ্য

উৎস: কালের কণ্ঠ

শেয়ার করুন